জুন ১, ২০১৫
Home » জাতীয় » সাতছড়ি অভিযানের ১ম বর্ষ পূর্তি, কিনারা মেলেনি ৬ মামলার

সাতছড়ি অভিযানের ১ম বর্ষ পূর্তি, কিনারা মেলেনি ৬ মামলার

এইবেলা,  হবিগঞ্জ, ১জুন : আজ ১ জুন। পূর্ণ হলো হবিগঞ্জের সাতছড়ি অভিযানের এক বছর। ২০১৪ সালের এ দিনেই র‌্যাব এখানে অভিযানে নামে। দফায় দফায় অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমান সমরাস্ত্র। এসব ঘটনায় পৃথক ৬টি মামলা দায়ের করা হলেও এখনও পর্যন্ত এগুলোর কোন কোলকিনারা মেলেনি। কারা, কেন, কিভাবে, কোথা থেকে এসব অস্ত্র এনেছিল এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অজানাই রয়ে গেছে। তবে এক বছরে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন ত্রিপুরা পল্লীর বাসিন্দারা স্বাভাবিক জীবন-যাপনে ফিরেছে। কিন্তু তার পরও তাদের মধ্যে রয়েছে অজানা আতংক। যদিও প্রতিটি পরিবারই প্রতিজ্ঞা করেছেন বহিরাগত আর কেউ কখনও এখানে এসে আস্তানা  গাড়তে পারবে না। কোন সন্ত্রাসীর জায়গা হবেনা তাদের এখানে।

এদিকে, অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে দায়েরকৃত ৬টি মামলাই এখন তদন্ত করছে সিআইডি। এর আগে প্রথম দফা তদন্ত করেন চুনারুঘাট থানার ওসি অমূল্য কুমার চৌধুরী। তিনি জানান, তদন্তে অগ্রগতি আছে। তবে যেহেতু মামলাটি সিআইডি তদন্ত করছে তাই তদন্ত বিষয়ে কি অগ্রগতি হয়েছে তা বলা যাবেনা। এছাড়া সাতছড়িকে সার্বক্ষণিক গোয়েন্দা নজরদারীতে রাখা হয়েছে। কোন নিরপরাধ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে বিষয়েও খেয়াল রাখা হচ্ছে। তদন্তের অগ্রগতির বিষয় জানতে যোগাযোগ করা হলে মামলাগুলোর তদন্ত কর্মকর্তা হবিগঞ্জের সিআইডির ইন্সপেক্টর সৈয়দ সাজিদুর রহমান বলেন, তদন্ত চলছে। তেমন কোন অগ্রগতি নেই। কোন আসামীও গ্রেফতার হয়নি। তবে তদন্তে  আরও মাস দু’য়েক সময় লাগতে পারে বলে তিনি জানান।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, আবারও পূর্বের অবস্থানে ফিরতে শুরু করেছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান। ধিরে ধিরে পর্যটকদের আনাগোনাও বাড়ছে আকর্ষনীয় এ স্থানটিতে। কাটছে স্থানীয় বাসিন্দাদের আতংকও। তারা এখন অনেকটাই স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফিরেছে। সেখানে আগের মতো আর র‌্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি নেই। নতুন করে আর কোথাও চলছেনা খোড়াখুড়ি। তবে মাঝে মাঝে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্তের কাজে সেখানে যায়। আর গোয়েন্দা নজরদারী অব্যাহত থাকায় তারা কোন খবর পেলেই সেখানে গিয়ে উপস্থিত হয়।

এদিকে অভিযানের এক বছর পর জীবনযাত্রায় অনেকটাই স্বাভাবিকতা ফিরে এসেছে উদ্যানের পার্শ্ববর্তী অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের স্থান ত্রিপুরা পল্লীতে। তারা এখন অনেকটাই স্বাচ্ছন্দে কাটাচ্ছে। বাড়িঘরে ফিরেছে অভিযানকালে পালিয়ে থাকা সবগুলো বাড়ির পুরুষ সদস্য। আগে যেখানে বহিরাগতদের দেখলেই আঁতকে উঠতেন মহিলাসহ পল¬ীর বাসিন্দারা, সেখানে এখন তারা কিছু কথাও বলেন। তবে অভিযানের বিষয় নিয়ে তারা কোন কথা বলতে রাজি হননি।

এ ব্যাপারে শুধু এটুকুই বলেন, এখন ভাল আছি। ২৭ মে পল্লীতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি বিয়ের অনুষ্ঠান চলছিল। পল্লীর যেখান থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল বিপুল পরিমান আগ্নেয়াস্ত্র ঠিক তার পাশের বাড়ির বাসিন্দা প্রদীপ দেব বর্মার ছোট ভাই পলাশ দেব বর্মার বিয়ে ছিল এ দিন। অনেক জাকজমকপূর্ণভাবেই হচ্ছিল অনুষ্ঠানটি। পল্লীর প্রবেশ পথে লাগানো ছিল আকর্ষনীয় গেট। এখান থেকেই লাইটিং করা হয় বরের বাড়ি পর্যন্ত। বিয়ে উপলক্ষে শুধু হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া পল্লীর সব বাসিন্দাই বরযাত্রী হয়ে গিয়েছিলেন শ্রীমঙ্গলে কনের বাড়িতে। বরের বাড়িতে তার বড় ভাই প্রদীপ দেববর্মাসহ কয়েকজন ছিলেন। তারাও ছিলেন কনে বরনের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত। এরই মধ্যে কথা হয় তার সাথে।

