সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮
Home » জাতীয় » হাকালুকি হাওর জুড়ে নিষিদ্ধ জালের ছড়াছড়ি : মাছ লুটের মহোৎসব

হাকালুকি হাওর জুড়ে নিষিদ্ধ জালের ছড়াছড়ি : মাছ লুটের মহোৎসব

আজিজুল ইসলাম, ১৬ সেপ্টেম্বর ::

এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির পানি কমতে শুরু করেছে। সেই সাথে হাওরে নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ লুটের যেন মহোৎসব শুরু হয়েছে। চলতি বছর অবৈধ জাল আটকে বড় ধরনের কোন অভিযান না হওয়ায় মাছ লুটেরারা অনেকটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। হাওর থেকে অবৈধভাবে শিকার করা লক্ষ লক্ষ টাকার মাছ রাতের আধারে দেশের বিভিন্ন শহরে পাঠানো হয়। প্রশাসন রহস্যময় কারণে নির্বিকার।

সরেজমিন হাকালুকি হাওরে গেলে চোখে পড়ে মাছ শিকারিদের তান্ডবলিলা। যেদিকে চোখ যায় সাদা জলে জাল টানার দৃশ্যই বেশি চোখে পড়ে। প্রভাবশালীরা গ্রুপবদ্ধ হয়ে টানছে বেড়জাল। ৪-৫ হাজার ফুট প্রশস্থ এসব জালে ছোট পুটি মাছ থেকে শুরু করে সবধরনের বড় মাছ ধরা পড়ে। ছোট নৌকায় গরিব জেলেরা কারেন্ট জাল আর কাপড়ি জাল দিয়ে নিজেদের সাধ্যমত ছোট মাছ শিকার করে। কেউ কেউ চাই (এক ধরনের মাছ শিকারের ফাঁদ) দিয়ে টেংরা মাছ শিকার করতে ব্যস্ত সময় পার করছে। আরেকটি চক্র আস্তে আস্তে নৌকায় দাঁড়িয়ে চিংড়ি মাছ শিকার করছেন। বেড়জাল দিয়ে মাছ শিকারিদের ছবি তুলতে গেলে নিষেধ করে জাল টানতে থাকা জেলেরা। ঝুঁকি নিয়েই তুলতে হয় এসব অবৈধভাবে জাল টানা মাছ শিকারিদের।

জানা যায়, হাকালুকি হাওর তীরে কয়েকটি সংঘবদ্ধ লুটেরা চক্র রয়েছে। যাদের কাছে রয়েছে ২ থেকে ৫ হাজার ফুট দীর্ঘ একেকটি বেড় জাল। এসব বেড় জালে বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টানা চলে অবিরাম। একেকটি বেড়জাল টানতে ৩০-৪০ জনের জেলে লাগে। এসব বেড় জালের কারণে হাওরে মাছের বংশ তো নিরবংশ হচ্ছে। এমনকি হাওরে জলজ উদ্ভিদ কিংবা শেওলাও জন্ম নিতে পারে না। রাত নেই দিন নেই সমানতালে চলে জাল টানা। সময়ের সাথে জেলের পরিবর্তণ হয় কিন্তু মাছ শিকার বন্ধ হয় না। দিনে শিকার করা মাছ বরফজাত করে রাখা হয়। দিনের মাছগুলো রাত ১০-১১ টায় বিক্রি হয়। আর রাতের মাছ শেষ রাতে বিক্রি হয়ে থাকে।

হাওর থেকে অবৈধভাবে শিকার করা এসব মাছ পিক আপ ভ্যান যোগে দেশের বিভিন্ন হাট বাজারে নিয়ে যান বিক্রেতারা। পুলিশ এসব ভ্যান থেকে মাসোহারা পেয়ে থাকে বলে জানা গেছে। ফলে তাদের মাছ নির্বিঘেœ নিয়ে যেতে কেউ কোন বাঁধা দেয় না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিল ইজারাদারেরা এই চক্রের অন্ত:র্ভুক্ত। ফলে শিকারে মাছের একটা ভাগ যায় তীরবর্তী উপজেলার ক্ষমতাসীন দলের নেতা, প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বাসায়। ফলে হাওরের প্রতি এখন সবার নজর একটু কম।

হাওর তীরের জুড়ী উপজেলার বেলাগাঁও গ্রামের আব্দুর রব, ছবির মিয়া, জলিল, কাজলের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ চক্র হাকালুকি হাওরে চাতলা বিল এলাকা এবং কুলাউড়া উপজেলার সাদিপুর এলাকার নজম উদ্দিন, বাহুল উদ্দিন, মুস্তাকিন আলী ও আহছান উল্লাহর নেতৃত্বে চকিয়া বিল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলা অংশেও পৃথক গ্রুপ বেড়জাল দিযে মাছ শিকারে হাওর বিভিন্ন বিল এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এসব গ্রুপ আবার ছোট ছোট নৌকা দিয়ে মাছ শিকার করা জেলেদের নিয়ন্ত্রণ করে।

কুলাউড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুলতান মাহমুদ জানান, গত ১২ সেপ্টেম্বর বুধবার তিনি হাকালুকি হাওরের কুলাউড়া উপজেলার ভাটেরা ইউনিয়নে কিছু এলাকায় অবৈধ জাল আটক করেন। তবে হাওর তীরবর্তী সকল উপজেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে হাকালুকি হাওরে এবার কোন অভিযান হয়নি। একা মৎস্য বিভাগের পক্ষে অভিযান পরিচালনা করা সম্ভবও না। অভিযান না হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান, উপজেলা পর্যায়ে সমন্বয় করাটা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আর অভিযান করা সম্ভব হয় না। তারপরও এক সপ্তাহের মধ্যে একটা বড় ধরনের অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।#