জানুয়ারি ১৩, ২০১৯
Home » জাতীয় » চা শ্রমিকের সন্তানরাও তথ্য প্রযুক্তির মহাসড়কে যোগ দিতে চায়

চা শ্রমিকের সন্তানরাও তথ্য প্রযুক্তির মহাসড়কে যোগ দিতে চায়

আজিজুল ইসলাম, ১৩ জানুয়ারি ::

সাগরনাল চা বাগানের বাসিন্দা শ্রেয়া কানু (১৪)। ফুলতলা বশির উল্ল্যাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেণির ছাত্রী। কম্পিউটার শিখছেন। সেই সাথে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন গোটা বিশে^র সাথে পরিচিত হচ্ছেন। একই বাগানের অঞ্জলি অলমিক (১৯), বিনা কানু (১৩), বেবকি শুন্ডি (১৫) সবাই কম্পিউটার শিখছেন। শুধু যে কম্পিউটারের এমএস ওয়ার্ড, এক্সেল কিংবা পাওয়া পয়েন্টের কাজ ছাড়াও তারা কিভাবে ইন্টারনেট চালানো হয়। ইন্টারনেটের মাধ্যমে কিভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং অণ্যান্য মাধ্যমের সাথে গোটা বিশ্বের সাথে পরিচিত হওয়া যায় তা নিয়ে কাজ করছেন।

শ্রেয়া, অঞ্জলি, বিনা জানান, এখানে না এলে কম্পিউটার কি জিনিস? কিভাবে এত সহজে গোটা বিশ্বকে চেনা যায়? -তা বুঝতাম না। কম্পিউটার শেখার পাশাপাশি তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবার একাউন্ট রয়েছে। তাদের প্রত্যেকের মা কিংবা বাবা বাগানের নিয়মিত শ্রমিক। তারা মা বাবার পথে এগুতে চান না। লেখাপড়া শিখে নিজেদের যোগ্যতা অনুসারে কর্মক্ষেত্রে চাকরি করতে চান। এজন্য নিজেকে সেভাবেই প্রস্তুত করছেন তারা। লেখাপড়ার পাশাপাশি তাই কম্পিউটারকে আয়ত্ত্ব করতে চান। তারা জানেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি কম্পিউটার না জানা থাকলে কর্মক্ষেত্রে তাদের পিছিয়ে পড়তে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুকের ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলাপচারিতা ও তথ্য সংগ্রহ করা হয় এসব কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে আসা চা শ্রমিক মেয়েদের। ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলে তারাও উদ্বেলিত।

যেখানে চা শ্রমিক সন্তানরা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন সেটা একজন উদ্যোক্তার। সেই উদ্যোক্তা হলেন মো. মিফতা আহমেদ লিটন। প্রত্যয় ফাউন্ডেশন নামের তার প্রতিষ্ঠানে ৩৫ প্রশিক্ষণার্থী কম্পিউটার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন। এদের সবাই চা শ্রমিক মেয়ে। যাদেরকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়ে থাকে।

প্রত্যয় ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. মিফতাহ আহমেদ লিটন জানান, লেখাপড়ায় মাষ্টার্স সম্পন্ন করার পর মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়নের মানুষের কল্যাণে কিছু সেবামুলক কাজ করার মানসিকতা নিয়ে “প্রত্যয় ফাউন্ডেশন” গড়ে তুলেন। পাশাপাশি তিনি সাগরনাল উচ্চ বিদ্যালয়ে বিনা বেতনে শিক্ষকতাও করেন। প্রত্যয় ফাউন্ডেশনে বিনামূল্যে শিক্ষাদান ও অসহায় মানুষের চিকিৎসা সেবা প্রদানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। দক্ষিণ সাগরনাল গ্রামে ২০১৬ সালে ৫ শতক ভুমিতে প্রতিষ্ঠা করেন “প্রত্যয় শেখ রাসেল ফ্রি ফ্রাইডে স্কুল”। সেখানে শিক্ষা বঞ্চিত ও ঝরে পড়া শিশুদের শিক্ষাদান শুরু করেন। প্রত্যয় ফাউন্ডেশন লেখাপড়ার কার্যক্রম পরিচালনা করে আর সমাজের বিত্তবানরা বই খাতা ও শিক্ষা উপকরণ যোগান দেন। এভাবে শিক্ষা কার্যক্রম এগুতে থাকে। এর পাশাপাশি অসহায় চিকিৎসা বঞ্চিত মানুষের চিকিৎসা সেবাসহ বিশেষ করে রক্তদান কার্যক্রমের উপর গুরুত্ব দেন।

প্রত্যয় ফাউন্ডেশনের এমন সেবামুলক কর্মকান্ডে ২০১৭ সালে “জয় বাংলা ইউথ অ্যাওয়ার্ড’” লাভ করে। প্রধানমন্ত্রী তনয় ও তথ্য উপদেষ্টা সজিব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে সেই অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ করেন। এছাড়া ২০১৮ সাথে “ ইউথ আইকন অ্যাওয়ার্ড লাভ করে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের এসব সেবামুলক কর্মকান্ডে তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে পুরস্কার হিসেবে সাড়ে ৩ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। সেই টাকায় কেনা হয় ৭টা ভালো মানের কম্পিউটার।

কম্পিউটার কেনার পর থেকে সমাজের পিছিয়ে পড়া চা জনগোষ্টির কথা চিন্তা করে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের বিষয়টি মাথায় আসে। চিন্তার সফল বাস্তবায়নে স্কুলের পাশাপাশি চালু করা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ৩৫ জন প্রশিক্ষণার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এই পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠির কল্যাণে প্রত্যয় ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আরও বৃহৎ পরিসরে এগিয়ে নেয়ার পরিকল্পনার কথা জানান স্থানীয় উদ্যোক্তা মো. মিফতাহ আহমেদ লিটন।#