- নির্বাচিত, ব্রেকিং নিউজ, স্লাইডার

আমিরাতের ডায়রি ০৩- মি. প্রবাস লামারাং আরব আমিরাতে বাংলাদেশ দুতাবাসে সিলেটি দুত


আজিজুল ইসলাম, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ১৭ অক্টোবর ::

কথায় কিংবা চলনে কেউ তাকে সিলেটি বলবে না। কিন্তু সিলেটি কিংবা কুলাউড়ার মানুষ হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। বস্তুত তিনি একজন আদিবাসী খাসি সম্প্রদায়ের লোক। তিনি মি. প্রবাস লামারাং। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ দুতাবাসের প্রথম সচিব বা ফার্স্ট সেক্রেটারি।

সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের ভিসা পাওয়ার পর কর্মধা ইউনিয়নের হাজী মারুফ ভাই প্রথমে জানালেন এই ফার্স্ট সেক্রেটারির কথা। আমি ভাবলাম সেতো মন্দ না। বাংলাদেশ দুতাবাস আর একজন কর্মকর্তার সাথে দেখা হলো। জানা হবে অনেক কিছু। আরব আমিরাত আসার পর উনার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ। যথারীতি আমন্ত্রণ আসলো। সিদ্ধান্ত নিলাম ৩ অক্টোবর বাংলাদেশ দুতাবাসে যাওয়ার। বিকেল ৫ টার মধ্যে যাওয়ার সময়। আমরা ৩টায় রওয়ানা হলাম। দুতাবাসের কাছে যেতে একটি ক্ষুদে বার্তা আমার মোবাইৃল ফোনে আসলো। তাতে লেখা, ‘দু;খিত. আমি অসুস্থ, এখন হাসপাতালে যাচ্ছি। দয়া করে রোববার আসুন’। প্রতিউত্তরে আমি বললাম, “আমি কনস্যুলেট অফিসের সম্মুখে, ৫মিনিটের সময় দেন।’ উত্তরে তিনি জানালেন, আমি কনস্যুলেট অফিস থেকে অনেক দুরে। অফিসে একটা অনুষ্ঠান আছে শনিবারে বিকেলে আসুন।’ আমি অনেকটা হতাশ হয়ে দুতাবাস থেকে ফিরতে ফিরতে ভাবলাম- মনে হয় সাংবাদিক জেনে ভদ্রলোক আমাকে আমন্ত্রণ করছেন না। আমি তাকে একটি ক্ষুদে বার্তায় জানালাম, আমি কোন সাংবাদিকতার জন্য নয় শ্রেফ সৌজন্য সাক্ষাৎ করবো। সেই সাথে দেশ থেকে আসার সময় ফাদার জোসেফ গোমেজ আমাকে বলেছিলেন, -প্রবাসকে হ্যালো বলবে, আর তার ভালাইমা পুঞ্জিবাসী ভালো আছে”। আমি সেই কথাটিও ক্ষুদে বার্তায় লিখে পাঠাতে, ওপাশ থেকে একটি ফোনে আমার কাছে সালাম দিয়ে দু:খ প্রকাশ করলেন জনৈক ভদ্রলাক। বললেন স্যার হাসপাতালে ভর্তি আছেন। বলেছেন আপনাকে রোববার আসতে। আমি জানতে চাইলাম আপনি কে? উনি প্রতিউত্তরে বললেন, আমি স্যারের গাড়ি চালক। সিলেটি কথা শুনে বাড়ি জিজ্ঞেস করতে বললেন সিলেটের গোলাপগঞ্জ। ভদ্রলোক আমি স্যারের বাড়ির এলাকার জেনে বলতে লাগলেন, এমন মানুষ হয় না। দুতাবাসে উনার স্যারই প্রথম কোন সিলেটি। খুব ভালো মানুষ ইত্যাদি নানা প্রশংসা করলেন। সাংবাদিক বলে আমি বিষয়টাকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখলাম

১২ অক্টোবর আমাদের দেশে ফেরার কথা। দুতাবাসে যাওয়াতো দুরের কথা, নিজের তল্পিতল্পা গোছানোর আর আরব আমিরাতের সৌন্দর্য্য দর্শণ শেষ করতে হবে। কিন্তু অগত্যা দেশে ফেরা এক সপ্তাহ পেছানো হলো। তার জন্য টিকিটে জরিমানা দিতে হয়েছে অতিরিক্ত ৫ হাজার টাকা। এমনিতেই ধারকর্য করে আরব আমিরাত সফরে আসা, তাও আবার আবার মরার উপর খড়ার ঘা। আরব আমিরাতের সকল শহর ঘুরে দেখার লোভ সামলাতে না পেরে সম্মতি দিলাম ফেরার সময় বাড়ানোতে। তখন মনে মনে ভাবলাম তাহলে, দুতাবাস দেখতেই হয়। ফের ক্ষুদে বার্তা পাঠালাম ফার্স্ট সেক্রেটারিকে। তিনিও মনে হলো, সাগ্রহে উত্তর দিলেন। ১০ অক্টোবর দেখা করার কথা জানালেও গাড়ীর ব্যবস্থা না করায় ১১ তারিখ পেছানোর অনুরোধ জানিয়ে আরেকটি ক্ষুদে বার্তা প্রেরণ। এবার প্রতি উত্তরে, ঠিক আছে আসেন। আমাদের দেখা হবে।’ ভরসা পেলাম।

