- জাতীয়, ব্রেকিং নিউজ, মৌলভীবাজার, স্থানীয়, স্লাইডার

বড়লেখায় বরুদল নদীর ভাঙন পাকা রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে হুমকির মুখে ১৩০ বসত বাড়ি

আব্দুর রব, বড়লেখা, ১৭ সোমবার ::

মৌলভীবাজারের বড়লেখার বর্ণি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বরুদল নদীর ভাঙনে বিলীন হচ্ছে মনাদী-মনারাই পাকা রাস্তা। এ রাস্তা দিয়ে ২নম্বর ওয়ার্ডের মনাদী, মনারাই, রংপুর, পাকশাইল ও পূর্ব মনারাইসহ অন্তত দশটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চলাচল করেন। গত বর্ষায় মনাদী-মনারাই পাকা রাস্তার অন্তত দেড়শ মিটার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে যানবাহন। হুমকিতে রয়েছে আশপাশের অন্তত ৫০টি বসতভিটা।

অপরদিকে ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী এলাকার মুদৎপুর গ্রাম, মিহারি-ফকিরবাজার সংযোগ রাস্তায়ও ভাঙন ধরেছে। স্থানীয়রা বাঁশের বেড়া দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করছেন। অব্যাহত ভাঙনের ফলে ৪নং ওয়ার্ডের মুদৎপুর ও ৮নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব শিলকুরা গ্রামের নদী পাড়ের প্রায় ৮০টি বসতভিটা এখন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। পানি বৃদ্ধি পেলে এসব বসত ভিটে নদীতে বিলীন হওয়ার আশংকা রয়েছে।

এদিকে প্রতি বছরের বর্ষায় আতঙ্কে থাকেন নাদী পাড়ের বাসিন্দারা। দেড় দশকে নদী ভাঙনে বসত ভিটা হারিয়েছে অন্তত ৫০ পরিবার। নদীতে বিলীন হয়েছে মসজিদ, কবরস্থান। ভাঙন রোধে স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় দীর্ঘদিন থেকে এ অবস্থা চলছে। বর্ষাকালে নদীর ভাঙনে রাস্তা বিলীন হওয়াসহ বসতবাড়ি ও আবাদি জমি হুমকির মুখে রয়েছে। ফলে গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়াসহ তৈরি হয়েছে সব হারানোর ভয়। ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার দাবী জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

জানা গেছে, আনুমানিক ২ যুগ থেকে বরুদল নদীতে ভাঙন দেখা দেয়। নদীটির বর্তমান অবস্থান থেকে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার পূর্বে ছিল। ভাঙন রোধে কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় তখন থেকে গ্রামের বসত ভিটে, মসজিদ ও রাস্তা নদীগর্ভে তলিয়ে যায়। অব্যাহত ভাঙনে অর্ধশতাধিক বসতঘরও চলে যায় নদীগর্ভে। ভাঙন রোধে দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো গ্রাম নদীতে বিলীন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরেজমিনে মনাদি, মনরাই, মুদৎপুর গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বর্ষায় নদীর ভাঙনে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। রাস্তা ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া কিছু কিছু বসত ঘরের উঠান ইতিমধ্যে বিলীন হয়ে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে ঘরও চলে যেতে পারে নদীতে।

স্থানীয়রা জানান, এ বছর কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে কাজ করা হয়। কিন্তু এ কাজে উপকারের চেয়ে ক্ষতিই হয়েছে। নতুন করে ভূমি ভেঙেছে। ভেঙেছে রাস্তা।

