আগস্ট ৬, ২০১৬
Home » নির্বাচিত » বিশ্ববাসীর স্মরণে আজও ভয়ার্ত ‘হিরোশিমা’

বিশ্ববাসীর স্মরণে আজও ভয়ার্ত ‘হিরোশিমা’

শুভাশিস ব্যানার্জি শুভ, ০৮ আগস্ট:: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৩৯ সালের ৬ আগস্ট জাপানের হিরোশিমা নগরীতে পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করে যুক্তরাষ্ট্র। লিটল বয় নামের এই পারমাণবিক বোমায় নিহত হয় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষ। ৭০ বছর পার হয়ে গেলেও ভয়াল সেই দিনের কথা এখনো ভোলেনি জাপানের মানুষ।

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। প্রতিদিনের মতো জাপানিরা দিনের কর্মকাণ্ডে যোগ দেয়ার জন্যে ছুটছে আপন গতিতে। জীবিকার তাগিদে ছুটেচলা মানুষদের তাড়া করছে মৃত্যুদূত একথা কেউ জানতো না। জানার কথাও নয়।

প্রাণচাঞ্চল্যের শহর ‘হিরোশিমা’। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালোনা গাই বি-২৯ বোমারু বিমাল থেকে হিরোশিমা শহরে আনবিক বোমা (অ্যাটম বোমা) ফেলা হয়। হিরোশিমা শহরে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে যে বর্বর নারকীয়তার সৃষ্টি হয় মৃত্যুর মিছিল। মানব সভ্যতা যেনো হোঁচট খেয়ে থমকে দাঁড়ায় এখানে।

বর্বর এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের ঘটনা হলো ১৯৩৯ সাল। পৃথিবীতে তখনও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়নি। তবে তৎকালীন জার্মানির এডলফ হিটলারের গলাবাজিতে সারাবিশ্বের মানুষ আশংকা করেছিলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের। পশ্চিমা বিশ্ব হিটলারের আণবিক বোমা প্রাপ্তির একচেটিয়া অধিকারী হয়ে সারাবিশ্বের কর্তৃত্ব গ্রহণ করার গোপন খবরে তটস্থ হয়ে পড়ে। ঠিক এমন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে শরণার্থী হিসেবে বসবাসকারী,হাংগেরীতে জন্মগ্রহণকারী বিজ্ঞানী ড. লিও জিলার্ড সর্বপ্রথম আণবিক বোমা তৈরির জন্যে একটি প্রস্তাব দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টকে।

হিরোশিমার স্থানীয় সময় সকাল ৭টা। পর পর তিন বার সর্তক সাইরেন বেজে উঠে। ভীত সন্ত্রস্ত হিরোশিমা বাসী আকাশে অনেক উঁচুতে কয়েকটি যুদ্ধ বিমান চক্কর দিতে দেখে। একটু পরে এদের সাথে যুক্ত হয় আরেক টি বিমান। কিছুক্ষণ পর বিমানগুলো দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে যায়। আনুমানিক সাড়ে ৭টা। বিপদমুক্ত সাইরেন বেজে উঠে। হিরোশিমা বাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। কিন্তু,৮ টায় আবার ৩ টি বিমান আকাশে আবির্ভূত হয়। এবার এটা কে মামুলি বিমান বিবেচনা করে আর কোন সাইরেন বাজানো হয় নি। কিন্তু কয়েক মিনিট পরেই ঘটে যায় বিভিষিকা।

হিরোশিমায় প্রলয় সৃষ্টিকারী ইউরেনিম বোম লিটর বয় (Little Boy) এর দৈর্ঘ ছিল ১০ ফুট ৬ উঞ্চি,ব্যাস ২৯ ইঞ্চি,ওজন ৯৭০০ পাউন্ড।