কুলাউড়া ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের সভাপতি মতিন ভাই আমার সাথে যেতে সম্মত হলেন। ১১ অক্টোবর বেলা সাড়ে ১২টায় আমার সহযাত্রী বাশার ভাইসহ ৩ জন দুতাবাসের দিকে রওয়ানা হলাম। দুতাবাসের প্রধান ফটক থেকে এবার ফোনে রিং দিলাম। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করে নমস্কার জানিয়ে বললেন, আপনি এসে গেছেন? তাহলে ভেতরে চলে আসুন। গেইটে প্রবেশাধিকারে কড়াকড়ি। কালো নিরাপত্তারক্ষি আটকে দিলো পথ। অবশ্য ফাস্ট সেক্রেটারি বলে দিয়েছেন, ওদেরকে যেন বলি ১৩ নং কÿে যাবো। কিন্তু ওরাতো বাংলা ইংলিশ কিংবা হিন্দি কিছুই বোঝে না। মতিন ভাই আরবিতে বলায় বুঝতে পেরে আমাদেরকে যেতে দিলো। এখানে বলে রাখা ভালো সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুল ভাষা আরবি। তবে হিন্দি ও ইংরেজি জানা থাকলে চলতে ফিরতে আর কোন সমস্যা থাকে না।

১৩ নং কক্ষে দরজায় আলতো ঠুকা দিতেই ভেতর থেকে বলা হলো ইয়েস কামিং। রুমে প্রবেশের পর আমাদের বসার অনুরোধ জানালেন। বসার পর আমি সবার পরিচয় করিয়ে দেই। তিনি বললেন, খুব ভালো করেছেন, আগে এসে। অনেক জাতের বাদাম আর কফি দিয়ে গেলো অফিসের কর্মচারিরা। কফি খেতে খেতে শুরু হলো কথামালা।

প্রবাস লামারাং জানান, তাঁর জন্মস্থান সিলেটের জৈন্তা উপজেলায়। সেখানেই কেটেছে শৈশব কৈশোর। এরপর ঢাকা নটরডেম কলেজ এবং দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীট প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে কিছুদিন অগ্রণী ব্যাংকের কর্মধা শাখায়, কিছুদিন কারিতাসের ট্রেনিং প্রশিÿক হিসেবে এবং বিসিএস দিয়ে বিভিন্ন দুতাবাসে চাকরি শুরু। এর আগে দক্ষতার সাথে ফিলিপিনে ২ বছর এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে চাকরিও ২ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। কুলাউড়ার কর্মধা ইউনয়িনের ভালাইমা পানপুঞ্জিতে বাবা মার ৩টি পানের বাগান রয়েছে। বাবা মা কুলাউড়া ও জৈন্তিয়া্য় আসা যাওয়া করেন।

ঢেকি স্বর্গে গেলেও ধানবানে এমন প্রবাদ মিথ্যা হতেই পারেনা। এবার সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রসঙ্গ। বাংলাদেশের শ্রমিক ভিসা আবার খোলার সম্ভাবনা কতটুকু। জানালেন, ভিসাতো অনেক প্রকারের খোলা আছে। যেমন-গৃহকর্মী, নার্সসহ ২১ ক্যাটাগরির। তবে শ্রমিক ভিসা খোলার সম্ভবনা আছে। তিনি জানান, আরব আমিরাতে প্রায় ২০০টি দেশের মানুষ বিভিন্নভাবে কাজ করেন। অন্যান্য জাতি গোষ্ঠি খারাপ কাজ কররেও ততটা ধরা পড়েনা। ভারতীয়রা কোন খারাপ কাজ করলে সংবাদ মাধ্যমে তাদের এশিয় বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম খুব শক্তিশালী।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলা কোন সংবাদ মাধ্যম নেই। যদি বাংলা সংবাদ মাধ্যম থাকতো। আর আমিরাতের আইন কানুন বাংলায় প্রকাশিত হতো, তাহলে আরব আমিরাতে কর্মরত শ্রমিকরা আইন সম্পর্কে ধারণা পেতো। ১০ লক্ষাধিক মানুষের জন্য একটি বাংলা কাগজ এখন যেন সময়ের দাবি।

মি. প্রবাস লামারাং বলেন. আমিরাতবাসী আমাদের খুব বেশি পড়ে। যেমন ভিজিট ভিসা চালু করে ওরা হিসেব করছে কতজন আসে, আর কতজন ফেরৎ যায়। যখন দেখবে সিংহভাগ ফেরৎ যায় না, তখন ভিজিট ভিসা বন্ধ করে দেবে। তাছাড়া কর্মস্থল বদলী ও অবৈধ শ্রমিকরা নতুন চাকরি খোঁজে বৈধ হতে পারবে। অক্টোবরেই শেষ হবে সেই সুযোগ। এরপর শুরু হবে ধরপাকড়। এতে বাংলাদেশীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তিনি বাংলাদেশী কমিউনিটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যান। এসব বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তারপরও মানুষ সংশোধন হচ্ছে না।

কথা বলতে বলতে সময় গড়িয়ে যাচ্ছিল। বাংলাদেশীদের ধরপাকড় শুরু হওয়ার একটি অশুভ সংবাদ শুনে আর নতুন ভিসা চালুর সম্ভবনার খবর নিয়ে বিদায় নেবার পালা। মি. প্রবাস লামারাং উঠে আমাদের এগিয়ে বিদায় দিলেন। তাঁর আতিথেয়তায় মুগ্ধ আমরা ফিরে আসার পথে দুতাবাসের আঙিনায় হাজার হাজার বাঙালিদের লাইনে দাঁড়িয়ে সেবা নেয়ার যুদ্ধ দেখে মনে মনে ভাবলাম- যাদের শ্রমে ঘামে আমরা সুন্দরভাবে জীবন যাপন করি। সুন্দর মোবাইলে দেখি বিশ্ব। অথচ তাদের কষ্টের কথা অনুভব করি না। স্যালুট তোমাদের প্রিয় ভাইয়েরা, তোমাদের শ্রমে ঘামে আমাদের যাপিত সুন্দর জীবনের জন্য–।#

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *