- আন্তর্জাতিক, জাতীয়, ব্রেকিং নিউজ, স্লাইডার

থাই জঙ্গলে ৯১ বাংলাদেশি উদ্ধার

এইবেলা, ঢাকা. ১০ মে : থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের নিভৃত জঙ্গল এখন যেন মানব পাচারকারীদের হাট। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশ গমেনেচ্ছু সহজ-সরল মানুষকে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে গভীর জঙ্গলে রেখে রীতিমতো অমানুষিক নির্যাতন করা হচ্ছে। কিন্তু সময়ের আবর্তে একবিংশ শতাব্দির মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করা এ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেছে। কারণ প্রায় প্রতিদিনই গভীর জঙ্গলে মিলছে মানুষের কবর, আর উদ্ধার হচ্ছে পাচারের অপেক্ষায় থাকা অসংখ্য মানুষ।
সর্বশেষ গতকাল শনিবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ওই জঙ্গল থেকে ১১৭ জনকে জীবন্ত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯১ জন বাংলাদেশি এবং ২৬ জন মিয়ানমারের নাগরিক। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আন্তর্জাতিক চাপ এবং বর্তমান বাস্তবতায় এ ধরনের লোমহর্ষক ঘটনায় হতবাক হয়ে পড়েছে থাই সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চ্যান-ওচা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। আর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছেন, থাইল্যান্ডে উদ্ধার হওয়াদের পরিচয় শনাক্ত করে তাদের ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো জানায়, থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় শংখলা প্রদেশের রাত্তাফুম জেলায় ১১৭ অভিবাসীকে জীবিত অবস্থায় পেয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এই অভিবাসীদের অধিকাংশই বাংলাদেশ থেকে সেখানে গেছেন বলে দাবি করেছেন প্রদেশটির ডেপুটি গভর্নর।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ওই ১১৭ অভিবাসী মানব পাচারের শিকার কি-না, এ ব্যাপারে নিশ্চিত হতে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে থাই কর্তৃপক্ষ।
মালয়েশিয়ার সীমান্তবর্তী শঙ্খলা প্রদেশের ডেপুটি গভর্নর একারত সিসেন বলেছেন, এখানে ১১৭ জন মানুষ রয়েছে। তাদের মধ্যে ২৬ জন মিয়ানামার থেকে আসা রোহিঙ্গা মুসলমান। অন্যরা বাংলাদেশ থেকে এসেছেন।
তিনি বলেন, এসব মানুষ মানব পাচারের শিকার, নাকি তারা নিজ থেকেই এ দেশে প্রবেশ করেছেন, তা জানা দরকার। তারা যদি মানব পাচারের শিকার হন, তাহলে আমরা অবশ্যই তাদের সামাজিক উন্নয়ন ও মানব নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করব। আর যারা নিজ থেকে অবৈধভাবে এ দেশে প্রবেশ করেছেন, তাদের অভিবাসন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পরে তাদের নিজ নিজ দেশে পাঠানো হবে।
গত শুক্রবার থাইল্যান্ডের পুলিশ জানিয়েছিল, তারা শঙ্খলা প্রদেশের একটি পার্বত্য এলাকায় ১১১ জন অভিবাসীকে জীবিত অবস্থায় পেয়েছেন। তারা ‘মিয়ানমার ও বাংলাদেশ’ থেকে আসা রোহিঙ্গা অভিবাসী বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের জঙ্গলে ফেলে সন্দেহভাজন পাচারকারীরা পালিয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদকরা জানান, রাত্তাফুম জেলার একটি বৈঠক কক্ষে ১১৭ অভিবাসীকে গাদাগাদি করে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সেখানে তিনটি শিশুও রয়েছে। অভিবাসীদের দাঁত ব্রাশ করা, ঘুমানো, খাওয়া ও প্রার্থনা করতে দেখা গেছে। কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তারা অপেক্ষা করছিল। অভিবাসীদের পানি, চাল ও ফলমূল দান করার জন্য কিছু থাই গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে এসেছেন।
