আগস্ট ১৬, ২০১৮
Home » নির্বাচিত » স্মৃতির ডায়েরি কুলাউড়া : গর্তে পড়া গাড়ির চাকা আর চিতা বাঘের কবলে একদিন

স্মৃতির ডায়েরি কুলাউড়া : গর্তে পড়া গাড়ির চাকা আর চিতা বাঘের কবলে একদিন

নিয়াজুল হক, ১৬ আগস্ট ::

১৯৯৯ সালের জুন মাসের কথা। আমি তখন কুলাউড়া উপজেলায় নির্বাহী অফিসার হিসেবে কাজ করছি। সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান বেড়ে যাওয়ায় চোরাচালান বিরোধী টাস্ক ফোর্সের কাজ জোরদার করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তাগিদ দেওয়া হয়েছে। প্রতি উপজেলায় মাসে কমপক্ষে তিনটি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। জেলা চোরাচালান বিরোধী সভায় আমাদেরকে অভিযান চালানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।

একদিন বিকালে কুলাউড়া থানার এ এস পি (সার্কেল) জহিরুল হককে সাথে নিয়ে টাস্ক ফোর্স অভিযান চালাবো গাজীপুর চা বাগানের ভিতর ভারত সীমান্ত এলাকায়। জহিরুল হক বেলা তিনটার সময় ফোন দিয়ে বললেন আমি ফোর্স নিয়ে রেডি আপনি চলে আসেন। আমি সাথে সাথেই বের হয়ে এ এস পি জহিরুল হকসহ গাজীপুর চা বাগানের দিকে যাত্রা করলাম। এএসপি জহিরুল হক শক্তিশালী টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার জীপে আর আমি উপজেলার পুরানো লক্কর মার্কা মিতসুবিশী জীপ নিয়ে যাচ্ছি। সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে রাস্তাঘাট পিচ্ছিল হয়ে আছে। গাজীপুর চা বাগানের রাস্তা কাঁচা মাটির। কাঁচা রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে বারবার গাড়ির চাকা পিছলে যাচ্ছে। আমার গাড়িতে ফোর হুইলটা কাজ করে না। তাই ড্রাইভার সেলিমকে বললাম আস্তে আস্তে গর্ত খেয়াল করে চালাতে। আমার গাড়ি আগে যাচ্ছে। কয়েক কিলোমিটার যেতেই সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি এসে অপেক্ষায় আছি। ঘন্টা খানেক অপেক্ষা করলাম কিন্তু চোরাচালানকারীদের দেখা মিললো না।

গাজীপুর চা বাগানের ম্যানেজার এ বি সিদ্দিকী ভাই খুবই সজ্জন ব্যক্তি এবং অমায়িক। তিনি একদিন কথা প্রসংগে বলেছিলেন এই রুট দিয়ে প্রচুর চোরাচালানের মালামাল নিয়ে যায়। চিনি মশলা বিড়ি এইসব প্রতদিনই বিকেলবেলা দলবেঁধে ভারত থেকে নিয়ে আসে। আমরা সেই আশায় আছি। কিন্তু না সন্ধ্যা হয়ে আসছে সাড়ে ছয়টা বাজে। এদিকে শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি। রাস্তা আরও পিচ্ছিল হয়ে উঠল। এই অবস্থায় সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানেই সমুহ বিপদের মধ্যে পড়ে যাওয়া।

