- জাতীয়, সাহিত্য, স্লাইডার

বইমেলায় বিরহের সুর

এইবেলা ডেস্ক, ২৮ ফেব্রুয়ারি::  বাংলা একাডেমির পাশেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এখন আর শোনা যায় না কোকিলের করুণ ডাক। তবুও পুরো মেলার আবহজুড়ে এখন বিরহের সুর। কারণ আজকের দিনটি ফুরোলেই তো শেষ হবে অমর একুশে বইমেলা। বাঙালি সংস্কৃতির সর্বজনীন উৎসবের রূপ নেয়া মেলার সমাপনী দিন আজ মঙ্গলবার (২৮ ফেব্রুয়ারি)। কাল বুধবার থেকে থেকে আবারো ফাঁকা হয়ে পড়বে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। থেমে যাবে কোলাহল। প্রাঙ্গণে পড়বে না আর লাখো মানুষের পদচিহ্ন। মিলবে না দেখা লেখক-পাঠকের মিলনমেলা আর আড্ডার। ’৫২-র বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার নিদর্শন রূপে আয়োজিত এ মেলা এখন আমাদের প্রাণের মেলা, জ্ঞানের মেলা। আর জ্ঞানের মেলার বাহন বই টেনে আনছে শিশু থেকে বুড়ো, ধনী থেকে গরিব সব শ্রেণির মানুষকে। সেই জ্ঞান আর প্রাণের মেলার পর্দা নামছে আজ। পেছনে পড়ে থাকছে নতুন বইয়ের সদ্য ভাঁজ খোলার সুভাস আর প্রিয় লেখকের সান্নিধ্য পাওয়া আবেগাপ্লুত কিশোরীর চোখের জল আর ঝরে পড়া মেহগনির পাতা। আর সেজন্যই ভিড় বা বেচাবিক্রি নয়, মেলাজুড়েই গতকাল সোমবার ছিল বেদনা আর ভাঙনের সুর।

মেলা শেষের আগের দিন জুড়ে ছিল বিক্রির ধুম। মেলায় আগত প্রায় প্রত্যেকেরই হাতে ছিল নতুন বই। তেমনই একজন মগবাজার থেকে আগত হাসনাইন ইমতিয়াজ। আগেও তিন দিন তিনি মেলায় এসেছিলেন। এ আগমনের কারণ ছিল প্রকাশনীগুলোর বুকলিস্ট সংগ্রহ। তারপর তিনি বই বাছাই করে গতকাল কিনে ঘরে ফিরেন। অন্বেষা প্রকাশনীর সামনে কথা হলো তার সঙ্গে। বলেন, ‘প্রত্যেকবারই আমি মেলা ঘুরে বুকলিস্ট সংগ্রহ করি। এরপর নতুন বই কিনি।’ কত টাকার বই কিনলেন- এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, প্রায় দশ হাজার টাকার বই কিনেছেন।

এই বিরহের মধ্যে পুরনো একটা প্রশ্ন অনেকের মুখ থেকে বের হয়েছে। তা হলো, ‘মেলার সময় কি বাড়ানো হবে?’ এ ধরনের প্রশ্ন শুনে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে বোধ হয় তথ্যকেন্দ্রের কর্মকর্তাদেরও। উত্তরটা সবারই জানা যে মেলার সময় বাড়ানো হবে না। তারপরও বারবার জিজ্ঞাসা, কারণ এ মেলার আবেদন তো আর মাত্র এক মাসে সীমাবদ্ধ নয়।

গতকাল নতুন বই এসেছে ১৫৫টি এবং ৪০টি নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশের প্রকাশনা : গ্রন্থ পরিকল্পনা ও সম্পাদনা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তারিক সুজাত। আলোচনায় অংশ নেন মফিদুল হক, বদিউদ্দিন নাজির এবং খান মাহবুব। সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস প্রকাশক মহিউদ্দিন আহমেদ।

প্রাবন্ধিক বলেন, ‘গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে প্রকাশনার মান যেমন বেড়েছে, তেমনি প্রকাশনার ক্ষেত্রে পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গিও তৈরি হয়েছে। ডিজিটাল ফটোগ্রাফি, ডিজিটাল ইমেজ- এসব বিষয় হাতের নাগালে চলে আসায় প্রকাশনা সহজ হলেও এর জটিল দিকও উন্মোচিত হয়েছে। তবে ই-বুক্স বা বৈদ্যুতিক পুস্তক, অডিও বই কিংবা ইন্টারনেটের ব্যাপক বিস্তার, ডিজিটাল উপাদানের সহজলভ্যতা প্রচলিত প্রকাশনার ধারণাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করালেও মুদ্রিত বইয়ের আবেদন শ্বাশত চিরকালীন। প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে এবং পাঠকের পরিবর্তিত পাঠাভ্যাসের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে প্রকাশনার মানোন্নয়নের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি, যোগ্য সম্পাদক তৈরি, আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ, প্রশিক্ষণ যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো প্রয়োজন।

