ডিসেম্বর ৭, ২০১৮
Home » Uncategorized » শাহীন- সুলতান : একটি কুঁড়ির দু’টি পাতা

শাহীন- সুলতান : একটি কুঁড়ির দু’টি পাতা

মো. এবাদুর রহমান শামীম, ০৭ ডিসেম্বর ::
বঙ্গীয় রাজনীতিতে দল বা নীতি পরিবর্তন একটি স্বাভাবিক ও চলমান প্রক্রিয়া। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশকে শাসন ও শোষণ করা সবচেয়ে বড় তিনটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির বর্তমান কেন্দ্রীয়, বিভাগ, জেলা এবং উপজেলা; এমনকি ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাদের একটি বড় অংশ একাধিক বার দল পরিবর্তন করেছেন। কেউ কেউ একাধিক দলের হয়ে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, কেউ কেউ আরও একধাপ এগিয়ে নতুন দল গঠন করেছেন এবং পূর্বের দলের সাথে একীভূত হয়ে যুগপৎ আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন; ক্ষমতার অংশীদারিত্ব নিয়েছেন, কেউ কেউ আবার দলে ফিরে গেছেন। সময়ের প্রয়োজনে রাজনীতিতে দল পরিবর্তনের এই ধারা দিনকে দিন বেড়েই চলছে। দেশের রাজনীতির প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রম নয় কুলাউড়া-জুড়ীর রাজনীতি। এখানেও উপর্যুক্ত দলসমূকে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে দল পরিবর্তন করেছেন।
কুলাউড়ার রাজনীতিতে পরিচিত মুখ সাবেক তিন বারের নির্বাচিত এমপি নবাব আলী আব্বাস খাঁন, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপি আব্দুল মতিন, এডভোকেট আবেদ রাজা, শফি আহমেদ সলমান, সাবেক কুলাউড়া পৌরপিতা কামাল আহমেদ জুনেদ, শওকতুল ইসলাম শকু’রা কেউই একদল বা নীতির রাজনীতি করেননি। সময়ের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে দল পরিবর্তন করেছেন।
এককথায়, এরা সবাই দল পরিবর্তন করে রাজনৈতিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হাসিল করেছেন। দল পরিবর্তন করে এদের কেউ এমপি হয়েছেন, কেউ পৌরপিতা হয়েছেন, কেউ উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন এবং কেউ কেউ বড় বড় পদ-পদবি পেয়েছেন। এদের কেউই দল পরিবর্তন করে খুব বেশি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হননি, বরং পূর্বের চেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছেন।
সম্প্রতি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজার- ২ (কুলাউড়া- কমলগঞ্জ ও জুড়ী; আংশিক) আসনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনোনীত প্রার্থী সাবেক ডাকসু ভিপি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সুলতান মনসুর ধানের শীষ এবং মহাজোট মনোনীত প্রার্থী সাবেক বিএনপি নেতা ও বর্তমান বিকল্পধারার প্রেসিডিয়াম সদস্য এম এম শাহীন নৌকা প্রতীকে নির্বাচন করার সম্ভাব্যতা দেখা দিলে মৌলভীবাজার-সিলেট তথা সিলেটি প্রবাসী অধ্যুষিত ইউরোপ-আমেরিকায় ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
সুলতান মনসুর- এম এম শাহীনের পূর্বের দলের নেতাকর্মীদের একাংশ বেঈমান আখ্যা দিয়ে সাধারণ জনগণকে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান জানান। যদিও ইতঃমধ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরীক দল বিএনপি সুলতান মনসুরকে আর মহাজোটের প্রধান শরীক দল আওয়ামী লীগ এম এম শাহীনকে বিশাল শোডাউনের মাধ্যমে বরণ করে নিয়েছে।
সুলতান- শাহীন, দু’জনই মরহুম আব্দুল জব্বারের পর কুলাউড়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। সাধারণ মানুষের কাছে সুলতান মনসুর জাতীয় নেতা, আর এম এম শাহীন কুলাউড়ার মাটি ও মানুষের নেতা হিসেবে সুপরিচিত। পারিবারিকভাবে আত্মীয়তার সূত্রে আবন্ধ এই দু’নেতার হাত ধরে কুলাউড়ার অধিকাংশ উন্নয়নকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। যার সুফল এখনো কুলাউড়াবাসি ভোগ করছে। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সুলতান মনসুর প্রথম এমপি হয়ে স্বাধীনতার পর ২৫ বছর ধরে অবহেলিত-বঞ্চিত কুলাউড়ার যে উন্নয়নকার্য করেন, তা আজ ইতিহাস।
এম এম শাহীন ২০০১ সালে নিজদল বিএনপি থেকে মনোয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। এই নির্বাচনে তিনি সুলতান মনসুরকে হারিয়ে চমক সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে উভয়েই ১/১১’র অস্থির সময়ে কথিত সংস্কারপন্থী তকমা নিয়ে অনেকের মতো স্বীয় দলীয় রাজনীতি থেকে নির্বাসিত হন। অন্যরা দলে ভীড়ে যথাযোগ্য সম্মান ও পদ-পদবি লাভ করলেও তাঁদের ভাগ্যে তা আর জোটেনি।
সুলতান মনসুর রাজনীতিতে প্রায় ১০ বছর নির্বাসিত থাকার পর বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। আর এম এম শাহীন বিএনপিতে ফিরে যথাযোগ্য সম্মান না পেয়ে প্রায় ৮ বছর অপেক্ষার পর শহীদ জিয়ার ঘনিষ্ঠজন, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারায় যোগ দেন।
সেদিক থেকে বলা যায়, এই দু’নেতা প্লাটফর্ম পরিবর্তন করেছেন ঠিকই, কিন্তু নীতির পরিবর্তন করেননি। সুলতান মনসুর মুজিবকোর্ট পরিধান ছেড়ে দেননি আর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান ভুলেন যাননি। যদিও দল বা নীতি পরিবর্তনের পটভূমির চেয়ে প্রতীক বদলের বিষয়টি সাধারণ মানুষের আগহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুলতান-শাহীন স্ব স্ব দল-নেতাকর্মীদের প্রতি অবিচার বা বেঈমানি করেননি। বরং দু’দলই সুলতান-শাহীনের প্রতি অবিচার করেছে, অন্যায় করেছে। যার খেসারত সাধারণ জনগণকে দিতে হয়েছে। দু’দল কখনই কুলাউড়ার মানুষের জনমতকে প্রাধান্য দেয়নি। দলের কেন্দ্রের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত যে সাধারণ মানুষ মেনে নেয়নি, তার প্রমাণ স্বাধীনতার পর অধিকাংশ জাতীয় নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত বাইরে গিয়ে কুলাউড়া-জুড়ীর সাধারণ মানুষ পছন্দসই প্রার্থীকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিয়েছে। বিশেষ করে, সুলতান- শাহীনের মত প্রার্থী থাকার পরও গত ১৭ বছরে এই আসনে দু’দলের কেউই এমপি নির্বাচিত হতে পারেননি। বরং বড় দু’দল তাঁদের জোটের স্বার্থে যেসব প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, সাধারণ ভোটার’রা তাঁদের ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচনে এইসব জনবিচ্ছিন্ন ভুঁইফোড় প্রার্থীদের নমিনেশন বাজেয়াপ্ত হয়েছে। মৌলভীবাজার- ২ আসনের রাজনীতি সচেতন ভোটার’রা দল কিংবা প্রতীককে ভোট দেয়নি, ভোট দিয়েছে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, কোনো দলই এ থেকে শিক্ষা নেয়নি।
এম এম শাহীন; কুলাউড়া-জুড়ীর রাজনীতিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জননন্দিত নাম। এই অঞ্চলে বিএনপির রাজনীতির উত্থান শাহীনের হাত ধরেই। অসাধারণ ব্যক্তিত্ব, চারিত্রিক মাধুর্য আর ক্যারিশমেটিক নেতৃত্ব গুণে অতি অল্পসময়ে তিনি সব শ্রেণি-পেশার মানুষের আত্মার আত্মীয় হিসেবে রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সুখে-দুঃখে আপামর জনসাধারণের ভরসা হয়ে পাশে থেকেছেন এম এম শাহীন। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে অজ্ঞাতকারণে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে, তাঁর নিকট বিএনপি মনোনীত প্রার্থীর নমিনেশন বাজেয়াপ্ত হয়।

