অক্টোবর ৩০, ২০১৮
Home » নির্বাচিত » তিন শিশু মৃত্যুর দায় নেবে কে?

তিন শিশু মৃত্যুর দায় নেবে কে?

সেলিম আহমেদ, ৩০ অক্টোবর:: সংসদে সদ্য পাস হওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ আট দফা দাবি আদায়ে পরিবহন শ্রমিকরা ধর্মঘট করলো টানা ৪৮ ঘণ্টা। আর এ ৪৮ ঘণ্টায় তারা জন্ম দিল কলঙ্কময় এক অধ্যায়ের। রাস্তায় বের হওয়া পরিবহনের চলাচলে বাধা, যাত্রীদের গায়ে পোড়া মবিল ছুঁড়ে দেয়া, চালকদের গাড়ি থেকে নামিয়ে মুখে পোড়া মবিল লাগিয়ে উঠবস করানো, গাড়ি ভাঙচুর, যাত্রীদের মারধরসহ নানা নৈরাজ্যে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল সাধারণ মানুষ। তাদের এই হিংস্রতার থাবা থেকে মুক্তি পায়নি রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স আর বিয়ের গাড়িও। রক্ষা পাননি শিক্ষার্থী, সাংবাদিক এমনকি শিক্ষকরাও। অ্যাম্বুলেন্স আটকানোর ফলে দুদিনে ৩ শিশুকে অকালে বিদায় নিতে হয়েছে। অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসার জন্য ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এমন আকুতি-মিনতি করেও বিন্দুমাত্র দয়া হয়নি শ্রমিকদের। চলতে দেয়া হয়নি অ্যাম্বুলেন্সকে। এই তিন শিশু মৃত্যুর দায় নেবে কে? জানি কেউ নিবে না। যে মায়ের বুক খালি হয়েছে সেই হারিয়েছে…। পরিবহন শ্রমিকদের এমন নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদে এগিয়ে আসেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমনকি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরাও।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ২৮ অক্টোবর রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় পরিবহন শ্রমিকদের প্রতিরোধে উপজেলার নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের চান্দগ্রাম এলাকায় আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্সে মারা যায় ৭ দিনের এক শিশুকন্যা।

পরিবারের অভিযোগ থেকে জানা গেছে, বড়লেখা উপজেলার সদর ইউনিয়নের অজমির গ্রামের কুটন মিয়ার সাতদিনের শিশুকন্যাকে অসুস্থ অবস্থায় রোববার সকালে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। শিশুর অভিভাবকরা অ্যাম্বুলেন্সে করে সকাল ১০টার দিকে শিশুটিকে নিয়ে সিলেটের উদ্দেশ্যে রওনা হন। যাওয়ার পথে বড়লেখা উপজেলার পুরাতন বড়লেখা বাজার, দাসের বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে অ্যাম্বুলেন্সটি পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্সটি চান্দগ্রাম নামক স্থানে গেলে পরিবহন শ্রমিকরা গাড়ি আটকে চালককে মারধর করেন। প্রায় দেড়ঘন্টা এখানে অ্যাম্বুলেন্সটি আটকা থাকে। দুপুর দেড়টার দিকে গাড়ি ছাড়া পেলেও মারা যায় শিশুটি।

শিশুর মা সায়রা বেগম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘শ্রমিকদের বলেছি আমার বাচ্চাটা খুব অসুস্থ। কিন্তু কেউ আমার কথা শোনেনি। আমি দেখছি আমার বাচ্চাটা মারা যাচ্ছে। আমার বাচ্চাটার কষ্ট হচ্ছে। আমাদের গাড়িটা ছেড়ে দেন। তারা উল্টো বলে কিসের রোগী? একেকজন শ্রমিক একেক কথা বলে। আমাদের ধমক দেয়। ড্রাইভারকে বলেছি আমাকে নামিয়ে দেন আমি হেঁটে যাব। আমার চোখের সামনে মেয়েটা ওখানেই মারা গেছে।’

ওই দিন সন্ধ্যায় একই উপজেলায় পরিবহন শ্রমিকদের বাধার মুখে হাসপাতাল পৌঁছতে না পারায় বিনা চিকিৎসায় নিউমোনিয়া আক্রান্ত ১১ মাসের আরেক শিশুর মৃত্যু হয়। রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শিশুটি নিজ বাড়িতে মারা যায়। নিহত শিশুর নাম সুকরিয়া বেগম। সে উপজেলার সীমান্তবর্তী উত্তর শাহবাজপুর ইউপির ভট্টশ্রী গ্রামের হামিদা বেগম ও মৃত ছালিক আহমদের মেয়ে।