১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর। জাপান সরকার যুক্তরাষ্ট্রের পার্ল হারবার বিমান এবং নৌঘাঁটিতে সাঁড়াশি আক্রমণ চালিয়ে সবকিছু তছনছ করে দেয়। চোখের পলকে যেখানে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি সাধিক হয়। এবার যুক্তরাষ্ট্র জাপানের উপর আঘাতহানার পরিকল্পনা আটলো। সুদে-আসলে বদলা নেয়ার জন্যে কৌশল অবলম্বন করতে থাকলো। যুক্তরাষ্ট্র আগের দুই বৈজ্ঞানিকের আনবিক বোমা বানানোর প্রস্তাব বিবেচনায় এনে চূড়ান্তভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৪৫ সালের ৮ মে। জার্মানির আত্মসমর্পণের পর ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটলেও অপর অক্ষয়শক্তি জাপান তখনও মিত্রবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করেনি। এতে তখন এটাই প্রতীয়মান হয়েছিলো যে- যুক্তরাষ্ট্র যে আণবিক বোমা তৈরি করেছে তার লক্ষ্যবস্তু জাপান।

প্রসঙ্গত, ১৫ শতকে হিরোশিমা ছিল একটি জরাজীর্ণ গ্রাম। ১৬ শতকে মরিক্লান হিরোশিমায় একটি মন্দির নিমার্ণের মাধ্যমে উন্নয়নের বীজ বপন করেন। তখন থেকেই মূলত হিরোশিমা শহরটি ছিলো জাপানের চুগকু-শিককু জেলার সবচেয়ে বড় মন্দিরের শহর। দীর্ঘকাল ধরে গরে ওঠা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সমৃদ্ধ হিরোশিমা বোমর আঘাতে হয় বিরাণ ভূমি। ধ্বংস স্তুপ হিসিবে হিরোশিমা পরিচিতি লাভ করে পৃথিবীর সর্বত্র।

মানব ইতিহাসে পারমানবিক বোমার প্রথম শিকার হিরোশিমা। আর তাই এই মর্মান্তিক বেদনাদায়ক ঘটনার দিনটি আজও বিশ্ববাসীর কাছে স্মরণীয়।

জপানের রাজধানী টোকিও’র দক্ষিণ-পশ্চিমে ৬শ’ ৮০ কিলোমিটার দূরত্বে হিরোশিমা শহরের অবস্থান। ধ্বংসের পর সমস্ত ক্ষয়-ক্ষতি অতিক্রম করে হিরোশিমা আবার দাঁড়িয়েছে অগ্রগতির প্রতীক হয়ে। বর্তমানে এই শহরটির জনসংখ্যা প্রায় ১.৮৮ মিলিয়ন। অটোমোবাইল ইস্পাত, প্রকৌশল, জাহাজ মেরামত, খাবার প্রকৃয়াকরণ ও আসবাবপত্র শিল্পে শহরটি এখন বিশ্বের দরবারে যথেষ্ট সমাদৃত।

বলা হয়ে থাকে, হিরোশিমা উপসাগর ঝিনুকের আধাঁর হিসেবে বিখ্যাত আর স্নানের ক্ষেত্র হিসেবে জাপানি সংস্কৃতির ধারক। আনুমানিক ৩’শ বছরেরও বেশিকাল আগে থেকে জাপানে উৎপাদিত ঝিনুকের সিংহভাগের উৎসই এই হিরোশিমা উপসাগর।

এখন আর সেখানে বোঝার উপায় নেই যে,এই হিরোশিমা শহরে মুখ থুবড়ে পড়েছিল বিশ্ব মানবতার সমস্ত অহংকার। সৃষ্টি হয়েছিল বর্বরতা আর হিংস্রতার চুড়ান্ত ইতিহাস। আজ হিরোশিমার আকাশের নির্মল আভা, বাতাসের স্বচ্ছ আমেজ, সর্বত্র কবুতরের শান্তির সমাবেশ আর শিশুদের আনন্দ উল্লাসে বোঝার কোন উপায়-ই নেই যে,এই হিরোশিমাই এককালে পরিণত হয়েছিল বিধ্বস্ত মরুভূমিতে।

