- জাতীয়, নির্বাচিত, ব্রেকিং নিউজ, সুনামগঞ্জ, স্লাইডার

‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে যুদ্ধ করেন ইদ্রিস আলী

এইবেলা,  ছাতক (সুনামগঞ্জ), ১৫ ডিসেম্বর:: বয়সের ভারে সব স্মৃতি যেন হারিয়ে যাচ্ছে। এরপরও মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্মৃতি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কিছু আনন্দের, কিছু বেদনার। এক দিনের স্মৃতি আমার হৃদয়কে আজ অবধি বেদনায় ভারাক্রান্ত করে। সেই স্মৃতি যখন মনে পড়ে তখনই মনে হয় একজন অসম সাহসী মুক্তিযোদ্ধার কথা। তিনি হলেন আমার সহযোদ্ধা মুসলিম আলী।

মুক্তিযুদ্ধের প্রথম দিকে আমার সহযোদ্ধা মুসলিম আলী, আব্দুল কুদ্দুছসহ আমরা ৬জন এক সাথে পাকবাহিনীর সাথে সম্মূখ যুদ্ধে অংশ নেই। একদিন আমরা বালিউরা বাজারের পূর্ব পাশে অবস্থান করছিলাম। ছাতক শহর থেকে পাকসেনাদের দল এগিয়ে আসছিল ছনখাই গ্রামের দিকে। আমরা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে লক্ষ্য করে গুলি শুরু করি। পাকসেনারাও গুলি করতে করতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল।

বিট্রিশ পয়েন্ট নামক এলাকায় আসার পরই পাকসেনারা ছনখাই এলাকার অনেক ঘর-বাড়ীতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়। জোড়াপানি এলাকায় সম্মূখ যুদ্ধে একটি মাইন বিস্ফোরনে আমাদের চোখের সামনেই মুসলিম আলী মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্তে মুসলিম আলী আমাদের বলেছিল ‘জীবন দিয়ে হলেও যুদ্ধে জয়লাভ করতে হবে। দেশকে পাকহানাদার মুক্ত করতে হবে’ দেশ স্বাধীন হলেও দেখা হয়নি মুসলিম আলীর। তার কথা খুব বেশী মনে পড়ে। কথাগুলো বলছিলেন মো.ইদ্রিস আলী।

সুনামগঞ্জ জেলা স্বাধীন বাংলা সংগ্রাম পরিষদ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত গৌরবজ্জ্বল ভূমিকা পালন করেছে। একই ভাবে অবদান রেখেছে এ জেলার সংগ্রামী ছাত্র জনতা ও সর্বস্তরের জনগণ। অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে এ জেলার হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধা। বার বার মোকাবিলা করেছে পাক হানাদার বাহিনীকে। সর্বোপরি বেঙ্গল রেজিমেন্টের কয়েকটি কোম্পানির সমন্বয়ে জেড-ফোর্স যুদ্ধ করেছে বীর দর্পে। অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী পালন করেছেন সংগঠনের গুরু দায়িত্ব।

সুনামগঞ্জ জেলা ছিল জাতীয় ভাবে বিভক্ত সেক্টর-৫ এর অন্তর্গত। সাব-সেক্টর কমান্ডার ক্যাপ্টেন এ এস হেলাল উদ্দিনের অধীনে আমরা বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে অংশ নেই। একাত্তরের সেপ্টেম্বরের শেষে প্রথম সম্মুখযুদ্ধ করেন বালিউড়া-ছনখাই এলাকায়। এখানের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল ছাতক যুদ্ধ। অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে ছাতক সিমেন্ট কারখানাটি ঘিরে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এই যুদ্ধেও ইদ্রিস আলী অংশ নেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনাদের সঠিকভাবে অবস্থান নিতে সহায়তা করা এবং রাজাকারদের হটানো ছিল তাঁর অধীন মুক্তিযোদ্ধাদের দায়িত্ব।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ইদ্রিস আলী দোয়ারাবাজার উপজেলার বড়খাল জুনিয়র হাইস্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ১৯৭১ সালে এইচএসসি পাস করে সিলেট মদন মোহন কলেজে নৈশ শাখায় পড়ালেখা করতেন। এপ্রিল মাসে পাক হানাদার বাহিনী ছাতক ও দোয়ারাবাজারে আসে। খবর পেয়ে এলাকার কয়েকজন যুবক মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের মেঘালয়ের ইকো ওয়ান ট্রেনিং সেন্টারে প্রথম ব্যাচে ২৮দিনের প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফিরে আসেন।

যুদ্ধ শুরুর দু’মাস পর্যন্ত ভারতীয় কমান্ডিং অফিসারের নির্দেশনা অনুযায়ী যুদ্ধ করেন। ‘হিট অ্যান্ড রান’ পদ্ধতিতে তাঁরা রাতে সীমান্ত অতিক্রম করে পাকিস্তানিদের ক্যাম্প লক্ষ্য করে কিছুক্ষণ গুলি চালিয়ে আবার চলে যেতেন সীমান্তের ওপারে। জুলাই মাসে মো. ইদ্রিস আলীর নেতৃত্বে এক প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা পাঠানো হয় দোয়ারাবাজারের বাংলাবাজারে।

তখন এই বাজারের নাম ছিল পাকিস্তান বাজার। পরে তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের নিয়ে টেবলাই, চানপুর, জয়নগর এলাকায় পাকিস্তানিদের অবস্থানের কাছাকাছি বাংকার-পরিখা স্থাপন করে অবস্থান নেন। তারা ছাতক-টেংরাটিলা গ্যাসের পাইপলাইন কয়েকবার উড়িয়ে দেন। পাকিস্তানিরা এক জায়গায় মেরামত করলে তাঁরা আবার আরেক জায়গায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিতেন। মুক্তিযুদ্ধে সাহসী অবদানের জন্য মো. ইদ্রিস আলী ‘বীর প্রতীক’ খেতাব পেয়েছেন।

দোয়ারাবাজার উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের বড়খাল গ্রামে মো. ইদ্রিস আলীর বাড়ি। তাঁর পিতা মো. ইসমাইল, মা জমিরা খাতুন, স্ত্রী উম্মে কুলসুম। তাঁর চার ছেলে। তিনি দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামীলীগের আহবায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

বড়খাল স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘদিন। ২০১৪ সালে তিনি দোয়ারাবাজার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। মো. ইদ্রিস আলী বলেন, আমার চাওয়ার বড় কিছু নেই। ‘বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যার বিচার হয়েছে। সকল যুদ্ধাপরাধের বিচার সম্পন্ন হলেই জাতি কলঙ্কমুক্ত হবে।’

রিপোর্ট-নুর উদ্দিন

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *