অক্টোবর ৯, ২০১৮
Home » অর্থ ও বাণিজ্য » কৃষি জমিতে পোকা নিধনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘পার্চিং পদ্ধতি’

কৃষি জমিতে পোকা নিধনে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘পার্চিং পদ্ধতি’

আব্দুর রহমান শাহীন, জুড়ী, ০৯ অক্টোবর ::

‘পার্চিং পদ্ধতি’। আনুধিক কৃষিতে নতুন এ পদ্ধতিটির নাম যুক্ত হয়েছে। ফসলি জমিতে ক্ষতিকর পোকা-মাকড় দমনে গাছের ডাল পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থাকে ‘পার্চিং পদ্ধতি’ বলা হয়। এ পন্থা অনুসরণের মাধ্যমে যেমন বিষমুক্ত খাদ্যশষ্য উৎপাদন করা সম্ভব, তেমনই ফসলি জমিতে কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। যার ফলে কৃষকদের প্রতি কেয়ার জমিতে ৩০০/৫০০শ টাকা আয় করা সম্ভব হবে।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার শতকরা ৮০ভাগ কৃষক ধানক্ষেত এ পদ্ধতিটিকে আর্শিবাদ স্বরুপ গ্রহণ করছেন। তাদের কাছে পোকা-মাকড় দমনে এটি জনপ্রিয় একটি পদ্ধতি হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, কৃষিবিদরা ‘পার্চিং পদ্ধতি’কে নতুন পদ্ধতি মনে করলেও এটি প্রাচীন একটি পদ্ধতি বলে দাবি করছেন প্রবীন কৃষকরা। বিগত দু’যুগ পূর্বে কৃষকরা এ পদ্ধতিতে ধানক্ষেতের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় নিধন করতেন। গেল কয়েক বছর থেকে কৃষিতে নতুন যন্ত্রাপাতি পাশাপাশি পোকা-মাকড় নিধনে বিভিন্ন ধরনের কীটনাশক জাতের ঔষধের আবির্ভাব হয়। এতে নবীন কৃষকরা পুরুনো পদ্ধতি বর্জন করে নতুন পদ্ধতি হিসেবে কীটনাশক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে বিলুপ্ত হয়ে যায় প্রাচীন পদ্ধতি ‘পার্চিং’।

কীটনাশক আক্রান্ত পোকার সঙ্গে সঙ্গে নিধন হতে শুরু হয় পোকা শিকারি প্রধান পাখি ‘ফিঙে’ও। কীটনাশক ব্যবহারী ফসল থেকে পোকা-মাকড় খেয়ে প্রাণ হারায় অসংখ্য ফিঙে। বিগত কয়েক বছরে এ উপজেলায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ফিঙে কীটনাশক স্প্রে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। সচেতন মহল মনে করছেন, সংশ্লিষ্ট বিভাগ যদি এখনই রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তাহলে এ পাখিটির বংশ বিস্তারে বেশি সময়ের প্রয়োজন হবে না।

গোয়ালবাড়ি ইউপির প্রবীন কৃষক নাজির আহমদ (৭৫) বলেন, আজ থেকে ২০/৩০ বছর পূর্বে ক্ষতিকর পোকা নিধনে এতো বেশি কীটনাশক জাতি ঔষধের ব্যবহার ছিল না। তখন গাছের ডাল জমিতে পুঁতে পাখি বসিয়ে পোকা নিধনই ছিল একমাত্র উপায়। তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছরে যে পরিমাণে কীটনাশক ব্যবহার করা হয়েছে, তাতে পোকা সঙ্গে সঙ্গে শিকারি পাখি মওে কমে যাওয়াটাই তো স্বাভাবিক ব্যাপার।

বর্তমানে কৃষিবিদ ও কৃষকেদেও অশান্ত পরিশ্রমের ফলে, আবারও কৃষি ফিরতে চলছে প্রাকৃতিক ঠিকানায় (The Natural Address is going to Return to Agriculture again)। কৃষি বিভাগ আলোক ফাঁদ পদ্ধতি অর্থ্যাৎ ২/৩ ফুট লম্বা ৩টি বাঁশ একত্রিত কওে বাঁশের উপর রশি দিয়ে বেঁধে তাতে এশটি পাত্র ঝুঁলানো হয়। ঝুঁলিয়ে থাকা পাত্রের মধ্যে পানিতে সাবান কিংবা ডিটারজেন্ট পাউটার মিশিয়ে এশটি বাতি (লাইট) জ্বালিয়ে রাখা হয়, এতে পোকা জমা হতে থাকে। ফলে সহজেই শনাক্ত করা যায় ক্ষতিকর পোকার সংখ্যা। আর আলোক ফাঁদ পদ্ধতিতেই বিভিন্ন এলাকায় ধানের ক্ষতিকর পোকা যেমন-মাজরা পোকা, পাতা মুড়ানো পোকা ও শীষকাটা লেদা পোকা শনাক্ত কওে পার্চিং পদ্ধতিসহ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে কৃষকদেও পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্টরা।

বড়ধামাই গ্রামের মঈন উদ্দিন বলেন, “পার্চিং পদ্ধতি এশটি সহজ উপায়। ধানক্ষেতে গাছের ডাল পুঁতে দিলে পাখি বসে পোকা খেয়ে ফেলে। ফলে জমিতে কীটনাশক স্প্রে দিতে হয় না। এতে অতিরিক্ত খরচ থেকে রেহাই পাওয়া যায়।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ৮ হাজার ৩৩২ হেক্টও জমিতে রোপা আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তন্মধ্যে শতকরা ৭৫/৮০ ভাগ জমিতেই কৃষকরা কীটনাশকের পরিবর্তে পার্চিং পদ্ধতির দিকে ঝুঁকেছেন।

সরেজমিনে উপজেলার গোয়ালবাড়ি, পূর্বজুড়ী, জায়ফরনগর, সাগরনাল ইউনিয়ন পরিদর্শনে দেখা গেছে, চৌদিকে সবুজ মাঠের ধানক্ষেতের মাঝে কৃষকরা ৩/৫ ফুট লম্বা গাছের ডাল ও বাঁশ পুঁতে, তার উপওে একগুচ্চ খড় বেঁধে পাখি বসার সুন্দও ব্যবস্থা কওে দিয়েছেন। আর এতে ফিঙে সহ পোকা খেকো পাখি বসছে ও মনের আনন্দে পোকা-মাকড় শিকার করছে। স্থানীয় কষকদেও সাথে আলাপ কওে জানা গেছে, যে জমিতে পোকা বেশি রয়েছে, সেখানে পাখির বেশি আনাগোনা রয়েছে। কিভাবে ক্ষতিকর পোকা দমন করতে হবে? সে বিষয়ে কৃষি কর্মকর্তারা এসে তাদেরকে টেনিং দিয়েছেন।

জুড়ী উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষ্ণ রায় বলেন, “পার্চিং পদ্ধতি হচ্ছে একটি প্রাকৃতিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি। এতে কৃষকের কোন খরচ হয় না। শুধু গাছের ডাল জমিতে পুঁতে দিলেই পাখি বসে সহজে পোকা শিকার করতে পারে। কৃষকরা এ পদ্ধতি খুব সহজে গ্রহণ করেছে।”