তিনি জানান, তারা এখন ভাল আছেন। তাদের মধ্যে এখন আর কোন আতংক নেই। কেউ তাদের ভয়ও দেখায়না। সবগুলো পরিবারই এখন বাড়িঘরে ফিরেছে। কিন্তু তার ভাইয়ের বিয়ে উপলক্ষে সবাই কনের বাড়িতে বরযাত্রী হয়ে গেছে। রাতে তারা কনে নিয়ে ফিরবে। আগে পল্লী যেসব লোক এসে তাদের এখানে আশ্রয় চাইতো তারা এখন আর এখানে আসেনা। এলেও তাদের আর আশ্রয় দেয়া হবেনা। পল্লীর আরেক বাসিন্দা লক্ষ্মী সাওতালের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় তিনি সাংসারিক কাজে ব্যস্ত। পল্লীর যুব বয়সী বাসিন্দা হিরন তাঁতী বলেন, কিছু তো ভয় করেই। আতংকও কিছু আছে। কারণ বিভিন্ন সময় পুলিশ এসে জিজ্ঞাসাবাদ করে। তখন ভয়ে অনেকেরই কথায় প্যাঁচ লাগে। আর এমন হলে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখে। থানা, চেয়ারম্যান, মেম্বারের কাছে দৌড়াতে হয়।

২০১৪ সালের ১ জুন কঠোর গোপনীয়তায় সাতছড়িতে অভিযান শুরু করে র‌্যাব। ডগ স্কোয়াড এবং বিস্ফোরক ডিস্পোজাল টিম পাহাড়ে পাহাড়ে তল্লাসি চালায়। ৩ জুন জাতীয় উদ্যানের পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা পল্লী ও আশপাশের বিভিন্ন টিলায় অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমান অস্ত্র বিষয়ে ঘোষণা দেয়া হয়। এ খবর প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ৪ জুন দ্বিতীয় দিনের মতো অস্ত্র উদ্ধার শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। প্রথম দফায় এ দু’দিন ছাড়াও ৯ জুন ফের উদ্ধার করা হয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ। এ অভিযান চলে টানা ১৯ জুন পর্যন্ত। এদিন রাতে সাতছড়ি থেকে র‌্যাব সদস্যদের প্রত্যাহার করা হয়। পরে আবারও অভিযান চালানো হয় ২ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায়, ১৭ সেপ্টেম্বর তৃতীয় দফা, চতুর্থ দফায় ১৬ ও ১৭ অক্টোবর।

অভিযানকালে ১২টি বাংকার ও ৩টি গর্ত খুড়ে উদ্ধার করা হয় বিপুল পরিমান মারণাস্ত্র। উদ্ধার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদের মধ্যে উলেল্লখযোগ্য ছিল মেশিনগান ৮টি, রকেট লঞ্চার ১টি, ২৯৬টি রকেট চার্জার, বিমান বিধ্বংসী বুলেট ৫৪টি, এসএমজি ৯টি, এসএমসি ১টি, বেটাগান ১টি, অটোরাইফেল ১টি, এসএলআর ৬টি, এলএমজি ২টি, ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট গোলা ১১২টি, ট্যাংকের গোলা ৪২৫টিসহ বিভিন্ন অস্ত্রের গোলা ২৫ হাজার ২৭১টি। এছাড়াও ম্যাগজিন, গুলির ব্যারেল, সামরিক বাহিনীর পোষাকের আদলে পোষাক তৈরীর কাপড় ৬ বস্তা, ৬টি সেলাই মেশিন, বিচ্ছিন্নতাবাদিদের ব্যাবহৃত বিভিন্ন ডায়েরি, বই, চাঁদা আদায়ের রশিদ, চিকিৎসার যন্ত্রপাতিসহ বিপুল পরিমান মালামাল।

সাতছড়িতে ৪ দফা অভিযানে ৬ বার অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় চুনারুঘাট থানায় পৃথক ৬টি মামলা দায়ের করা হয়। র‌্যাব সদস্যরা বাদি হয়ে ৩টি অস্ত্র ও ৩টি বিস্ফোরক আইনে মামলাগুলো দায়ের করেন। প্রথমে ৪টি মামলার তদন্তভার পান চুনারুঘাট থানার ওসি অমূল্য কুমার চৌধুরী ও ২টির তদন্তের দায়িত্ব পান ওসি (তদন্ত) ইকবাল আহমেদ। তারা এ সময় একাধিকবার সাতছড়ির টিলায় টিলায় ঘুরে দেখেন। নিয়োগ দেন নিজস্ব গোয়েন্দা। তারা কিছু দিন তদন্ত করার পর মামলাগুলোর তদন্তের দায়িত্ব যায় সিআইডিতে। বর্তমানে মামলাগুলো তদন্ত করছেন সিআইডির ইন্সপেক্টর সৈয়দ সাজিদুর রহমান।

 

রিপোর্ট-হবিগঞ্জ প্রতিনিধি