আলোচকরা বলেন, আমাদের দেশে ভালো পাণ্ডুলিপির যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি যথাযথ সম্পাদনার অভাবে ভালো পাণ্ডুলিপি থেকেও অনেক সময় ভালো মানের বই প্রকাশ করা সম্ভব হচ্ছে না। সেইসঙ্গে প্রকাশকের বিনিয়োগ সীমাবদ্ধতা, দক্ষ জনশক্তির অভাব ও বাজার অব্যবস্থাপনা প্রকাশনা শিল্পের বিকাশকে ব্যাহত করেছে। তারা বলেন, বই প্রকাশনার মূলভিত্তি পাঠক-চাহিদা আর পাঠকসংখ্যা বৃদ্ধি না পেলে প্রকাশনার মান রক্ষা করে ব্যয় নির্বাহ করা প্রকাশকের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে। এসব সমস্যা সমাধানকল্পে প্রকাশনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার সম্পর্ক থাকা একান্ত জরুরি।

সভাপতির বক্তব্যে মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে ভালো মানের বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনার জগতে দক্ষ জনশক্তি ও অধিক বিনিয়োগ দুটিই প্রয়োজন। সেইসঙ্গে জাতীয় গ্রন্থনীতি ও গ্রন্থাগারনীতি বাস্তবায়ন করাও অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল প্রবীর দত্তর নির্দেশনায় এবং গীতাঞ্জলি ললিতকলা একাডেমির পরিবেশনায় নাটক মুনীর চৌধুরী।

গ্রন্থমেলায় হুমায়ুন আজাদকে স্মরণ: বহুমাত্রিক লেখক হুমায়ুন আজাদের ওপর মৌলবাদী চক্রের সন্ত্রাসী হামলার বার্ষিকী উপলক্ষে একুশে গ্রন্থমেলায় গতকাল বিকেলে তাকে স্মরণ করা হয়। লেখক-পাঠক-প্রকাশকদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ সভায় মূল বক্তব্য দেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম, সুভাষ সিংহ রায়, মারুফ রসূল, শাহাদাৎ হোসেন নিপু প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন আগামী প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী ওসমান গনি। সভা সঞ্চালনা করেন কবি আসলাম সানী। বক্তারা বলেন, হুমায়ুন আজাদের হত্যাচেষ্টার বিচার অবিলম্বে বাস্তবায়ন এবং তার আদর্শে মৌলবাদ-জঙ্গিবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতামুক্ত সমাজ-রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে তাকে স্মরণ করতে হবে।

গ্রন্থমেলার বর্ধিত সময় : আজ বাংলা একাডেমি আয়োজিত মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলার শেষ দিন। এদিন অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হবে বিকেল ৩টার পরিবর্তে সকাল ১১টায় এবং চলবে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত।

গ্রন্থমেলার সমাপনী অনুষ্ঠান : আজ সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে বাংলা একাডেমি আয়োজিত অমর একুশে গ্রন্থমেলার ২০১৭-এর সমাপনী অনুষ্ঠান। শুভেচ্ছা ভাষণ দেবেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। গ্রন্থমেলার প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৭-এর সদস্য-সচিব জালাল আহমেদ। প্রধান অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব ইব্রাহীম হোসেন খান। সভাপতিত্ব করবেন ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।

অনুষ্ঠানে কবি শামীম আজাদ ও লেখক অনুবাদক নাজমুন নেসা পিয়ারিকে বাংলা একাডেমি পরিচালিত সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ পুরস্কার-২০১৬ দেয়া হবে। এছাড়া অনুষ্ঠানে ২০১৬ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার-২০১৭, ২০১৬ সালে প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা গ্রন্থের জন্য তিনটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার-২০১৭, ২০১৬ সালে প্রকাশিত শিশুতোষ গ্রন্থের মধ্য থেকে গুণমান বিচারে সর্বাধিক গ্রন্থ প্রকাশের জন্য রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার-২০১৭ এবং ২০১৭ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে থেকে নান্দনিক স্টল/প্যাভিলিয়ন সজ্জায় সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে তিনটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার-২০১৭  দেয়া হবে।

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *