জানুয়ারি ৪, ২০১৯
Home » জাতীয় » ফলোআপ- জুড়ীর ডাবল মার্ডার- ওদের অপরাধ মারামারি থামানোর চেষ্টা করা

ফলোআপ- জুড়ীর ডাবল মার্ডার- ওদের অপরাধ মারামারি থামানোর চেষ্টা করা

এইবেলা, কুলাউড়া, ০৪ জানুয়ারি ::

তাহির আলী (৫৩) ও লিয়াকত আলী (৪০) এলাকায় দু’জন অত্যন্ত ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত। এক সাথে দু’জনের নির্মম মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না গ্রামবাসী। মারামারি থামানোর চেষ্টা করাই ওদের জন্য কাল হয়েছে। ভূমিখেঁকো চক্রের হামলার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণকারি দু’জনের দু’টি পরিবারও এখন নি:স্ব। মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার হাকালুকি হাওর অংশে জমিজমা নিয়ে বিরোধের জের ধরে দু’পক্ষের সংঘর্ষকালে ইংরেজী নববর্ষের প্রথম দিনে অর্থাৎ ০১ জানুয়ারি ডাবল মার্ডার সংঘঠিত হয়।


সরেজমিন শুক্রবার জুড়ী উপজেলার জায়ফরনগর ইউনিয়নের জায়ফরনগর গ্রামে গেলে গোটা গ্রামবাসী মো. তাহির আলী ও মো.লিয়াকত আলী মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না। দু’জনের মৃত্যুতে বাদ জুম্মা মসজিদে গ্রামের মসজিদে বিশেষ মুনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। শোকাহত গ্রামবাসী জানান, মো. তাহির আলী ও মো. লিয়াকত আলী যে কেবল ভালো মানুষ ছিলেন তা নয়। জায়ফরনগর তরুণ সংঘ নামে একটি সামাজিক সংগঠন রয়েছে, সেই সংগঠনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। এলাকায় স্জ্জন ও ভালো মানুষ হিসেবে পরিচিত।

ঠিক উল্টোচিত্র একই ইউনিয়নের কালিনগর গ্রামের। পুরুষ মানুষের দেখা মিললেও কেউ মুখ খুলতে রাজি নয়। ঘটনার সাথে জড়িতদের পরিবারের লোকজনও কথা বলতে রাজি নয়। এখলাছ মিয়ার বোনের জামাই কুলাউড়া উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের লৈয়ার হাই গ্রামের রমযান মিয়া জুড়ি থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।

এদিকে শুক্রবার বেলা ৩টায় জায়ফরনগর উচ্চ বিদ্যালয় হল রুমে তাদের তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনায় শোকসভা, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। জায়ফরনগর তরুণ সংঘের সভাপতি এমদাদুল হক বাবরের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সারোয়ার আহমদ আসাদের পরিচালনায় শোকসভায় জেলা পরিষদ সদস্য বদরুল ইসলাম ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মো. নাজমুল ইসলাম মাষ্টারসহ এলাকার সর্বস্তরের মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
নিহত মো. তাহির আলীর বড়ভাই মো. মক্তদির আলী জানান, ঘটনার দিন মঙ্গলবার বছরের প্রথম দিন ভর্তি ও বই আনার জন্য সকালে ছোট মেয়ে শিমু বেগম (৮)কে মানিকসিংহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়ে যান। বিদ্যালয়ে যাওয়ার পর খবর পান হাওরে জমিজমা নিয়ে তাদের গ্রামের ফাতির আলীর সাথে পাশ^বর্তী কালিনগর গ্রামের এখলাছ মিয়াও তার সহযোগিদের মারমারি চলছে। শুনেই মেয়েকে স্কুলে রেখে হাকালুকি হাওরের দিকে ছুটে যান।

সেখানে গিয়ে উভয়পক্ষকে মারামারি না করার জন্য এবং বিষয়টি সমাধান করার আশ্বাস দেন। কিন্তু এখলাছ মিয়া ও তার সহযোগিরা উল্টো তার উপর আক্রমন চালায় এতে ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। মো.তাহির আলীর স্ত্রী, ২ মেয়ে ও ছেলে রয়েছে। ছেলে মেয়র মধ্যে সবার বড় মেয়ে শিমা বেগম। জায়ফরনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী। ও ছেলে হিমেল একই বিদ্যালয়ের ৭ম শ্রেণির ছাত্রী। কৃষিকাজ আর সামান্য আয় রোজগারে চলা তাহির আলীর পরিবার এখন কিভাবে চলবে?-এই চিন্তায় তারা এখন দিশেহারা।
অপর নিহত ২ কন্যা সন্তানের জনক মো. লিয়াকত আলী (৪০) একজন উদিয়মান ব্যবসায়ী। সামাজিক কর্মকান্ডে যিনি সবার আগে থাকেন। ঘটনার দিন তিনি মারামারির খবর শুনে হাওরে গিয়ে দু’পক্ষকে মারামরি না করার অনুরোধ করেন। কিন্তু তার অনুরোধ শুনেনি এখলাছ মিয়াও তার সহযোগিরা। তাদের আক্রমনে গুরুতর আহত হন। প্রথমে কুলাউড়া ও পরে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরের দিন অর্থাৎ ০২ জানুয়ারি বুধবার তিনি মারা যান। ভাইযের আহত হওয়ার খবর পেয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দেশে ছুটে আসেন নিহত মো. লিয়াকত আলীর বড় ভাই মো. সফর আলী। কিন্তু দেশে এসে তিনি জানতে পারেন তার ভাই আর নেই। এখন লিয়াকত আলীর স্ত্রী ও ২ মেয়েকে কি বলে শান্তনা দেবেন? কিভাবে চলবে এই পরিবার? এসব প্রশ্নের কোন উত্তর খোঁজে পাচ্ছেন না। নিহত মো. লিয়াকত আলীর বয়োবৃদ্ধ বাবা হাজী আফতার আলী (৭৮) ছেলেকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ। তিনি জানান, নিহত মো. লিয়াকত আলীর বড় মেয়ে ৬ বছর বয়সী ফাতিমা জান্নাত ও ৩ বছর বয়সী বাক্প্রতিবন্ধি খাদিজা জান্নাতকে শান্তনা দেয়ার কোন উপায় নেই। প্রথমে ওরা বুঝতে পারেনি ওদের মারা গেছেন। কিন্তু গত দু’দিন থেকে ওদের কান্না থামানো যাচ্ছে না।

দু’টি পরিবারের ও গ্রামবাসীর দাবি, নিহতদের সাথে এখলাছ মিয়া ও তার সহযোগিদের জমিজমা নিয়ে কোন বিরোধ নেই। তারা কেবল মারামারি থামানোর জন্য গিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকান্ডের সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি ও ফাঁসির দাবি জানান। মৌলভীবাজার জেলা পরিষদের সদস্য বদরুল ইসলাম জানান, এধরনের ঘটনা যেন আর সংগঠিত না হয়। ঘটনার সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি যাতে নিশ্চিত হয়।

উল্লেখ্য, জুড়ি উপজেলার হাকালুকি হাওরের শাহাপুর মৌজার চেয়ারম্যানের জাওর নামক এলাকায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মঙ্গলবার ০১ জানুয়ারি দু’গ্রুপের দু’দফা হামলায় মো. তাহির আলী (৫৩) ও মো. লিয়াকত আলী (৪০) নামক ২ ব্যাক্তির মৃত্যু হয় ও কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়েছে। নিহত মো. তাহির আলীর ভাই মো. মক্তদির আলী বাদি হয়ে মামলা দায়ের করলে জুড়ী থানা পুলিশ ৯জনকে আটক করেছে। #