নভেম্বর ২২, ২০১৮
Home » নির্বাচিত » দুজন মৃত কবির পরকীয়‌ার গল্প লেখা তা‌দের ‘ক‌বি’ বন্ধুদের প্রতি

দুজন মৃত কবির পরকীয়‌ার গল্প লেখা তা‌দের ‘ক‌বি’ বন্ধুদের প্রতি

মুন‌জের অাহমদ চৌধুরী, ২২ ন‌ভেম্বর ::
বা‌র্মিংহা‌মে বসবাসরত একজন প্রবাসী সফল ব্যবসায়ী ও ক‌বি ক’দিন অা‌গে ক্যান্সা‌রে অাক্রান্ত হ‌য়ে মারা গেছেন। ‌তি‌নি বিবা‌হিত। দুই পুত্র ও দুই কন্যার জনক। বড় ছে‌লে মে‌য়ে চাকুরীরত।
এর পর‌দিন শতমাইল দু‌রে বসবাসরত একজন দ্বিতীয় প্রজ‌ন্মের বাংলা‌দেশী নারী সংস্কৃ‌তিকর্মী, ক‌বি মারা গে‌ছেন। ঐ নারী সংস্কৃ‌তি কর্মী,‌লে‌খিকা ২২ বছর অা‌গে দীর্ঘ ক‌য়েক বছ‌রের প্রে‌মের পর বি‌য়ে ক‌রেন তার প্রে‌মিক‌কে। তা‌দের সু‌খের সংসার ছিল। এ যুগ‌লের তি‌নটি পুত্র সন্তান র‌য়ে‌ছে। তাঁর বাবার গ্রা‌মের বাড়ী সি‌লে‌টে। শশুরবাড়ী মৌলভীবাজা‌রে। সর্ব‌শেষ, ক‌য়েকমাস অা‌গেও তারা স্বামী-স্ত্রী তিন পুত্র‌কে নি‌য়ে হ‌লি‌ডে‌তে গে‌ছেন।
ঐ নারীর মৃত্যুর কারন এখ‌নো পু‌লিশ জানা‌তে পা‌রে‌নি। পু‌লিশ শুধু এটুকু বল‌ছে, এখন পর্যন্ত কেউ তা‌কে নির্যাতন শে‌ষে হত্যা ক‌রে‌ছে এমন অালামত পাওয়া যায়‌নি।
‌কিন্তু, ঐ নারী ক‌বির লাশ উদ্ধা‌রের পরই লন্ডন, অা‌মে‌রিকা কানাডা থে‌কে এক শ্রেনীর ক‌বি নি‌জে‌দের ফেসবুক ষ্টাটা‌সে দুই ক‌বির ছ‌বিসমেত ছোটগল্প লেখার এক অদ্ভুত বিকৃত রক‌মের প্র‌তি‌যোগীতায় নেমেছেন। অা‌বেগ অার স্মর‌নের কাসু‌ন্দি ঘে‌টে এ দুজন মৃত মানু‌ষের ম‌ধ্যে ‘বন্ধু‌ত্বের চে‌য়ে বে‌শি কিছু সম্পর্ক ছিল’ এটা প্রমান করবার চেষ্টায় উন্মত্ত তার‌া।
ঐ তিন সন্তা‌নের জননীর মৃত্যুর কারন ‘ অাত্মহত্যা’ পুলিশ এটা ‌কোনভা‌বেই না বল‌লেও মৃত লেখিকার ক‌বি বন্ধুরা লিখ‌ছেন অাত্বহত্যা। পু‌লিশ বল‌ছে, এ‌টি দুর্ঘটনা। ‌কিন্ত‌ু, তা‌দের বন্ধু ক‌বিরা ( !) প্র‌তি‌টি লেখায় ই‌ঙ্গিত কর‌ছেন ক্যান্সা‌রে অাক্রান্ত পুরুষ ক‌বির সা‌থে ঐ নারীর, তিন সন্তা‌নের জননীর পরকীয়া ছিল।
‌যে দুজন মানুষ মার‌া গে‌ছেন তা‌দের ম‌ধ্যে কি অা‌দৌ বন্ধু‌ত্বের চে‌য়ে বে‌শি সম্পর্ক ছিল কি- না সেটা শুধু তারা জান‌তেন। অার য‌দি থে‌কেও থা‌কে, মানুষ দুজন  তো নেই। অথচ এখন নি‌জের বই নি‌জে ছাপ‌া‌নো সা‌হিত্য‌ বিশারদ অার জোর ক‌রে নি‌জের প‌দ্যের অখাদ্য বই‌য়ের সমা‌লোচনা লেখা‌নো ক‌বিরা লি‌খছেন দুজন মৃত মানুষ‌কে নি‌য়ে কল্প-কা‌হিনী। বিষয়‌টি নি‌য়ে ক্যান্সা‌রের কা‌ছে জীব‌নের লড়াই‌য়ে হে‌রে যাওয়া ক‌বির একান্ত কা‌ছের মানুষ‌দের সা‌থে দু‌দি‌নে কথা হল। তি‌নি তার ক্যান্সা‌রে অাক্রান্ত হবার খবর জে‌নে প্রথমে নি‌জের ব্যবসা প্র‌তিষ্টান‌টি লীজ দি‌য়ে‌ছেন। অর্থক‌ড়ি সব একত্র ক‌রে তু‌লে দি‌য়ে‌ছেন স্ত্রীর কা‌ছে।
অথচ তা‌দের বন্ধু নামধারী ক‌বিরা ই‌চ্ছেমতন মৃত এ দুজন মানু‌ষের নাম জ‌ড়ি‌য়ে শোকগাথা অার সা‌হিত্য র‌সে শ‌ব্দে সমৃদ্ধ চ‌টি গল্প লি‌খছেন। কার চ‌টির চে‌য়ে তার চ‌টি‌তে অা‌বেগ অার কাব্যময়তার ছড়াছ‌ড়ি তা নি‌য়ে ক‌মে‌ন্টে ক‌মে‌ন্টে বিকারগ্রস্থতায় বিলাপ কর‌ছেন। একবারও তাদের ভাব‌নায় অাস‌ছে না ‌লেখাগু‌লো ফেসবু‌কে, অনলাই‌নে থাক‌বে।
ঐ নারী লে‌খিকার অাপার তি‌ন সন্তান বাংলা পড়‌তে জা‌নে। ঐ দুজন নারী-পুরু‌ষের স্বামী অার স্ত্র‌ী বে‌চেঁ অা‌ছেন। তা‌দেরও তা‌দের সন্তান‌দের সাম‌নে, সমা‌জের সাম‌নে বে‌চেঁ থাক‌তে হয়। তা‌দেরও তা‌দের মৃত স্বামী অার স্ত্র‌ীর স্মৃ‌তি কাদাঁয়। ঐ পুরুষ ক‌বি‌টি দীর্ঘ‌দিন ক্যান্সা‌রে অাক্রান্ত হ‌য়ে হাসপাতা‌লে ছি‌লেন। তখন তার সন্তান অার স্ত্র‌ী সার্বক্ষ‌নিক পা‌শে ছি‌লেন।
অামার মৃত ক‌বি বোন‌টির সা‌থে ঐ পুরুষ ক‌বি ভাই‌টির যৌথ ক‌বিতা পা‌ঠের অাস‌রে যোগ দি‌তে শতমাইল দুর থে‌কে নি‌জে গা‌ড়ি চা‌লি‌য়ে নি‌য়ে অাস‌তেন বোন‌টির স্বামী। বোন‌টি তার বন্ধু পুরুষ ক‌বির ই‌লেক‌ট্রো ক‌টেজ না‌মের দোকানে মা‌ঝে-ম‌ধ্যে অাস‌তেন। বস‌তেন। কথা হত ব‌া‌র্মিংহা‌মে-লন্ড‌নে সা‌হিত্য অনুষ্ঠান অা‌য়োজন নি‌য়ে। অাড্ডায় উপ‌স্থিত দুজ‌নের কা‌ছের বন্ধুরা বিষয়‌টি জানালেন।
