মার্চ ২৫, ২০১৮
Home » জাতীয় » কুলাউড়া থেকে হারিয়ে যাওয়া বৃস্টির ফিরে আসার গল্প…

কুলাউড়া থেকে হারিয়ে যাওয়া বৃস্টির ফিরে আসার গল্প…

আবদুল আহাদ, এইবেলা ডেক্স, ২৫ মার্চ :: কুলাউড়া উপজেলার বিজয়া চা-বাগানের চা-শ্রমিক কন্যা বৃস্টি খাড়িয়া (১২)। পাশ^বর্তী মেরিনা চা-বাগানের পরিচিত এক যুবকের মাধ্যমে গৃহকর্মী হিসেবে ঢাকায় যায়। লক্ষ্য ছিল চা-শ্রমিক বাবা-মার অভাবের সংসারে যোগান দেয়া। ঢাকার সে বাসায় কয়েকদিন কাজও করে বৃস্টি। কিন্তু চা শ্রমিক কন্যা হওয়ায় ভাষাগত সমস্যায় পড়ে সেখানে। গৃহকর্মীর কাজটি চলে যায়।

কুলাউড়ায় নিজ বাগানে ফিরে আসার সময় হারিয়ে যায় বৃস্টি। পরিবারের সদস্যরা অনেক খোঁজাখুজি করেন। কুলাউড়া থানায় জিডিও করা হয়। প্রায় ৪ মাস পর ২৪ মার্চ শনিবার আপন নীড়ে ফিরে আসে বৃস্টি। কিন্তু তার হারিয়ে যাওয়া ও ফিরে আসার বিষয়টি অনেকটা ছবির গল্পের মতো।

সরেজমিন বাগানে গেলে বৃস্টির বাবা চা শ্রমিক এতোয়া খাড়িয়া জানান, গত বছরের নভেম্বর মাসে ঢাকায় একটি বাসায় কাজের জন্য বৃস্টিকে দেয়ার প্রস্তাব দেয় পাশ^বর্তী মেরিনা চা-বাগানের সজল। তখন বৃস্টির বাবা মেয়েকে দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। কয়েকদিন পর সজল আবারো তাদের ঘরে আসে। তখন বৃস্টির বাবা-মা বাগানের কাজে ছিলেন। সেই সুযোগে পড়া-লেখা না জানা বৃস্টিকে নানা প্রলোভন দেখিয়ে ঢাকায় নিয়ে যায় সজল। গৃহকর্মী হিসেবে একটি বাসায় দিয়ে আসে তাকে।

কিন্তু গৃহকর্তাসহ ওই বাসার অন্য সদস্যরা বৃস্টির কথাবার্তা বুঝতে পারেননা। তেমনী বৃস্টিও সঠিকভাবে তাদের কথা-বার্তাও বুঝতে পারতনা। এই বোঝা না বোঝা নিয়ে একপর্যায়ে গৃহকর্তা বৃস্টিকে মারধর করেন। এতে আরও ভয় পেয়ে সে কান্নাকাটি করে বাড়িতে ফেরার আকুতি জানায়। বৃস্টির আকুতিতে পাষান গৃহকর্তার মন গলেনি। নাওয়া-খাওয়া বাদ দিয়ে অনেকটা অসুস্থ হয়ে পড়ে বৃস্টি। অবস্থা বেগতিক দেখে গৃহকর্তা বাসার দারোয়ানকে দিয়ে বৃস্টিকে কুলাউড়ার গাড়িতে তুলে দেয়ার জন্য বলে। গলদ বাঁধে সেখানেই। দারোয়ান কুলাউড়ার বাসের পরিবর্তে খুলনার বাসে তুলে দেয় বৃস্টিকে। বাসে তুলে দেয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছিল সজলকেও। কিন্তু সজল বৃস্টির মা-বাবাকে সে বিষয়টি জানায়নি।

অন্যদিকে ওই বাসের সুপারভাইজার বৃস্টিকে বাগেরহাট বাজারে নামিয়ে দেয়। অচেনা জায়গা দেখে রাস্তার পাশে দাড়িয়ে কান্নাকাটি করতে থাকে সে। একপর্যায়ে পুলিশের দৃস্টি পড়ে বৃস্টির উপর। জিজ্ঞাসাবাদে ফের ভাষাগত কারনে বৃস্টির কথা-বার্তা বুঝতে পারেনি পুলিশ। তাকে নিয়ে আদালতের শরনাপন্ন হয় পুলিশ। আদালত বৃস্টিকে তাৎক্ষনিক সেফহোমে পাঠানোর নির্দেশ দেন। প্রায় সাড়ে ৩মাস সেফহোমে কাটে বৃস্টির দিনমান। মানসিকভাবে আরও ভেঙ্গে পড়ে কিশোরী বৃস্টি। তখন পুলিশের সন্দেহ হয় সে রোহিঙ্গা শরনার্থী না কী?। ফের আদালতের মাধ্যমে বৃস্টিকে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে যায় খুলনা সদর থানার পুলিশ। সেখানে রোহিঙ্গাদের সাথে তার কোন মিল পাওয়া যায়নি। বিপাকে পড়ে পুলিশ।

ভাগ্যক্রমে উখিয়ায় বৃস্টির কথাশুনে এগিয়ে আসে এক চা শ্রমিক। বৃস্টির সাথে কথা বলে পুলিশকে নিশ্চিত করে সে চা শ্রমিক কন্যা। নিরুপায় পুলিশ তখন বৃস্টির সাথে থাকা কাপড়ের ব্যাগে তল্লাশি চালিয়ে নাম-ঠিকানা লেখা একটি কাগজ খুজে পায়। পরিচয় মিলে বৃস্টির। ফের খুলনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। খবর দেয়া হয় কুলাউড়া থানাকে। কুলাউড়া থানার মাধ্যমে জয়চন্ডী ইউনিয়নের ৭নং ওয়ার্ড সদস্য আজমল আলীকে বিষয়টি জানানো হয়। পরে পরিবারের ২ সদস্য ও সাংবাদিক আবদুল আহাদকে নিয়ে মেম্বার আজমল আলী খুলনায় যান।

সেখানে দৈনিক যায়যায়দিনের খুলনা বুরে‌্যা চিফ আতিয়ার রহমান ও খুলনা সদর থানার পুলিশের সহযোগীতা নিয়ে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। শনিবার ২৪ মার্চ বৃস্টি ফিরে আসে আপন নীড়ে। এনিয়ে চা-বাগানসহ পুরো এলাকাজুড়ে স্বস্তি ফিরে আসে।#