ওই ১১৭ জনের মধ্যে ৩৩ বছর বয়সী সালাম নামের একজন বলেছেন, ‘তিনি বাংলাদেশ থেকে গেছেন। তার ভাই মালয়েশিয়ায় থাকেন। তিনি সেখানে যেতে চেয়েছিলেন।’
গত সপ্তাহে থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলীয় গভীর জঙ্গলে আবিষ্কার করা অগভীর কবর। সেখান থেকে অন্তত ৩৩ জনের দেহাবশেষ ও কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। তারা বাংলাদেশি ও মিয়ানমানের অভিবাসী বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই এলাকায় সন্দেহভাজন মানব পাচারের অন্তত তিনটি শিবিরও পাওয়া যায়।
এদিকে মানব পাচার-বাণিজ্য বন্ধে ১০ দিনের সময়সীমা দিয়ে অভিযান কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন থাই সামরিক সরকারের প্রধানমন্ত্রী প্রায়ুথ চ্যান-ওচা।
অন্যদিকে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে থাইল্যান্ডের পেদাং বেসার শহরের মেয়র বোনজং পংফনকে গ্রেফতার করেছে দেশটির পুলিশ। থাইল্যান্ডের পুলিশ প্রধান সোমইয়োত পুমপান এ তথ্য গণমাধ্যমগুলো নিশ্চিত করেছেন।
সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে সাগরপথে মালয়েশিয়ার মানব পাচারের বেশ কয়েকটি ঘটনা ধরা পড়েছে এর আগে। বলা হচ্ছে, উদ্ধার হওয়া ১১৭ জনকে সেভাবে পাচার করা হচ্ছিল।
পাচারের শিকার হওয়া মানুষকে মালয়েশিয়া সীমান্তবর্তী থাইল্যান্ডের ওই জঙ্গলে রাখা হতো। যাদের মধ্যে নির্যাতনে অনেকের মৃত্যু ঘটে।
জানা গেছে, মানব পাচার এবং বন্দিশিবিরে অকাতরে মানুষ হত্যার ঘটনায় পেদাং বেসার শহরের মেয়রকে গ্রেফতার করেছে দেশটিতে মানব পাচার প্রতিরোধে গঠিত বিশেষ টাস্কফোর্স।
ব্যাংকক পোস্ট জানিয়েছে, বোনজং পংফন নামের ওই মেয়রকে মানব পাচারকারী দলের প্রধান বলে সন্দেহ করছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। শঙ্খলা প্রদেশের জঙ্গলে পাচার হওয়ার পর অপহৃত অভিবাসীদের বেশ কিছু গণকবরের খোঁজ পাওয়ার পর শুক্রবার তাকে আটক করে বিশেষ টাস্কফোর্স।
মেয়র বোনজং পংফন থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয় বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে ব্যাংকক পোস্ট।
মানব পাচার প্রতিরোধে বিশেষ টাস্কফোর্স ও পুলিশ দাবি করেছে, ওই মেয়র বিভিন্ন সময় মানব পাচারকারীদের সহায়তা করেছেন বলে প্রমাণ আছে। এমনকি উদ্ধার কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মিয়ানমার ও বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর বেশকিছু মানুষ অবৈধ উপায়ে নিজেদের জীবন বিপন্ন করে সমুদ্রপথে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ায় পাড়ি দেয়। প্রথমে পাচারকারীদের সহায়তায় থাইল্যান্ডে পৌঁছায় তারা। এরপর অনেককে সড়কপথে গহিন জঙ্গলের ভেতরে থাকা বন্দিশিবিরে নেয়া হয়। এই বন্দিশিবিরে জিম্মি রেখে পাচারকারীরা মুক্তিপণ নিয়ে অভিবাসীদের সীমান্তবর্তী মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। মুক্তিপণ না পেলে তাদের নির্যাতন করে, এমনকি হত্যা করা হয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এরই মধ্য বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে ব্যাংককস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস। রাষ্ট্রদূত সাঈদা মুনা তাসনিম বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন।
অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গণমাধ্যমকে বলেছেন, উদ্ধার হওয়াদের বিষয়ে ব্যাপক খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে, বাংলাদেশি কি না তাদের শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে। বাংলাদেশি শনাক্ত হলে তাদের দেশে ফেরত আনা হবে।#
রিপোর্ট- মো. মিজানুর রহমান

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *