অক্টোবর ১১, ২০১৮
Home » আন্তর্জাতিক » আমিরাতের ডায়রি-০২: দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে এশিয়া কাপের ফাইনাল দর্শণ

আমিরাতের ডায়রি-০২: দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে এশিয়া কাপের ফাইনাল দর্শণ

আজিজুল ইসলাম, আরব আমিরাত, ১১ অক্টোবর ::

সংযুক্ত আরব আমিরাত এয়ারপোর্টে ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে যখন নামলাম তখন দুবাই আন্তর্জাতিক মাঠে বাংলাদেশ বনাম পাকিস্তানের মধ্যে ফাইনালে উঠার লড়াই চলছে। বাংলাদেশের বোলারদের তোপের মুখে পাক ব্যাটসম্যানদের আসা যাওয়ার পালার শেষ দৃশ্যটা টিভিতে দেখতে পেলাম। শেষতক যোগ্যতম দল হিসেবে ফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। রাতেই সিদ্ধান্ত হলো ফাইনাল ম্যাচ মাঠে গিয়েই দেখতে হবে।

সুদুর বাংলাদেশ থেকে আরব আমিরাতে এসেছি। মাঠে উপস্থিত থেকে বাংলাদেশের টাইগারদের সমর্থণ জানানোর এই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনা। আমার এই ইচ্ছাটুকু বাস্তবায়নে সহযাত্রী বাশার ভাই উদ্যোগী হলেন। টিকিট খুঁজতে গিয়ে উনার শ্যালক রনির দ্বারস্থ হলেন। পাকিস্তান ফাইনাল খেলবে বলে তাদের সমর্থকরা আগেই অনলাইনে টিকেট কেটে রেখেছিলো। কিন্তু বাংলাদেশে তাদের স্বপ্ন ভঙ্গ হয়। পাকিস্তানীরা আগে টিকেট কেটে রাখায় ফাইনাল ম্যাচের টিকেট নিয়ে হাহাকার শুরু হয়। রনি আশ্বাস দিলেন ৪ টি টিকিটের।

একশ টাকার টিকেট তিনি কিনে নিলেন তিনশ টাকা করে। দাম তিনগুণ হলেও দেখতে হবে বাংলাদেশের খেলা তাও আবার ফাইনাল ম্যাচ। গাড়ি চালকসহ আমরা ৪ দর্শক ফাইনাল ম্যাচ দেখতে মাঠের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আমরা মাঠের কাছে গিয়ে কোন খেলার সাড়াশব্দ না পেয়ে হতাশ। এ কোথায় এলাম। আমরা যে মাঠে উপস্থিত হলাম সেটি ছিলো অন্য মাঠ। এবার প্রযুক্তির দ্বারস্থ হলেন রনি। তাতে আমাদের মাঠ বিভ্রাট দুর হলো। আমাদের গাড়ি দ্রুত ছুটতে লাগালো ফাইনাল ভেন্যু দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের দিকে। যতক্ষণে আমাদের গাড়ি গিয়ে গন্তব্যে পৌঁছলো ততক্ষণে খেলার প্রায় এক ঘন্টা শেষ। তারপর পার্কিং ঝামেলা, ইন্টারনেটের টিকেট চেকিং সব ঝামেলা মিটিয়ে আমরা মাঠের পূর্ব গ্যালারিতে যখন গিয়ে পৌছলাম তখন স্কোরবোর্ডের দিকে তাকিয়ে পেছনের সকল ক্লান্তি নিমিষেই ভুলে গেলাম।

মেহেদি হাসান মিরাজকে ওপেন করতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ভুল ছিলো না। কেননা যুব বিশ^কাপে সে যেভাবে ব্যাটে বলে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছে, কেন যে জাতীয় দলে এসে নিজেকে প্রমাণ করতে পারছে না?-সেটাই ছিলো অবাক হবার মত ব্যাপার। ভারতীয় দর্শকরা বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে ছিলো গ্যালারির। আমরাও বাংলাদেশী দর্শক যেখানে বেশি সেদিকে ছুটলাম। বড় একটি বাংলাদেশী পতাকা একদল তরুণ দর্শকের পাশেই আসন নিলাম। যখন মেহেদি হাসান মিরাজ আউট হলেন তখন ভারতীয় দর্শকদের যে কি উচ্ছ্বাস- মনে হলো তারা ম্যাচটা জিতেই গেছে। মাঠে খেলোয়াড়দের চেয়ে ভারতীয় দর্শকদের সামাল দেয়া যেন মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার পেছনে ১৭-১৮ বছরের কিছু কিশোরি দর্শকের চিৎকার আর নাচানাচিতে বিব্রতই হলাম। যতটা সময় স্টেডিয়ামে ছিলাম পুরোটা সময়ে ওরা চিৎকার করেছে, নেচে গেয়ে আর বাংলাদেশী খেলোয়াড়দের বিদ্রুপ করেই কাটিয়েছে।

