সেপ্টেম্বর ২২, ২০১৮
Home » নির্বাচিত » আশুরা সম্পর্কিত মিথ্যা কল্প কাহিনী!

আশুরা সম্পর্কিত মিথ্যা কল্প কাহিনী!

সাইফুল্লাহ বিন নামর, ২২ সেপ্টেম্বর :: মুহাররাম মাস ও আশুরার দিনটি অত্যন্ত মর্যাদাবান ও তাৎপর্যপূর্ণ। আশুরার মাহাত্ম্য ও শ্রেষ্ঠত্ব সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত। এই দিনে আল্লাহ তা’আলা ফেরাউনকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন এবং মুসা আলাইহিস সালাম ও উনার সঙ্গী সাথীদেরকে সমুদ্র পার করে পরিত্রাণ দিয়েছিলেন। সর্বশেষ ৬১ হিজরীর আশুরার দিনে ঐতিহাসিক কারবালার প্রান্তরে এজিদ বাহিনীর হাতে রাসূল (সাঃ)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন (রাঃ) সহ আহলে বায়েতের অনেক সদস্য নির্মমভাবে শাহাদাত বরণ করেন। কারবালার ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও নির্মম ঘটনা। যার নির্মমতা নিষ্ঠুরতা স্মরিত হলে আজও মুমিন হৃদয়গুলো কেঁদে উঠে।

উপরোল্লিখিত ঘটনাদ্বয় সুপ্রমাণিত। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় বর্তমানে আলেম সমাজের অনেকেই যাচাই-বাচাই করার অভাবে কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় পড়াশোনা কম করার কারণে অজ্ঞতাবশত আশুরার মতো একটি মর্যাদাবান ও তাৎপর্যপূর্ণ দিনের সাথে অনেক মিথ্যা কল্প কাহিনী জুড়ে দিচ্ছেন দেদারছে। এই কল্প কাহিনীগুলোর সংখ্যাধিক্য দেখে মনে হয় যেন ইসলামের ইতিহাসের সবকিছুই এই আশুরায় ঘটেছে। অতচ এই কাহিনীগুলোর একটিও প্রমাণিত নয়। শুধু তাই নয়-আমরা প্রত্যেকেই জানি আশুরার দিনে সাওম রাখা সহীহ হাদীস অনুযায়ী প্রমাণিত।

নবী করীম (সাঃ) আশুরা উপলক্ষ্যে দু’টি রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। আশুরার সাওম ও সাওমের ফজিলত অকাট্যভাবে প্রমাণিত। কিন্তু আজকাল এই সাওমের ফজিলত বর্ণনা করতে গিয়ে অনেকেই বাড়িয়ে বাড়িয়ে এমন কিছু জাল ফজিলত বর্ণনা করেন। যা কোনো কিতাবেই খুঁজে পাওয়া যায় না। তন্মধ্যে কতিপয় ফজিলতের বর্ণনা পাওয়া গেলেও তা বিভিন্ন মাওজু হাদীসের কিতাবে পাওয়া যায়। মাওজু বলতে আয়্যিম্মায়ে কেরাম হাদীসের নামে বানোয়াট মিথ্যা বর্ণনাগুলি একত্রিত করে কিতাব সংকলন করে উম্মতকে সতর্ক করে গেছেন।

নিম্নে আশুরার সাথে জুড়ে দেওয়া মিথ্যা কল্প কাহিনীগুলো উল্লেখ করলাম-
১। এই দিনে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন আসমান, জমিন, জান্নাত সৃষ্টি করেছেন।
২। এই দিনে আদম (আঃ)-কে সৃষ্টি করেছেন, জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন। আদম ও হাওয়া (আঃ)-কে জান্নাত থেকে বের করেছেন, তাওবা কবুল হয়েছে ইত্যাদি।
৩। এই দিনে হজরত নূহ আলাইহিস সালামের কিস্তিকে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন মহা প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। এসম্পর্কিত একটি হাদীস মুসনাদে আহমাদে এসেছে। তবে হাদীসটি দ্বঈফ তথা দূর্বল।
৪। এই দিনে হজরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন নমরুদের অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা করেছিলেন।
৫। এই দিনে আল্লাহ পাক আব্বুল আলামিন হজরত ইদ্রিস আলাইহিস সালামকে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। এসম্পর্কে হাদীসে একটি ইসরাঈলী বর্ণনা রয়েছে। তবে ঘটনাটি এই দিনেই অর্থাৎ ১০ ই মুহাররাম ঘটেছে মর্মে কোনো প্রমাণ নেই।
৬। এই দিনে আল্লাহ তা’আলা মুসা আলাইহিস সালামকে তাওরাত দিয়েছেন। এই দিনে আল্লাহ তা’আলা উনার সাথে কথা বলেছেন।
৭। এই দিনে হজরত আইয়ুব আলাইহিস সালামকে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন কঠিন অসুখ থেকে শিফা দান করেছিলেন।
৮। এই দিনে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন হজরত ইউসুফ আলাইহিস সালামকে উনার পিতা হজরত ইয়াকুব আলাইহিস সালামের নিকট ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
৯। এই দিনে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিন হজরত ইউনুস আলাইহিস সালামকে মাছের পেটে বিপদে ফেলেছিলেন এবং এই দিনেই উনাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেছিলেন।
১০। এই দিনেই সুলাইমান আলাইহিস সালাম সিংহাসন হারিয়েছিলেন। এই দিনেই ফেরত পেয়েছেন। উক্ত ঘটনা আশুরার দিনেই ঘটেছে মর্মে কোন প্রমাণ নেই।
১১। এই দিনে হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে জীবিত অবস্থায় আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়।
১২। এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। অতচ হাদীসে আছে শুক্রবার কিয়ামত হবে। সেই শুক্রবার আশুরার দিন হতে পারে আবার নাও হতে পারে। আশুরার দিনেই কিয়ামত হবে মর্মে কোনো প্রমাণ নেই।

উপরোল্লিখিত ঘটনাগুলোর মধ্যে নূহ আলাহিস সালামের ঘটনাটি অত্যন্ত দূর্বল সনদে প্রমাণিত। ঈদ্রিস আলাহিস সালামের ঘটনাটি ঈসরাইলি বর্ণনা কিন্তু আশুরার দিনেই ঘটেছে মর্মে কোন প্রমাণ নেই। এছাড়া বাকী বর্ণনাগুলো মিথ্যা কল্প কাহিনী। আশুরার দিনের সাথে নবী-রাসূল ও ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোকে জুড়ে দিয়ে আমরা উপরন্তু নবীদের উপরেই মিথ্যাচার করছি। আল্লাহ যেন আমাদেরকে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করেন। কোনো তথ্য কাউকে বলার পূর্বে আমাদের উচিত যাচাই বাচাই করে বলা। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা কিছু শোনে [বিনা বিচারে] তা-ই বর্ণনা করে। [মুসলিম ৫, আবু দাউদ ৪৯৯২]

 

লেখক: শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া