জুলাই ১৪, ২০১৫
Home » নির্বাচিত » ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ় হোক রক্তের বন্ধনে

ভ্রাতৃত্ব সুদৃঢ় হোক রক্তের বন্ধনে

নোমান আহমদ, ১৪ জুলাই: রক্ত, লহু বা খুন। যাই বলা হোক না কেন। মানবদেহ পরিচালনার জন্য আল্লাহর এক অপূর্ব নেয়ামত । রক্ত ছাড়া মানবদেহের অস্তিত্ব কল্পনাতীত। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষা অনুযায়ী রক্তের মাঝে লোহিত রক্তকনিকা, শ্বেত রক্তকনিকা, অনুচক্রিকা নামক তিনটি উপাদান থাকে। এদের একেকটির কাজ একেক রকম। প্রত্যেকটির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

রক্তে হিমোগ্লোবিন নামক একটি বিশেষ উপাদান থাকে বলে রক্তের রং লাল হয়। আমাদের রক্তে আছে হিমোগ্লোবিন তাই রক্তও লাল। কিন্তু সরিসৃপ ও ব্যাঙের রক্তে হিমোগ্লোবিন না থাকায় এদের রক্ত সাদা রঙয়ের হয়।

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা নানা কারণে রক্ত আদান-প্রদানের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে থাকি। বাস্তবতার কারণে, চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয়তা (যেমন অস্ত্রোপচার), দূর্ঘটনা জনিত কারণে আমরা রক্তের প্রয়োজনীয়তা বোধ করি। আমাদের প্রয়োজনে আমরা অন্যের কাছ থেকে রক্ত গ্রহণ করি। আবার অন্যের প্রয়োজনে আমরা রক্তদান করি। রক্ত আদান-প্রদানের এ রীতি চিকিৎসা বিজ্ঞানের আদিকাল থেকে চলে আসছে।

রক্ত আদান-প্রদানে রয়েছে অনেক ধরা-বাধা। যে কেউ চাইলেই যে কাউকে রক্ত দিতে বা কারো কাছ থেকে নিতে পারবে না। রক্তদাতা ও রক্তগ্রহীতার পাসকোড বা পাসওয়ার্ড হচ্ছে রক্তের গ্র“প। রক্তদাতা ব্যক্তির সাথে রক্তগ্রহীতা ব্যক্তির গ্র“পের মিল থাকা আবশ্যক। দাতা ও গ্রহীতা একই গ্র“পের রক্তবহনকারী হলে তবেই রক্ত আদান-প্রদান হতে পারে। রক্তের গ্র“পসমূহ হল এ, বি, ও, এবি পজেটিভ, ও এ, বি, ও এবং এবি নেগেটিভ। তাছাড়া রক্ত গ্রহণের পূর্বে করতে হয় ক্রস ম্যাচিং, এইচআইভির মত নানা রখম খুটিনাটি পরিক্ষা-নিরীক্ষা। পজেটিভ গ্র“পগুলোর রক্ত সহজলভ্য হলেও নেগেটিভ গ্র“পের রক্তগুলো খুব দুর্লভ। রোগীর জরুরী প্রয়োজনে নেগেটিভ গ্র“পের রক্ত যোগাড় করতে খুব ভোগান্তিতে পড়তে হয় হর হামেশা।

সম্প্রতি রক্তের চাহিদা পূরণে একটি আশার বাণী শুনিয়েছে একটি বৃটিশ গবেষণা সংস্থা। সংস্থাটি জানিয়েছে ২০১৭ সালের মধ্যে তারা বাজারে ছাড়বে কৃত্রিম রক্ত। দেশটির ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) এমন খবর প্রকাশ করেছে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া। বার্তা সংস্থাটির খবরে বলা হয়েছে আগামী দুবছরের মধ্যে কৃত্রিম রক্ত পাওয়া যাবে। এমনটি হলে প্রয়োজনের সময়  রক্ত পাওয়া নিয়ে মানুষ যে ভোগান্তিতে পড়ে তা অনেকাংশে হ্রাস পাবে।

মানুষের প্রয়োজনে রক্ত সরবরাহের জন্য বড় বড় হাসপাতালগুলোর নিজস্ব ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। রয়েছে সরকারী-বেসরকারী অনেক প্রতিষ্টান। এর পাশাপাশি রক্তের যোগান দিতে কাজ করছে নানা জনকল্যানমূলক ও স্বেচ্চাসেবী সংগঠন। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও সন্ধানী তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব প্রতিষ্ঠানের রয়েছে নিজস্ব ব্লাড ব্যাংক ও নিবন্ধিত রক্তদাতা গোষ্ঠী। যারা প্রয়োজনে রক্ত দিতে মানুষের পাশে দাড়ায়। এসব প্রতিষ্টান ও সংস্থা ছাড়াও দেশের আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র  ও মাঝারী আকারের অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন।

মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদ ভাটেরায় ক্ষুদ্র পরিসরে একটি স্বেচ্ছায় রক্তদান সংগঠন গড়ে উঠেছে। সংগঠনটির নাম স্বপ্নের ভাটেরা রক্তদান ফাউন্ডেশন। তাদের মূল কার্যক্রম হচ্ছে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের রক্তের গ্রুপ বিনামূল্যে নির্ণয় করা এবং মানুষের প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে সাহায্য করা।

ভাটেরার কয়েকজন সুস্থ্য চিন্তাশীল তরুণের উদ্যোগে এ সংগঠনটির যাত্রা শুরু করেছে। ইতোমধ্যে সংগঠনটির তত্ত্বাবধানে প্রায় তিন শতাধিক মানুষের বিনা মূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়েছে। তাদের ব্যবস্থাপনায় অর্ধ্বশত বিপদগ্রস্থ লোককে রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করা হয়েছে। সংগঠনটির উদ্যোগে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করার পর প্রত্যেক ব্যাক্তির তথ্য সংরক্ষণ করা হয় এবং প্রয়োজনে রক্ত প্রদান করা হয়। এরই মধ্যে জেলার সকল এলাকায় স্বপ্নের ভাটেরা রক্তদান ফাউন্ডেশন এর নাম ছড়িয়ে পড়েছে। তাদের মহতি উদ্যোগ প্রশংসা কুড়িয়েছে সর্ব মহলে।

দিন দিন তাদের পরিচিতি বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে চলেছে রক্তের চাহিদা। এখন দূর-দূরান্তে কারো রক্তের প্রয়োজন পড়লেই ডাক পড়ে স্বপ্নের ভাটেরা রক্তদান ফাউন্ডেশন এর। এলাকার কোথায় কোনো রোগী বা দূর্ঘটনা কবলিত ব্যক্তির রক্তের প্রয়োজন পড়লেই ঐ ব্যক্তির স্বজনরা যোগাযোগ করেন স্বপ্নের ভাটেরা রক্তদান ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কদের সাথে। রক্তদান ফাউন্ডেশন এর কর্তারাও আপ্রাণ চেষ্টা করেন ঐ ব্যক্তির রক্তের চাহিদা মেটাতে। শুরু থেকেই স্বপ্নের ভাটেরা রক্তদান ফাউন্ডেশনকে নানাভাবে সহযোগিতা করে আসছে কুলাউড়ার নিরাপদ স্বাস্থ্য রক্ষা আন্দোলন নামের একটি সংস্থা। তাদের কারিগরি সহযোগিতায় রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করা হয়।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে যাত্রা শুরু করা স্বপ্নের ভাটেরা রক্তদান ফাউন্ডেশন এর লক্ষ বহু দুর। তারা স্বপ্ন দেখছে এ সংগঠনের কার্যক্রম জেলাব্যাপী সম্প্রসারিত করতে। সংগঠনটির পেছনে যে উদ্যোমী তরুণরা কাজ করছে তারা হলেন মোঃ আবুল কালাম, জাবের আহমদ, এনাম আরাফাত রবি সিদ্দিকী, তালুকদার আদনান বাশার আসিফ নিজাম ও মোঃ আব্দুল মতিন।

রক্ত জীবন বাঁচায়। আমাদের দেহে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত রক্ত থাকে। সুতরাং প্রতি তিন মাসে একবার আটার বছরের বেশ বয়সের এক জন মানুষ চাইলেই যে কাউকে রক্ত দান করতে পারেন। এক ব্যাগ রক্ত বাঁচাতে পারে একজন মানুষের জীবন। ফুটাতে পারে একটি পরিবারের মুখে হাসি। গড়ে দিতে পারে একটি ভবিষ্যৎ। রক্ত আদান প্রদান করলে বৃদ্ধি পাবে সামাজিক সম্পর্ক। গড়ে উঠবে রক্তের সম্পর্ক। অটুট হবে সামাজিক বন্ধন। সুদৃঢ় হবে ভ্রাতৃত্ববোধ।

লেখক-সম্পাদক, মাসিক উষার আলো