এএসপি জহিরুল হকও বললেন ফিরে যাওয়াই ভাল হবে। তাই নিষ্ফল অভিযান শেষ করে ফিরে যেতে গাড়ি ঘুরাতে বললাম। ফেরার রাস্তা বৃষ্টিতে আরও পিচ্ছিল আর বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। সেই অবস্থায় ধীরে ধীরে গাড়ি চালিয়ে যেতে হচ্ছে। বৃষ্টি থেমে গেলেও রাস্তায় পানি জমে থাকায় বুঝতে পারা যাচ্ছে না কোথায় গর্ত আছে। এক কিলোমিটার পার হতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল। আরও অনেকটা পথ যেতে হবে। একটা কালভার্ট পার হয়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে যেতেই গাড়ির পিছনের চাকা মাটিতে দেবে গেল। আর উঠেনা। স্টিয়ারিং যতই চাপ দেয় ততই চাকা মাটিতে পিছলা খেয়ে ভো ভো করে ঘুরতে থাকে। ফোরহুইল থাকলে এমনটা হতো না। আমি গাড়ি থেকে নেমে পুলিশের জীপটাকে আগে নিয়ে রাখতে বললাম। কোনভাবেই যখন উঠানো গেলনা তখন পুলিশের জীপ দিয়ে টেনে উঠাতে হবে। ড্রাইভার সেলিম তার গাড়িতে প্রয়োজনীয় সব কিছু রাখে। তার জীপে একটা দড়ি রেখেছিল। সেটা বের করে পুলিশের জীপের সাথে আমার জীপ বেঁধে টেনে উঠানো হলো। ঝুটঝামেলা শেষ হলে আবারও চলতে শুরু করলাম। এবার পুলিশের জীপ সামনে আমারটা পিছনে। এবার গাজীপুর বাগান ম্যানেজার বাংলোর কাছাকাছি এসে পুলিশের জীপ গর্তে পড়লো কিন্তু সামলে নিয়ে উঠে গেল। আমার গাড়িটা ওই গর্ত এড়াতে একটু ডান দিকে চাপিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু এবার আর একটা নয়, পিছনের দুটি চাকাই মাটিতে ঢুকে গেল। আবার ভোঁ ভোঁ শব্দে চাকা ঘুরেছে কিন্তু মাটি থেকে উঠছে না। আবারও দঁড়ি বেঁধে পুলিশের গাড়ি দিয়ে উঠানোর ব্যবস্থা করা হল। চারিদিকে অন্ধকার আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না। শুধু অনেক দূরে চা কারখানা আর ম্যানেজার বাংলোর আলো দেখা যাচ্ছে। দড়ি দিয়ে টান দিয়েও কাজ হলোনা কিন্ত এবার দুর্ভোগের ষোল কলা পূর্ণ হল। পুলিশের গাড়ির পিছনের দুটি চাকাও মাটিতে দেবে গেল। তার গাড়ির ফোরহুইলও এখন কাজে আসলো না। এখন উপায় খুঁজতে লাগলাম। আমরা দু’জন আর তিনজন পুলিশ সদস্য একজন ড্রাইভার ছয়জন মিলে ধাক্কা দিয়েও গাড়ি উঠাতে ব্যর্থ হলাম। গাড়ি চাকার কাদার ছিটায় আমাদের কাপড় জামা কর্দমাক্ত হয়ে গেল। এরমধ্যে একজন বাগান কর্মী পথ দিয়ে যাচ্ছিল সে পরামর্শ দিল ” গাড়ি ইলা করিয়া কুনতা খাম অইত না। এখটা ট্রাক্টর দিয়া টানিয়া লইলে উঠিয়া যাইবো গি। ম্যানেজার বাবুরে খইয়া তাইনের ট্রাক্টর আনিয়া লউক্যা।” বাগান কর্মীর কথায় আমাদের খেয়াল হল আমরা এই কাজটা আগে কেন করলাম না। ড্রাইভার সেলিমকে পাঠালাম সিদ্দিকী ভাইয়ের কাছে। আমাদের বিপদের কথা জানিয়ে ট্রাক্টর চেয়ে আনতে। পুলিশ সদস্যরা চা খেতে সামান্য দূরে একটা চা শ্রমিকদের বসতি আছে সেখানে গেল। আমি আর জহির সাহেব গাড়ির পাশে অপেক্ষা করছি। পাহাড়ঘেরা এলাকা। পাহাড়ের গা বেয়ে চা গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে।

বর্ষাকালের মেঘলা আকাশ দেখতে বেশ ভালোই লাগছে। ভাগ্যিস এই সময় বৃষ্টি হচ্ছে না। তা নাহলে এখানেই কাক ভিজা হতে হতো। এর মাঝে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম সামান্য দূরে চাবাগানের ভিতর থেকে দুটো আলো আমাদের দিকে রাস্তা ধরে ধরে এগিয়ে আসছে খুব ধীরে ধীরে। আমি বুঝে ফেললাম এটা কি জিনিস। বিপদ আঁচ করে আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ওইদিক তাকিয়ে আছি। আমি দেখলাম জহিরুল হক সেটা খেয়ালই করেনি। আমি বিলম্ব না করে গাড়ি চাকাতে ঠেস দেয়ার জন্য একটা গাছের ডাল ছিল সেটা নিয়ে সামনে ধরে দাঁড়িয়ে থাকলাম। যদি কোন জন্তু হয় তবে লাঠি দেখে এগিয়ে আসবে না। জহিরুল সাহেবকে বললাম দেখেন কি একটা জন্তু আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তখন তিনি খেয়াল করলেন। তবে লাঠি হাতে নেয়ার পর সেটা আর এগিয়ে আসছে না কিন্তু পালিয়েও যাচ্ছেনা। ঠিক সেই মূহুর্তে ট্রাক্টরের ভটভট শব্দ পেলাম আর তার তীব্র হেড লাইটের আলোতে জন্তুটাকে এবার স্পষ্ট দেখতে পেলাম হলুদ ফোটা ফোটা দাগের একটা চিতা। তার লম্বাটে লেজ আর চোখের ভিতর থেকে মনে হচ্ছে আগুন জ্বলে উঠছে। লেজটা কয়েকবার ঘুরিয়ে পিছন ফিরে জংগলেই ঢুকে গেল। ভাগ্য ভাল যে ট্রাক্টর ওই সময় এসে পড়েছিল। নইলে কিছুটা বিপদ হতে পারতো।

যাহোক ট্রাক্টর আসলো পুলিশের জীপকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হল। ট্রাক্টরের বিশাল চাকা ওই গর্তে পড়লো। তাতে কিছুই আসে যায় না কারণ তার চাকার কাছে ওইগর্ত নস্যিমাত্র। এরপর এক টান দিতেই গাড়িটা খেলনা গাড়ির মত উঠে এলো। যা আমরা ছয়জন অনেক কসরত করেও কিছু করতে পারিনি। এরপর আমার গাড়িকে একইভাবে তোলা হল। আমার গাড়িটা এতই হালকা যে ট্রাক্টরের টানে মনে হল গাড়ি বাতাসে উড়ে যাচ্ছে। সকল বিপদের অবসান ঘটিয়ে রাত নয়টার সময় ঘরে ফিরে এলাম। বাসায় ফিরে ফোন করে সিদ্দিকী ভাইকে কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুললাম না।#

লেখক- প্রাক্তন কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও অবসরপ্রাপ্ত সচিব।