আগস্ট ২৭, ২০১৮
Home » জাতীয় » কুলাউড়ার একীভুত শিক্ষা- ‘ওদের চোখে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন’

কুলাউড়ার একীভুত শিক্ষা- ‘ওদের চোখে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন’

আজিজুল ইসলাম, ২৭ আগস্ট ::

সাব্বির আহমদ চুনঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্র। এক পা নেই। জš§গতভাবে শরীরিক অক্ষম (প্রতিবন্ধি)। কখনও স্ক্রাচে ভর করে, আবার কখনও হুইল চেয়ারে করে বিদ্যালয়ে নিয়ে আসেন মা বিউটি বেগম। ছুটি হলে নিতে আসেন। প্রতিদিন ছেলেটা স্কুলে আসতে চায়। স্কুলে নিয়ে আসতে যেতে মায়ের একটুও বিরক্তি নেই। এই বিউটি বেগমের ২ মেয়ে এবং একমাত্র ছেলে সাব্বির আহমদ সবার বড়। ছেলেটা যদি লেখাপড়া করে-এই আশায় মায়ের সব পিছুটান ফেলে আসেন।

বিদ্যালয় সুত্র জানা যায়, শুধু সাব্বির আহমদ নয় প্রথম শ্রেণিতে রুপন মালাকার বুদ্ধি প্রতিবন্ধি, মারজানা বেগম, সিক্ত দেবনাথ শ্রবণ প্রতিবন্ধি ও লাকি বেগম এই ৪ জন প্রতিবন্ধি শিশু রয়েছে। এছাড়া ২য় শ্রেণিতে কামরান আহমদ, জয় আলী, মারুফ মিয়া ও ইসন মালাকার এই ৪ জন, ৩য় শ্রেণিতে সৌরভ রায় ও ৪র্থ শ্রেণিতে জয় মালাকার এই ২ জন এবং ৫ম শ্রেণিতে রেহেনা আক্তার ও বিপ্লব মালাকার এই ২ জনসহ মোট ১৫ জন প্রতিবন্ধি শিশু লেখাপড়া করে শুধুমাত্র চুনঘর সরকারি প্রাথমিত বিদ্যালয়ে।

প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কুলাউড়া উপজেলায় ২০১৪ সালের মার্চ মাস থেকে ১০টি স্কুলে এই কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে ‘একীভুত শিক্ষা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প। এই এই প্রকল্পের সার্বিক সহযোগিতায় ১০টি স্কুলে প্রায় অর্ধশত প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। চুনঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়াও কুলাউড়ার রাবেয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বশিরুল হোসেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কুলাউড়া গ্রাম মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কামারকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘাগটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উত্তর চুনঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচাইল হোসেনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাদিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও আব্দুল হান্নান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এই প্রকল্প কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। মুলত এই প্রকল্পটি প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা প্রচেষ্টার সহায়তায় উপজেলা শিক্ষা বিভাগের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়ে আসছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ও উপজেলা রিসোর্স সেন্টার সুতে জানা যায়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে বেসিক ট্রেনিং অন ইনক্লুসিভ এডুকেশন, বেসিক ট্রেনিং ফর শিশু বিকাশ কেন্দ্র, ট্রেনিং অন ব্রেইল, ট্রেনিং অন সাইন ল্যাংগুয়েজ, বেসিক ট্রেনিং অন ইনক্লুসিভ পেডাগোজি, ট্রেনিং অন লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট ও রিফ্রেশার্স ট্রেনিং অন ইনক্লুসিভ পেডাগোজি এসব প্রশিক্ষণ দেয়া হয় ৭০ জন শিক্ষক ও ৬০ জন যত্ন সহকারিকে।

এছাড়া এসব প্রতিবন্ধি শিশুর জন্য প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ও স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা প্রচেস্টার ‍ উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সহায়ক যন্ত্রপাতি দেয়া হয়। যেমন হুইল চেয়ার, শ্রবণ যন্ত্র, স্ক্রাচ ইত্যাদি।

চুনঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. জয়নাল আবেদীন জানান, এলাকায় বাড়ি বাড়ি খোঁজ নিয়ে এসব প্রতিবন্ধি শিশুদের খোঁজে বের করি। যেমন-সাব্বির। ৬ বছর বাড়িতে ছিলো। তাকে এক বছর শিশু বিকাশ কেন্দ্রে রেখে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এখন সে নিয়মিত স্কুলে আসছে। লেখাপড়ায় এরা আবার খুবই আন্তরিক। ক্লাসে সহকর্মীরা এদের সাথে নিয়ে খেলাধুলা এমনকি বিদ্যালয় ছুটি হলে বাড়িতে এগিয়ে দিয়ে আসে। আমি মনে করি, সবার জন্য একিভুত শিক্ষা কিংবা মান সম্মত শিক্ষা বাস্তবায়ন করতে হলে ছাত্রছাত্রীর অনুপাতিক হারে শিক্ষক স্বল্পতা দুর করতে হবে। কেননা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধার তারতম্যে কেউ কেউ বেশ এগিয়ে। আবার যারা পিছিয়ে তারা অনেব বেশি পিছিয়ে।

উচাইল হোসেনপুরসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হেনা বেগম জানান, আমার স্কুলে ফাইজা জান্নাত স্নেহা ও সবুজ বিশ্বাস নামে ৩য় শ্রেণিতে ২ জন মানসকি প্রতিবন্ধি শিশু রয়েছে। আমি ও আমার শিক্ষকরা তাদের প্রতি একটু বেশি যত্নশীল।

কুলাউড়া উপজেলা রিসোর্স সেন্টারের প্রশিক্ষক আফসানা আক্তার জানান, প্রাথমিক শিক্ষায় কুলাউড়ার অনেক সাফল্য আছে যেমন চুনঘর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দেশসোরা স্কুল, কুলাউড়ার শিক্ষা অফিসার শরীফ উল ইসলাম ছিলেন দেশসেরা, ইনোভেশনে আমার স্বপ্ন আমার স্কুল দেশসেরা। কুলাউড়ায় পরিচালিত এই একীভুত শিক্ষাও কার্যক্রমও দেশসেরার স্বীকৃতি পাওয়ার দাবিদার। কুলাউড়ায় এই প্রকল্পের কার্যক্রম দ্রুত সম্প্রসারিত ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সেই উপযোগি করে গড়ে তোলা হচ্ছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার জানান, প্রতিবন্ধি শিশুদের মানসিক বিকাশে তার সহকর্মী শিক্ষার্থী এবং শিক্ষকদের একটা বড় ভুমিকা রয়েছে। কুলাউড়ায় অবশ্য ইতোমধ্যে বিষয়টি কাটিয়ে উঠে একীভুত শিক্ষাটা অনেক দুর এগিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০টি বিদ্যালয়ে একীভুত শিক্ষা কার্যক্রমে বেশ সাফল্য এসেছে। ফলে আরও ১০টি বিদ্যালয়ে এই কার্যক্রম সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে প্রধান শিক্ষকদের গেজেটেড ঘোষণা করা হয়েছে। যদি সেই নিয়ম অনুযায়ি ৩ বছর পর বদলী বাধ্যতামুলক করা হয়, তবে সবার জন্য মান সম্মত শিক্ষা কিংবা একীভুত শিক্ষায় আরও সুফল আসতো। কেননা ৩বছর পর একজন ভালো শিক্ষক নতুন বিদ্যালয়ে গিয়ে সেটিকে যুগোপযোগি করে সাজাবেন।#