বলা বাহুল্য যে, হিরোশিমা এখন শান্তিময় শহর। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি এখানের অনেক মানুষ এখনো নীরবে বয়ে বেড়াচ্ছে সেই ঘাতক পারমানবিক বোমার বিষ। ক্রমান্বয়ে মৃত্যু যেন তাদের স্বাগত জানাচ্ছে! অনিচ্ছা সত্বেও মানুষ এখনো ধরে রাখতে বাধ্য হচ্ছে ১৯৪৫ সালের ৬ আগষ্টের তান্ডব লীলার স্মৃতি। এই সকল স্মৃতি চিহ্ন গুলোর মধ্যে রয়েছে হিরোশিমার শান্তি রক্ষার প্রতীক শান্তি স্মৃতি পার্ক। এটি জানাচ্ছে শাশ্বত শান্তি রক্ষার আহ্বান। এই পার্কে আছে স্মৃতি জাদুঘর ও বহু স্মৃতি স্তম্ভ।

প্রতি বছর ৬ আগষ্ট এখানে পালিত হয় স্মৃতি উৎসব। শান্তি স্মৃতি পার্ক সংলগ্ন আরেকটি স্মৃতি চিহ্ন হচ্ছে এ্যাটোমিক বোম ডোম। এটি ছিল হিরোশিমা শিল্প উন্নয়ন হল। বোমা হামলায় বিধ্বস্ত হয়েছিল প্রায় পুরোটা। কিছু অংশ এখনো দাঁড়িয়ে আছে বিমূর্ত স্বাক্ষী হিসেবে। হলের বিধ্বস্ত কাঠামোটি টিকিয়ে রাখার জন্য ব্যয় করা হয়েছে প্রচুর অর্থ।

আরেকটি স্মৃতি হচ্ছে শান্তির শিখা। শান্তি স্মৃতি পার্কের পেছনে একটি আয়তাকার পুকুর। পুকুরটির নাম শান্তি পুকুর। এই পুকুরটির ঠিক উত্তর পাড়ে শান্তির শিখা। এই শিখা বিরামহীনভাবে জ্বলছে। শিখা প্রজ্জ্বলনের মধ্যেদিয়ে,জাপান পারমানবিক অস্ত্র বিলোপের জন্য বিশ্ববাসীর দরবারে আর্তনাদ করছে।

আরেকটি স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে সেম্বা গুরু। ভাজকরা কাগজের তৈরী অসংখ্য সারস পাখির সমাবেশ সমৃদ্ধ এই স্তম্ভ। সারস পাখিগুলো যেন সর্বদা প্রর্থনারত। বোমার তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত এক কিশোরীর জীবনাবসানের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নির্মিত ঐ স্তম্ভটি। শান্তি স্মৃতি পার্কের কেন্দ্রে আছে পারমানবিক বোমা মেমেরিয়াল স্মৃতিশালা। এখানে ৪৪টি বইতে পারমানবিক তেজস্ক্রিয়তার রোগাক্রান্ত ১ লাখ ২৪ জনের নাম লেখা আছে। ভেতরে রয়েছে একটি মাটির প্রকোষ্ঠ। প্রকোষ্ঠে একটি কালো পাথরের কফিন।  সেই কফিনে রাখা আছে বইগুলো।

কফিনের সম্মুখভাগে লেখা “এখানে সকল আত্মাকে শান্তিতে ঘুমাতে দাও; আমরা যেন আবার এমন ক্ষতি না করি”। হিরোশিমা দিবসে হিরোশিমা ধ্বংসের স্মৃতি চিহ্ন গুলো যেনো নিঃশব্দে আহ্বান জানাচ্ছে বিলুপ্ত হোক পারমানবিক অস্ত্র,পৃথিবী হোক শান্তিময়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

ই-মেইল: Jsb.shuvo@gmail.com