ফেব্রুয়ারি ৭, ২০১৯
Home » জাতীয় » সালিশকারীদের ক্ষমতা !

সালিশকারীদের ক্ষমতা !

এইবেলা, সুনামগঞ্জ, ০৭ ফেব্রুয়ারি ::

সালিশিদের রায় না মানায় সুনামগঞ্জে একটি সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যদের চার মাস ধরে একঘরে করে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

জেলার দোয়ারাবাজারের মান্নারগাঁও গ্রামের পূর্বপাড়ার এলাকার প্রভাবশালী সালিশিদের রোষানলে পড়ে দশম শ্রেণির স্কুলছাত্রসহ একই পরিবারের ছয় সদস্য এখন মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী উপজেলার মান্নারগাঁও পূর্বপাড়ার অনিল চন্দ্র দাস ইতিমধ্যে সালিশিসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

স্থানীয় এলাকাবাসী ও একঘরে হওয়া পরিবারের লোকজন জানান, উপজেলার মান্নারগাঁও পূর্বপাড়ার অনিল চন্দ্র দাস ও তার সহোদর ছোট ভাই নিধু রঞ্জন দাসের মধ্যে জমিসংক্রান্ত বিরোধ ছিল। এর জের ধরে চার মাস আগে পাড়ার লোকজনের সালিশ চলাকালে দুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মারামারি হয়। এ সময় নিধু নামে একজন আহত হন।

পরে ফের সালিশ বৈঠকে অনিল দাসের পরিবারকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা ও তার স্কুলপড়ুয়া ছেলে অনিক দাসের ওপর চাচা নিধু দাসকে হামলার দায় চাপিয়ে মাথান্যাড়া করার রায় দেয়া হয়।

অনিল চন্দ্র দাস বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, আমি জরিমানার টাকা নিয়ে সালিশিদের কাছে গিয়ে কাকুতিমিনতি করে বলেছি- আমার ছেলে যেহেতু স্কুলে লেখাপড়া করে, তাই তার মাথান্যাড়া করলে হয়তো তাকে আত্মহত্যার প্ররোচনায় বাধ্য করা হবে। তাই মাথান্যাড়ার বিষয়টি বাদ দিতে আমি বাবা হিসেবে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও সালিশিদের তাতে মন টলেনি।

অনিলের স্ত্রী রত্না রানী দাস জানান, গ্রাম্যসালিশে অনিকের মাথান্যাড়া না করায় গত চার মাস ধরে আমাদের পরিবারটিকে একঘরে করে রাখা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, প্রভাবশালী সালিশিদের ইশারায় গ্রামের অন্য কোনো পরিবার আমাদের পরিবারের কোনো সদস্যের সঙ্গে মেশে না, যাতায়াতও করছে না। এমনকি গ্রামের মাঠে গবাদিপশু চরাতেও নিষেধ করা হয়েছে।

অনিকের মায়ের প্রশ্ন আমার ছেলে অনিক হামলাই করেনি তা হলে কেন আমাদের একঘরে রাখা হলো? গ্রামবাসী জানান, সালিশি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন মান্নারগাঁও পূর্বপাড়ার অবনি মোহন দাস ওরফে পাখি দাস, রবীন্দ্র দাস, ধিরু দাস, ভুপ্রেন্দ্র দাস, বকুল দাস, পুতুল দাস, দেবল দাস, রণজিৎ দাস, চিনু দাস, বিলম্ব দাস, মান্নারগাঁও ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য দীপক দাসসহ আরও অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

গ্রামের পশ্চিমপাড়ার প্রদীপ দাস জানান, সালিশের রায়ে মাথান্যাড়া করাটা অনিকের পরিবার না মানায় তাদের একঘরে করার সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। আমাদেরও হুমকি দেয়া হয়েছে তাদের সঙ্গে মেলামেশা না করতে।

গ্রামের পশ্চিমপাড়ার বাসিন্দা নিরঞ্জন দাস জানান, সম্প্রতি অনিলের বাড়িতে গুরুদেব আসার পর আমাদের নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল, কিন্তু আমরা কয়েকজন ওই বাড়িতে যেতে চাইলে পথে ওই পাড়ার কিছু লোক আমাদের বাধা দেন।

এ বিষয়ে সালিশি অবনি মোহন দাস ওরফে পাখি দাসের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, যেহেতু অনিলের ছেলে অপরাধ করেছে, তাই তার মাথান্যাড়া করলে দেহশুদ্ধি হবে।

তিনি আরও বলেন, সে যখন শাস্ত্র মানবে না, তখন আমরা বলেছি- তুমি তোমার মতো চলো, আমরা আমাদের মতো চলব।

স্থানীয় ইউপি সদস্য দীপক দাস সালিশে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করলেও তিনি অনিলের পরিবারকে একঘরে করে রাখা বা মাথান্যাড়া করার বিষয়টি অস্বীকার করেন।

উপজেলার মান্নারগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবু হেনা আজিজ বৃহস্পতিবার বলেন, একঘরে করে রাখার বিষয়টি অমানবিক ও বেআইনি কাজ।

দোয়ারাবাজার থানার ওসি সুশীল রঞ্জন দাস বলেন, অভিযোগ পেয়ে তদন্তে পাঠানোর পর থানার এসআই অভিযোগের বেশ কিছু সত্যতা পেয়েছেন, আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গেই দেখছি।#