দেখে মনে হলো আমরা বাংলাদেশীরা তাদের মত সমর্থণ জানাতে পারিনি। ওদের এমন সমর্থণ আমার কাছে তাদের দেশপ্রেমই মনে হয়েছে। বাংলাদেশী ব্যাটসম্যানরা এক রান নিলে ওরা চিৎকার কওে বলে, টেস্ট খেলা শুরু হুয়া। মাঠে দর্শকদের মত একপাশে টাইগার লিটন আর অন্যপাশে ভারতীয় সিধু বড় পতাকা হাতে দু’দলকে সমর্থণ জানান। লিটন দাসের বিতর্কিত আউট মাঠের বড় ডিসপ্লেতে দেখানো হয়নি। যদি দেখানো হতো হয়তোবা মাঠেই একটা বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারতো। খেলার যখন মধ্যাহ্ন বিরতি চলছে, তখন আমার সামনের এক বাংলাদেশী সমর্থক আমাকে ইশারায় ডাকছে। কাছে এসে তরুণ যুবকটি জানালেন, তার বাড়ি কুলাউড়ার পূর্বমনসুর গ্রামে।

আমি তাকে ভাই বলতে, তিনি আপত্তি জানাালেন। চাচা বলে সম্ভোধন করে নিজেকে ভাতিজা দাবি করলেন। স্টেডিয়ামে আমার সাথে অনেকগুলো ছবি (সেলফি) তুলে নিজ আসনে গেলেন। আর আমি নিজ আসনে বসে মনে মনে ভাবলাম, সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারে আরব আমিরাতের দুবাই মাঠে এসেও পরিচিতজনের সাথে দেখা। মনে হলো- ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী। আর পৃথিবীর কোন না কোন প্রান্তে প্রিয়জনের দেখা পবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। অবশ্য লজ্জায় ভাতিজার নাম জিজ্ঞেস করার সাহস হলো না। তাই সে ভাতিজাই থেকে গেলো। বিতর্কিত আউট আর শেষ বলে বাংলাদেশের হার নিয়েই আমাদের গ্যালারি ছাড়তে হয়। শুধু কি তাই কিশোরি সেই দর্শকদের টিজিং যন্ত্রণায় কোনমতে মাঠ ছাড়তে পারলেই যেন বাচিঁ।

মাঠে বসে খেলা দেখা আর প্রিয় দলকে সমর্থণ জানানোর মজাই আলাদা। বলা হয়নি দুবাই আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামের কথা। অত্যাধুনিক এই স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখার মজাই আলাদা। মাঠে বসে খেলা দেখলেও সাইড স্ক্রিনের দিকে না তাকালেই চলে। এই মাঠটির নির্মাণ কাজ যারা করেছেন তাদের প্রশংসা করতেই হয়। খেলা শেষ হওয়ার পর আমরা যখন ভীড় ঠেলে বেরিয়ে আসছি তখন স্থানীয় সময় রাত প্রায় একটা। ভারতীয় সমর্থক সিধুও আমাদের সাথে জন¯্রােতে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসেন। ভারতীয় দর্শকররা সিধুর সাথে কথা বলেই নিজেকে যেন ধন্য মনে করছেন।

মাঠ ছেড়ে যখন নিজ গন্তব্যের উদ্দেশ্যে আমাদের গাড়ি ১২০ মাইল গতিবেগে ছুটছে তখন ক্ষিধা যেন তার বেশি বেগে পেটের ভেতর ছুঁ ছুঁ করছে। রাত পৌনে দুটায় আমরা এক পাকিস্তানি হোটেলে খাবো বলে থেমেছি। সেখানেও খেলা নিয়ে চলছে আলোচনা। কেউ বলছেন ইন্ডিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল নয় এটা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। কেউ বলছেন আমরা ১৫ জনের বিরুদ্ধে খেলে হেরেছি। হোটেলের বয় ছিলো কালো সম্ভবত আফ্রিকান কোন দেশের হবে। আমাদের হিন্দি কিংবা ইংরেজি কোন কথাই বুঝতে চাইছে না।

বিরিয়ানির নামে ভাত মিশ্রিত মাংস এনে সামনে হাজির করতেই সব গেল বিগড়ে। বিষয়টি বুঝতে পেরে দোকান মালিক পাকিস্তানী বৃদ্ধ চাচা এগিয়ে এসে আমাদের চাহিদা বুঝতে পেরে, তিনি আমাদের খাবার সরবরাহ করতে লাগলেন। কোনমতে ক্ষুধা নিভৃত করে ফিরে এলাম নিজ আস্তানায়। খেলা দেখা থেকে শুরু করে রাতের খাবার, মাঠে আসা যাওয়া এসবে রনির এই অবদানকে কোনভাবেই খাঁটো করে দেখার সুযোগ নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে এশিয়া কাপের ফাইনাল ম্যাচটা তাই জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আক্ষেপ আর দিনভর প্রিয় দলকে সমর্থণ জানানোর ক্লান্তি নিয়ে বিছানায় যেতেই নিদ্রাদেবী যেন আমাদের মাথায় শান্তির পরশ বুলিয়ে দিলেন।#