সুলতান মনসুর; রাজনীতিতে দুঃখগাঁথা উপাখ্যানের অপর নাম। কুলাউড়া তথা মৌলভীবাজারের কিছু উচ্চাকাঙ্ক্ষী নেতার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের শিকার সুলতান মনসুর। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, সুলতান মনসুরকে চক্তান্তের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে অবশেষে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারে সুলতান মনসুর রাজনীতিতে সক্রিয় হন।

সুলতান-শাহীন জাতীয় রাজনীতিতে দু’জন হতভাগার নাম, দুর্ভাগার নাম। সাধারণ মানুষের কাছে আফসোস আর দীর্ঘশ্বাসের অন্যতম উপলক্ষ। কুলাউড়া-মৌলভীবাজারের সুলতান-শাহীন’ময় রাজনীতিতে সুলতান-শাহীনের বিকল্প এখনো তৈরি হয়নি; বিকল্প নেতার কোনো স্বরূপও দেখা যাচ্ছে না। কুলাউড়া ও জুড়ী-কমলগঞ্জ(আংশিক) এর উন্নয়ন ও জনকল্যাণমুখী রাজনীতিতে সুলতান-শাহীন একটি কুঁড়িতে দু’টি পাতার মতো।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সুলতান-শাহীনকে নিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে অনেকে হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা ছড়াচ্ছেন, কুৎসা রটনা করছেন; যা আমাদের ঐতিহ্যিক, সামাজিক ও পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের উচিত হিংসা-বিদ্বেষ ও চরিত্রহননের রাজনীতি পরিহার করে দলমত নির্বিশেষে সবাই মিলে বরাবরের ন্যায় একটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য একযোগে কাজ করা। জনগণের ভোটে যেই নির্বাচিত হোন না কেন, উন্নয়নের স্বার্থে দলমত নির্বিশেষে সবাই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে সহযোগিতা করা।
সর্বোপরি, রাজনীতিতে সুলতান-শাহীনের ফিনিক্স পাখির ন্যায় ভিন্নরূপী প্রত্যাবর্তনকে স্বাগত জানাই। ব্যক্তি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ এবং ব্যক্তি এম এম শাহীনের প্রতি শুভ কামনা থাকলো। আগামীর নিরাপদ বাংলাদেশের জন্য সুলতান-শাহীনের সময়োপযোগী ও সাহসী অগ্রযাত্রা নিরাপদ হোক; এই প্রার্থনা ও প্রত্যাশায়…..✌লেখক-
প্রভাষক (হিসাববিজ্ঞান), ইয়াকুব তাজুল মহিলা কলেজ, কুলাউড়া।
সদস্য, সিলেট ডিস্ট্রিক ট্যাক্সেস বার এসোসিয়েশন
০৭ ডিসেম্বর ২০১৮; কুলাউড়া।