স্থানীয় মুহাম্মদ কামাল উদ্দিন ও বেলাল উদ্দিন বলেন, ‘যেভাবে ভাঙন চলছে দ্রুত রোধ করা না হলে গ্রামের আরও অনেক বাড়িঘর নদীর গর্ভে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাস্তা ভাঙায় মানুষের দুর্ভোগ বেড়ে গেছে। নদী পাড়ের বাসিন্দারা খুব কষ্টে আছেন। দীর্ঘদিন থেকে ভাঙলেও কেউ এদিকে নজর (দৃষ্টি) দেয় না। মানুষ সীমাহীন কষ্ট করতেছে।’ মনাদী গ্রামের জয়নাল আবেদীন, আব্দুল মালিক ও ময়নুল হক বলেন, ‘কতবার বর্ষাত নদী ভাঙিয়া জায়গা নিছে। আবার ভাঙলে যাইবার আর জায়গা নাই। রাস্তাটায় কাম অইলে (কাজ হলে) আর নদীতে গার্ড ওয়াল দিয়া ঠিক করি দিলে হয়তো বাকিটা রক্ষা পাইবো।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য সামাদ আহমদ জানান, ‘মুদৎপুর গ্রাম, মিহারি-ফকিরবাজার সংযোগ রাস্তায়ও ভাঙন দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে এখানে ভাঙছে। বাড়ি ঘর ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষ খুব কষ্ট করের। স্থায়ীভাবে এ কাজগুলো করে বাড়ি ঘর রক্ষা করা দরকার। এদের আর যাবার যায়গা নেই।’

মনাদি গ্রামের মুরব্বি সুফিযান আলী বলেন, ‘রাস্তা ভেঙে নদীতে পড়েছে। এখন গ্রামে গাড়ি যেতে পারে না। আত্মীয়-স্বজন আসলে পায়ে হেঁটে বাড়িতে যান। বিশেষ করে রোগীদের অবর্ণনীয় কষ্ট। জরুরি সময়ে অ্যাম্বুলেন্স গ্রামে ঢুকে না। আমরা কি পরিমাণ কষ্টে তা বুঝানো যাবে না। প্রায় ৩০ বছর ধরে ভাঙছে। আর আমরা পশ্চিম দিকে সরছি। আর ভাঙলে যাওয়ার জায়গা নেই। এই দুর্ভোগ থেকে কবে মুক্তি হবে জানি না।’

বর্ণি ইউনিয়নের বাসিন্দা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল মোহিত জানান, ‘নদীর পাড়ের রাস্তাটি অর্ধ কিলোমিটার পূর্বে ছিল। ভাঙনের ফলে পশ্চিম দিকে সরেছে অনেক বছর হয়। অনেক পরিবার ভাঙনের ফলে জায়গা ছেড়েছে। বিভিন্নভাবে মানুষ ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছে। মনাদি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র ও মৎস্যজীবী। বাড়ি ঘর আর ভাঙলে মেরামত করার সামর্থ তাদের নাই। দ্রুত এ ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।’

বর্ণি ইউপি চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) শাহাব উদ্দিন জানান, ‘ভাঙনের ফলে রাস্তার অবস্থা বেহাল। বাড়ি ঘর ঝুঁকিতে। গত দুই যুগ থেকে ৩টি ওয়ার্ডে ভাঙছে। আর মানুষ অন্যত্র ঘরবাড়ি করছে। এখন যে অবস্থায় আছে। আর ভাঙলে মানুষের যাওয়ার জায়গা থাকবে না। স্থায়ীভাবে এটার সমাধান করা দরকার। নাদীপাড়ের আশপাশের অন্তত ১৫০ পরিবার ভাঙনের মুখে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ শাহাব উদ্দিন মহোদয় সরেজমিনে অবস্থা দেখে গেছেন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন দেখে গেছেন। দ্রুত ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবী জানাচ্ছি।’

এ ব্যাপারে পাউবোর (পানি উন্নয়ন বোর্ড) মৌলভীবাজার কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্ত্তী জানান, ‘এ বছর দুই জায়গায় কিছু কাজ হয়েছিল। ভাঙনের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে অবহিত হয়েছি। ভাঙন রোধের জন্য বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। শীঘ্রই সরেজমিনে ভাঙনস্থল পরিদর্শন করা হবে। স্থায়ীভাবে কাজ করতে হলে বড় বাজেটের প্রয়োজন। এতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। নতুন করে যাতে না ভাঙে সে জন্য অস্থায়ী ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়নের জন্য প্রাক্কলন প্রস্তুত করে বাজেট চাহিদা বোর্ডে প্রেরণ করা হবে। বরাদ্ধ প্রাপ্তি সাপেক্ষে কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।’#

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *