- আন্তর্জাতিক, নির্বাচিত, ব্রেকিং নিউজ, স্লাইডার

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশন আয়োজিত প্রেসব্রিফিং

হাকিকুল ইসলাম খোকন, যুক্তরাষ্ট্র, ১৬ সেপ্টেম্বর ::

জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন সংবাদ সম্মেলনে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বলেন। তাঁর বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো-

আপনারা জানেন যে, আগামী ১৮-২২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তারিখে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিউইয়র্ক আসছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে তিনি ৫২ সদস্যবিশিষ্ট বাংলাদেশ সরকারি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিবেন। মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হবেন।

এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য  হচ্ছে ‘Focusing on People: Striving for peace and decent life for all on a Sustainable planet’- এটি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণে বিধৃত বৈশ্বিক অভিষ্ট লক্ষ্যের সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

Usa 2
রোহিঙ্গা সমস্যার কথা আপনারা সবাই জানেন। এবারের অধিবেশনে এ সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন অর্জন আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরী। আপনারা নিশ্চয়ই গতকাল নিরাপত্তা পরিষদ হতে এ বিষয়ে যে প্রেস বক্তব্য প্রদান করা হয়েছে তা দেখেছেন। এটি গত ৯ বছরে নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক মিয়ানমার বিষয়ে প্রদত্ত প্রথম বক্তব্য। এটি সম্ভব হয়েছে আমাদের সর্বাত্মক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কারণে। আমরা  প্রধানমন্ত্রীর এবারের জাতিসংঘে উপস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক পর্যায়ে এ বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের বৃহত্তর সমর্থন অর্জনের চেষ্টা করবো। একাধিক আরও কারণে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। আমি সে বিষয়গুলোর নিরীখে  প্রধানমন্ত্রীর এ অধিবেশনে অংশগ্রহণের সম্ভাব্য কার্যক্রম সম্পর্কে আলোকপাত করবো।

১। বর্তমান পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষাকল্পে জাতিসংঘের নতুন মহাসচিব জাতিসংঘের সংস্কার কার্যক্রমের উপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাঁর এই উদ্যোগের সঙ্গে আমরা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রের অধিকাংশই সংহতি প্রকাশ করেছে। এ লক্ষ্যে জাতিসংঘের সংস্কারের উপর  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ১৮ সেপ্টেম্বর তারিখ সকালে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন যেখানে জাতিসংঘ  মহাসচিব ও বিশ্বের অন্যান্য অনেকগুলো দেশের রাষ্ট্র/সরকার প্রধানবৃন্দের সঙ্গে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠান শেষে অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের একটি যৌথ বিবৃতি প্রকাশ  করা হবে।

২।  আপনারা জানেন যে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী শান্তিরক্ষী এবং জাতিসংঘের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে Sexual Exploitation and Abuse এর কিছু নজীর আছে। এ বিষয়ে নতুন মহাসচিব অত্যন্ত সোচ্চার। শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশসমূহসহ এক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালনকারী সদস্য রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্র/সরকার প্রধানদের সঙ্গে নিয়ে তিনি‘Circle of Leadership’ নামে একটি প্লাটফর্ম গঠন করতে চাচ্ছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় ভূমিকার স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ মহাসচিব আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে এ অনুষ্ঠানে বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। মাত্র ৪টি দেশের রাষ্ট্র/সরকার প্রধান এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে আমন্ত্রণ পেয়েছেন এবং আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তার মধ্যে অন্যতম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে SEA এর বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কঠোর নীতিগত অবস্থানকে জোরালোভাবে তুলে ধরবেন একই দিন ১৮ইসেপ্টেম্বরে।

৩। ১৮ই সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী মি. স্টেফান লফভেন-এর উদ্যোগে আয়োজিতব্য Global Deal-এর Follow up বিষয়ক উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এ অনুষ্ঠানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী টেকসই শিল্পায়ন, শোভন ও যথোচিত কর্ম এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়গুলো তুলে ধরে বক্তব্য প্রদান করবেন।

৪। ১৯ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে মহাসচিবের High Level Panel on Women’s Economic Empowerment-এ একজন প্যানেলিষ্ট হিসেবে বক্তব্য দেবেন। কোস্টারিকার প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, আইএমএফ প্রধানসহ বিশ্বের কয়েকটি স্বনামধন্য বহুজাতিক কোম্পানীর   প্রধানগণ এতে বক্তব্য রাখবেন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের অর্জনসমূহ তুলে ধরবেন।

৫। একই দিনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী OIC এর রোহিঙ্গা বিষয়ক Contact Group এর একটি উচ্চ পর্যায়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেবেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্টসহ OIC দেশসমূহের নেতৃবৃন্দ এতে অংশগ্রহণ করবেন।  প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ঙওঈ সদস্য রাষ্ট্রসমূহের জোরালো সমর্থন কামনা করবেন।

৬। ২০ সেপ্টেম্বর Prohibition of Nuclear Weapons শীর্ষক চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য জাতিসংঘ  মহাসচিব একটি চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন।  প্রধানমন্ত্রী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের পক্ষ হতে এ চুক্তিটি স্বাক্ষর করবেন।