ক‌বি ভাইটি যত পুরস্কার পে‌য়ে‌ছেন, পা‌শে থাক‌তেন স্ত্রী। অন্য‌দি‌কে, মৃত বোন‌টির স্বামীর, সন্ত‌ান‌দের ফেসবুক অার হোয়াটসঅ্যাপ প্রোফাই‌লে এখনো ঝুল‌ছে তা‌দের হা‌সিমুখ পা‌রিবা‌রিক ছবিগু‌লো।
এ দুজ‌নের বন্ধু‌ত্বের ব্যাপা‌রে তা‌দের স্ত্রী ও স্বামীরা জান‌তেন। দুই প‌রিবা‌রের সবার এ দুজ‌নের বন্ধু‌ত্বের, চিন্তার কাছাকা‌ছি থাকবার সম্প‌র্কের কথা জানা। ‌কিন্তু দুজন মধ্যবয়সী লেখক বা ক‌বির বন্ধুতা তা কেবল পরকীয়া হয়, এই বিকা‌রগ্রস্থতা প্র‌তিষ্টা করবার চেষ্টা কর‌ছেন তা‌দের বন্ধুরা! হায়‌রে বন্ধুত্ব।
ভাবুন তো একবার, দুজ‌নের মৃত মানু‌ষের সাত‌টি সন্তানদের কা‌ছে তা‌দের মা অার বাবা‌কে নি‌য়ে তা‌দের মা-বাবার লেখকবন্ধুদের  ফেসবুকের লেখাগু‌লির কেউ ‌লিংক তু‌লে পাঠা‌ছে। যে নারীর লাশ এখ‌নো ম‌র্গে, তার স্বামী‌কে হোয়াটসঅ্যা‌পে পাঠা‌নো হ‌চ্ছে লেখাগু‌লির স্ক্রীনশট। ঐ নারীর তিন‌ টি‌নেজ পুত্র এখ‌নো জা‌নে না তা‌দের মা কেন মার‌া গে‌ছেন। ছোট ছে‌লে‌টি‌কে মা বেরুবার সময় ব‌লে গিয়ে‌ছি‌লেন তার জন্য ঘ‌রের কা‌ছের অাজদা (সুপারশপ) থে‌কে কী অান‌তে হ‌বে?
এক‌দিন মাতৃহার‌া এই ৯ বছ‌রের  ছে‌লে‌টি বড় হ‌বে। সে এক‌দিন এই  লেখাগু‌লি পড়‌বে। তার মৃত মা‌য়ের প্র‌তি শ্রদ্ধার, ভালবাসার জায়গা‌টি‌তে বেদনাবহ অাঘাত নি‌য়ে ছে‌লে‌টি বে‌চেঁ থাক‌বে।
‌লিখুন অাপনারা, অাত্মহত্যার গল্প লিখুন, মৃত মানু‌ষের না‌মে পরকীয়ার গল্প লিখুন। অাপনারা তো মৃত দুজন মানু‌ষের বন্ধু ছি‌লেন। অাপনা‌দেরও মৃত দুজন ক‌বির সন্তান‌দের বয়সী সন্তান অা‌ছে‌। লিখুন, লি‌খে যান। সমা‌জের বড় ম‌নের, সং‌বেদনশীল মানুষগু‌লোই তো লেখা‌লে‌খি ক‌রে, শিল্প‌কে ভালবা‌সে। সমা‌জের সংকীর্নতার,  ছোট‌লোকির বিরু‌দ্ধে না অাপনা‌দের লেখা‌লে‌খি। মৃত মানু‌ষের না‌মে গীবত করুন, মৃত দুজন মানু‌ষের জী‌বিত স্বামী অার স্ত্রীর জীবনটা‌কে দু‌র্বিসহ ক‌রে তুলুন। তা‌দের সন্তান‌দের কা‌ছে তা‌দের মৃত মা-বাবা‌র চ‌রিত্র‌কে অাপনা‌দের ম‌নের র‌ঙ্গে রাঙ্গান।#
লেখক : লন্ডনে বসবাসরত সাংবা‌দিক।