জানা গেছে, শিশু কন্যা সুকরিয়া বেগম অসুস্থ হলে মা হামিদা বেগম রোববার বেলা দুইটায় শাহবাজপুর বাজারে পল্লী চিকিৎসক মেঘনাথ রুদ্র পালের নিকট নিয়ে যান। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিউমোনিয়া আক্রান্ত জানিয়ে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তির পরামর্শ দেন। শাহবাজপুর বাজার থেকে বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব ১৫-১৬ কিলোমিটার। তিনি মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে চাইলে পরিবহন শ্রমিকরা কোন যানবাহন দেয়নি। রিক্সায় যেতে চাইলেও তারা রিকশার পাংচার করে দেয়। প্রায় দুইঘণ্টা অপেক্ষা করেও হাসপাতালে যেতে ব্যর্থ হওয়ায় মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরে যান। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে শিশুরোগী সুকরিয়া নিজ বাড়িতে মারা যায়।

অপরদিকে সুনামগঞ্জে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া ইউনিয়নের গনিগঞ্জ গ্রামের মইনুল ইসলামের স্ত্রী শেলিনা বেগম রোববার দিবাগত রাতে নিজ বাড়িতে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। ঠাণ্ডাজনিত কারণে ওই নবজাতক সোমবার সকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্থানীয় পল্লী চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। ওই পল্লী চিকিৎসক নবজাতক শিশুটিকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। মইনুল ইসলাম তার নবজাতক শিশুকে নিয়ে যানবাহনযোগে হাসপাতালে যেতে চাইলে পরিবহন শ্রমিক গনিগঞ্জ বাজারে বাধা দেয়। মইনুল ইসলাম বাজারের ব্যবসায়ীদের নিয়ে শ্রমিকদের অনুরোধ ও কাকুতিমিনতি করলেও তারা কোনো যানবাহন চলাচল করতে দেবে না বলে জানিয়ে দেয়। স্থানীয় সড়ক অবরোধ করে রাখে শ্রমিকরা। হাসপাতালে নিতে না পারায় সোমবার দুপুর ১২টার দিকে নবজাতক শিশুটি বাবার কোলেই নিথর হয়ে পড়ে।

এছাড়াও অন্যান্য নৈরাজ্যের কথা নাইবা বললাম। শুধু ওই শিশুদের কথাই যদি বলি তাহলে কি দোষ ছিল ওই নবজাতক শিশুদের। কেন তাদের হতে হল বলির পাঠা? এ প্রশ্ন রাষ্ট্রের কাছে। কি অপরাধ ছিল শিক্ষার্থী-শিক্ষক আর সাংবাদিকদের, তাদের মুখে লাগিয়ে দেয়া হল পোড়া মবিল। এ নিয়ে আমাদের রাষ্ট্র আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা দেখে হাসবো না কাঁদবো ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। পরিবহন শ্রমিকরা এতো নৈরাজ্য করলো আর তারা বসে বসে লজেন্স চুষল। পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তাদের ছিল না বিন্দুমাত্র ভূমিকা। তাহলে কি আমরা ধরে নিতে পারি এই পরিবহন শ্রমিকরা রাষ্ট্রের চেয়েও আরো শক্তিশালী আরো ক্ষমতাধর, আইনের উর্ধ্বে তারা। জনগণ তাদের অত্যচারে অতিষ্ঠ হয়ে নাম দিয়েছে ‘মবিল বাহিনী’ কেউ ‘আলকাতরা বাহিনী’।

টানা ৪৮ ঘণ্টা ধর্মঘট পালনের পর এবার ৯৬ ঘণ্টা ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। সংগঠনটি বলছে, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ সংস্কারসহ আট দফা দাবি আদায়ে ২১ দিনের সময় দিয়ে সরকারকে নোটিশ দেওয়া হবে। এই সময়ের মধ্যে যদি কোনও সিদ্ধান্ত না নেয়া হয় তাহলে পরবর্তীতে টানা ৯৬ ঘণ্টার ধর্মঘট পালন করা হবে। জানিনা সেই ৯৬ ঘণ্টায় কি ঘটবে আমাদের ভাগ্যে। জানিনা আর কত জনকে প্রাণ দিতে হবে অকালে, আর কত মায়ের বুক খালি হবে, কত জনকে লাঞ্চিত হতে হবে রাস্তায়…।

  • সেলিম আহমেদ। সাংবাদিক।