৭। একই দিনে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সদর দপ্তরে UNDP এবংUN Office on South-South Cooperation এর সহযোগিতায় SDG Implementation, Financing and Monitoring : Sharing Innovation through South-South and Triangular Cooperation শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। প্রধানমন্ত্রী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে SDG বাস্তবায়নে বাংলাদেশের অগ্রগতির কথা তুলে ধরবেন। এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট, নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী, নেদারল্যান্ডস এর প্রধানমন্ত্রীসহ আরও কয়েকটি দেশের মন্ত্রীগণ এ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশের ‘SDG Tracker’ উদ্বোধন করবেন। এর পর পরই আমরা সেখানে SDG বাস্তবায়নে Private Sector কর্তৃক অর্থায়ন বিষয়ক আরেকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। কানাডা এবং UNDPএতে আমাদের সহযোগী হবে। অনুষ্ঠানের এ অংশে  প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের Social Impact Fund উদ্বোধন করবেন। UNDP Administrator ছাড়াও উগান্ডা, বেনিনসহ কয়েকটি দেশের মন্ত্রীবর্গ এ অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদান করবেন।

৮। ২০শে সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শান্তিরক্ষা কার্যক্রম বিষয়ে নিরাপত্তা পরিষদের একটি সভায় বক্তব্য রাখবেন। বক্তব্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ক্রমাগত উন্নতি তুলে ধরবেন এবং আঞ্চলিক শান্তি রক্ষায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের উপর জোর দেবেন।

৯। ২১ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক অধিবেশনে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য রাখবেন। প্রতিবারের মত এবারও য় প্রধানমন্ত্রী বাংলায় বক্তৃতা দিবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন, অভিবাসী শ্রমিকের অধিকার আদায়, দারিদ্র্য দূরীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা ও সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন, অবকাঠামোগত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নসহ আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশের সাফল্য গাঁথার বিষয়গুলো উল্লেখ থাকবে মর্মে আশা করা যাচ্ছে। ‘রূপকল্প ২০২১’-এর আলোকে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে সরকার যে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছে, সে বিষয়ে আলোকপাতের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশাগুলোও তাঁর বক্তৃতায় থাকবে বলে আমরা আশা করছি। এছাড়াও তিনি কিছু বৈশ্বিক বিষয়ক যেমন: মধ্যপ্রাচ্য সংকট, পারমানবিক নিরস্ত্রীকরণ, Cyber Security, মানব পাচার রোধ, সুনীল অর্থনীতি, জাতিসংঘের সংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে বাংলাদেশের মতামত তুলে ধরবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়েও জোরালো বক্তব্য রাখবেন।

১০। এছাড়াও ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত High-Level Panel on Water-এর একটি বিশেষ বৈঠকে এই প্যানেলের একজন মনোনীত সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করবেন। আপনারা জানেন যে, গত ২১ এপ্রিল ২০১৬ তারিখে ২০৩০ উন্নয়ন এজেন্ডার পানি সম্পদের প্রাপ্যতা ও ব্যবস্থাপনা এবং সকলের জন্য স্যানিটেশন নিশ্চিতকরণ সম্পর্কিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ‘প্যারিস চুক্তি’-তে পানি সম্পর্কিত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে এই প্যানেলটি গঠিত হয়।  প্রধানমন্ত্রীর সাথে অস্ট্রেলিয়া, হাঙ্গেরি, নেদারল্যান্ডস, মরিশাস, মেক্সিকো, জর্ডান, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল ও তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রপতি/ প্রধানমন্ত্রী এই প্যানেলে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন।

১১। সাধারণ পরিষদ অধিবেশনের বাইরে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০শে সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চ পর্যায়ের বাণিজ্য প্রতিনিধিদলের সাথে বাংলাদেশে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি ও সম্ভাবনা বিষয়ে মত-বিনিময় করবেন। এই বৈঠকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশ থেকে একটি ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল যোগ দেবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

১২। এর পাশাপাশি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কয়েকটি দেশের রাষ্ট্র/ সরকার প্রধান, জাতিসংঘ মহাসচিব, যুক্তরাষ্ট্রের  IT বিষয়ক স্বনামধন্য কিছু কোম্পানীর President/CEO এবং কিছু আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশ নিয়ে পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে আলোচনায় রোহিঙ্গা বিষয়টি প্রাধান্য পাবে। এছাড়াও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আয়োজিত একটি রিসেপশন, কমনওয়েলথ সরকার/রাষ্ট্রপ্রধানদের সম্মানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত একটি রিসেপশন ও জাতিসংঘ মহাসচিব আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে অংশগ্রহণ করবেন বলে আশা করা যাচ্ছে।

১৩। এছাড়া কিছু স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক মিডিয়া প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করবে। সামগ্রিকভাবে, এবারের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বৈশ্বিক অঙ্গনে আমাদের ভাবমূর্তিকে আরও সুসংহত করবে। একই সাথে, জাতিসংঘের হাত ধরে বৃহত্তর আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের বহুমুখী সফলতা ও অবদানের কথা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।#

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *