- জাতীয়, ব্রেকিং নিউজ, মৌলভীবাজার, স্থানীয়, স্লাইডার

কমলগঞ্জ হাসপাতাল চিকিৎসক সংকট ও অনুপস্থিতিতে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত

এইবেলা, কমলগঞ্জ, ২৯ জানুয়ারি ::

চিকিৎসক-নার্স ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে যথাযথভাবে হাজির থাকতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কড়া নির্দেশ দিলেও অনেক জায়গায় তা মানা হচ্ছে না। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে রোগীর দুর্ভোগ যেন চরমে। ২৮ জানুয়ারি (সোমবার) সকাল ১০টায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র। চিকিৎসকের এমন অনুপস্থিতিতে কাঙ্খিত চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে কমলগঞ্জ উপজেলাসহ পাশ্ববর্তী উপজেলা কুলাউড়ার শরীফপুর-হাজীপুর থেকে সেবা নিতে আসা রোগীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ৮ টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করার কথা থাকলেও হাসপাতালে ডিউটিরত এসিস্ট্যান্ট মেডিকেল অফিসার জরুরি বিভাগে চেম্বার করছেন। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ও ৪ জন মেডিকেল অফিসার এর মধ্যে একজন ছাড়া সকাল সোয়া ১০টা পর্যন্ত আর কেউই কর্মস্থলে আসেননি।

জানা যায়, কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডা: মোহাম্মদ ইয়াহইয়া, (উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা), ডাঃ এবিএম সাজেদুল কবির (আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার), মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ মানস কান্তি সিনহা, ডাঃ মুন্না সিনহা, ডা: শওকত আলী, সহকারী ডেন্টাল সার্জন ডাঃ তারানা জেরিন কর্মরত আছেন। সরেজমিন পরিদর্শনকালে শুধুমাত্র আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডাঃ এবিএম সাজেদুল কবিরকে কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। বেশিরভাগ ডাক্তারগণ ছুটিতে কিংবা প্রাইভেট চেম্বার নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। সোমবার সরেজমিন পরিদর্শনকালে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডা: মোহাম্মদ ইয়াহইয়া ও মেডিক্যাল অফিসার (মা ও শিশু) ও ভারপ্রাপ্ত পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা: মো: রকিবুল আলম মৌলভীবাজার জেলা সদরের বাসা থেকে সকাল ১০টা ১৬ মিনিটের সময় ও সহকারী ডেন্টাল সার্জন ডাঃ তারানা জেরিন সকাল ১১টা ১০ মিনিটের সময় অফিসে আসেন। মেডিক্যাল অফিসার ডা: শওকত আলী ঢাকায় একটি প্রশিক্ষণে ছিলেন। হাসপাতালের হারবাল সহকারী রাধাকান্ত পাল অফিসে আসেন সকাল ১০টা ১০ মিনিটের সময়। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডা: মোহাম্মদ ইয়াহইয়া অফিসে আসার পর অবশ্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিকে অবস্থানরত ডাঃ মানস কান্তি সিনহা ও ডাঃ মুন্না সিনহা কার্যালয়ে আসেন।

সকাল ৯টায় আদমপুর থেকে আসা শহীদুল আলমের ছেলে রিপন মিয়াকে নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন, কিন্তু ডাক্তারকে পাওয়া যায়নি তাই তিনি ডাক্তার দেখাতে পারেনি।

হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ এবিএম সাজেদুল কবির ছাড়া কোন ডাক্তারের দেখা মেলেনি। লক্ষ্য করা গেছে, বেশিরভাগ ডাক্তারের অনুপস্থিতি। উল্লেখ্য যে, চিকিৎসকের অনুপস্থিতিতে হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন নার্সগণ। সাধারণ রোগীরা মাঝে সীমাহীন কষ্টে ভোগছেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট উর্ধ্বতন কর্তপক্ষের হস্তক্ষেপই একমাত্র সমাধানের পথ।

কর্মস্থলে দেরি করে আসার বিষয়টি স্বীকার করে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পঃপঃ কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ ইয়াহিয়া বলেন, আমি নিজেই একটু দেরীতে অফিসে এসেছি। এ ছাড়া যারা দেরীতে উপস্থিত হয়েছেন তাদেরকে সতর্ক করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিভিন্ন শিফটে চিকিৎসকরা দায়িত্ব পালন করেন। যথাসময়ে চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হবে।

কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী কমলগঞ্জ উপজেলায় ৩ লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। ৫০ শয্যায় উন্নিত করলেও পর্যাপ্ত ডাক্তার নিযোগ দেয়া হয়নি। ডাক্তার সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে। ডি,এম,এফ (উপ-সহকারী মেডিকেল অফিসার) দিয়ে স্বাস্থ্য সেবা থেকে শুরু করে ফার্মাসিষ্টের দ্বায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। ২০১৮ সালের ১০ মার্চ কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যার কার্যক্রম শুরু করলেও এমবিবিএস ডাক্তার, ষ্টাপ, প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, এক্সরে, জেনারেটর, অপারেশনের যন্ত্রপাতি, অক্সিজেন সংকটের কারনে উপজেলার মানুষেরা চিকিৎসা সেবা পাচ্ছে না। হাসপাতালটিতে বিভিন্নপদে ২৪ জন এমবিবিএস ডাক্তার থাকার কথা থাকলেও ২০টি চিকিৎসকের পদই শূণ্য রয়েছে। এছাড়া ১১ উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে মেডিক্যাল অফিসার, ২জন নার্স, ১জন পরিসংখ্যান, ৪ জন ফার্মাসিস্ট, ১ জন উপ-সহকারী মেডিক্যাল অফিসার, ১ জন এম.টি ল্যাবরেটরী, ১ জন এম.টি রেডিও, ১ জন সহকারী নার্স, ২ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক,১ জন সহ-স্বাস্থ্য পরিদর্শক, ১ জন অফিস সহায়ক, ১ জন কুকের শূণ্যপদ রয়েছে। এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নিত হওয়ার দীর্ঘ ১০ মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও ২০ টি চিকিৎসক পদে কোন নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ৪ জন ডাক্তার দিয়ে সবদিক পরিচালনা করতে না পারায় ডিএমএফ ডাক্তার দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে অন্ত:বিভাগ ও বহি:বিভাগ। এতে করে চিকিৎসার সংকটের কারনে এখানকার মানুষরা স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। তাছাড়া ফার্মাসিষ্ট না থাকায় ফার্মাসিষ্টের কাজ চালাচ্ছেন হাসপাতালের পিয়ন ও ডিএমএফ ডাক্তার। সরকারি সব সুযোগ-সুবিধা থাকার পরেও ডাক্তার সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। অথচ স্বাস্থ্যসেবা মানুষের হাতের নাগালে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তার সংকটের কারণে দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা না থাকায় মূল্যবান যন্ত্রপাতিগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন হতদরিদ্র মানুষ।

সার্বিক বিষয় নিয়ে আলাপকালে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মোহাম্মদ ইয়াহইয়া জানান, অবকাঠামো ও আবাসিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও উপকরন সরবরাহ কার্যক্রম চলমান, ডাক্তার স্বল্পতা বিদ্যমান। ২৪ জন ডাক্তারের মধ্যে ৪ জন কর্মরত রয়েছেন। শূণ্যপদে জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে ৪০তম বিসিএসএর মাধ্যমে চিকিৎসক নিয়োগ সম্পূর্ণ হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী পর্যাপ্ত সংখ্যক রয়েছে। ২টি এ্যাম্বুলেন্স সচল আছে। এক্সরে মেশিনটি অচল অবস্থায় পড়ে আছে। নতুন এক্সরে মেশিনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। শীঘ্রই পাওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মাতৃস্বাস্থ্য, শিশু স্বাস্থ্য ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের ব্যবস্থাপনা বিদ্যমান। নিরাপদ ডেলিভারী সংখ্যা সন্তোষজনক, আরো বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বহি:বিভাগে প্রতিদিন গড়ে ৩০০-৪০০ রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করে। ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হওয়ার পর থেকে সরকার নির্ধারিত সীমিত সার্ভিস চার্জ গ্রহণ করা হয়। চিকিৎসক স্বল্পতার কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। উদ্ধর্তন কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে অবগত করা হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে ২৫টি কমিনিউটি ক্লিনিক ও ৩টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালিত হচ্ছে। উপজেলাবাসীর চিকিৎসা সেবার স্বার্থে কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তার সংকট সহ সকল প্রকার সমস্যা সমাধান করা জরুরি ।#

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *