এপ্রিল ১৭, ২০১৯
Home » অর্থ ও বাণিজ্য » কুলাউড়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত আশ্রয়ন প্রকল্পে হরিলুট: উপকারভোগিদের ক্ষোভ

কুলাউড়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত আশ্রয়ন প্রকল্পে হরিলুট: উপকারভোগিদের ক্ষোভ

এইবেলা, কুলাউড়া, ১৭ এপ্রিল ::

প্র্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি আশ্রয়ন প্রকল্প-২ কুলাউড়া উপজেলায় মোট তিন শত ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। এ প্রকল্পের অধিনে সরকার প্রতিটি কাঁচা ঘর নির্মাণের জন্য ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। ‘যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ জমিতে ঘর নির্মাণ’ করা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দরিদ্র এসব মানুষের ঘর নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে। এদিকে ঘর নির্মাণের পরিবহন ও ভিটাভরাটসহ অন্যান্য আনুসাঙ্গিক খরচ নিজেরাই বহন করেছেন বলে জানান উপকারভোগিরা। যারফলে তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে।

উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সুজাপুর, কানাইটিকর, গনিপুর এবং জয়চন্ডী ইউনিয়নের রংগীরকুল এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর সিডিউল অনুযায়ী ১৭৫ বর্গফুট আয়তনের একটি ঘরে ৪ বর্গ ইঞ্চি ১২ ফুটের পিলারের পরিবর্তে দেয়া হয়েছে ৩ বর্গ ইঞ্চি ১০ ফুট এবং বারান্দা ও ল্যাট্রিনে ১০ ফুটের পরিবর্তে দেয়া হয়েছে ৮ফুট পিলার। এসব পিলারে ৬ মিলি পরিমানের ৪ টি রডের পরিবর্তে ননগ্রেডের ৩টি করে রড ব্যবহার করা হয়েছে। পিলারের রড বাঁধাইয়ে রিং (চুড়ি) হিসেবে রডের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে ৮ নম্বর জিআই তার। তৃতীয় শ্রেণির ইটের খোয়া (ডাস্টসহ) দিয়ে পিলার বানানো হচ্ছে।

পিলার ঢালাই শেষে চটের মাধ্যমে ১৪ থেকে ২১ দিন পানি দেয়ার (কিউরিং) কথা। কিন্তু সেখানে চটের বস্তা ব্যবহার করা হয়নি, দেয়া হয়নি ঠিকমত পানিও। প্রতি ফুটে একটি করে রিং দেয়ার কথা থাকলেও দেড় ফুট পর পর লাগানো হয়েছে রিং। ল্যাট্রিন নির্মাণে ৮টি করে রিং স্লাবের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয়েছে ৫-৬টি। ঘরের মেঝে ১৫০ মিলিমিটার বালি দেয়ার পর ডাবল লেয়ার পলিথিনের উপর ৩ ইঞ্চি পরিমান ঢালাই দেয়ার নিয়ম থাকলেও দেয়া হয়েছে ১ থেকে দেড় ইঞ্চি। ঘরের চালা ও দরজা-জানালায় লাগানো হয়েছে বেনামী কাঠ। যা পরিমাপেও অনেক ছোট। প্রতিটি দরজা ও জানালায় রং করে লোহার গ্রিল লাগানোর নিয়ম থাকলেও তা করা হয়নি। যার ফলে এসব ঘরের স্থায়িত্বতা নিয়ে সংশয়ে উপকারভোগীরা।

নীতিমালা অনুযায়ি আশ্রয়ণ প্রকল্পে পিআইসির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), সদস্য সচবি (উপজেলা প্রকৌশলী) এবং সদস্যরা হলেন, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন র্কমর্কতা (পিআইও), উপজলো সহকারী কমশিনার (ভূমি) ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। কিন্তু সকলের সমন্বয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কাজ করার কথা থাকলওে পিআইসির সভাপতি (ইউএনও) একক ক্ষমতাবলে তার পছন্দের লোকজনকে দিয়ে প্রকল্পের কাজটি করাচ্ছেন। যা নিয়ে স্ব স্ব ইউনিয়নের চেয়ারম্যানগনের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

পৃথিমপাশা ইউনিয়নের কানাইটিকর গ্রামের রব উল্লাহ (৬৫) প্রধানমন্ত্রীর আশ্রায়ন প্রকল্পের ঘর পেয়েছেন। ঘর পেয়ে তিনি খুশি হতে পারেননি। প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ইতা ঘর দিয়া কিতা করতাম, তুফান (ঘূর্নিঝড়) আইলে উড়াইয়া নিবো গিয়া। কাজ একবারে নিম্নমানের অইছে, এই ঘর কয়দিন টিকবো আল্লায় জানইন।

একই ইউনিয়নের গনিপুর গ্রামের আব্বাস আলী ও আব্দুল আহাদ জানান, মাত্র এক মাসের মধ্যে ঘরের নিচ (ফ্লোর) ফেটে গেছে। যারা কাজ করছে তারা ২০ টুকরি বালি/কংক্রিটের সাথে মাত্র ১ বস্তা সিমেন্ট দিয়া এক-দেড় ইঞ্চি ঢালাই দিছে। এর লাগি এই অবস্থা।

উপজেলার জয়চন্ডী ইউনিয়নের রঙ্গিরকুল গ্রামের কয়েছ মিয়া জানান, ঘরের কাজে বাজে লাকড়ি (কাঠ) ব্যবহার করা অইছে। দুর্বল খুঁটি দিছে। বাতাসে ঘরের খুঁটিগুলো ফাটি যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।

পৃথিমাপাশা ইউনিয়নের গনিপুর গ্রামের নির্মাণ শ্রমিক আজহারুল ইসলাম জানান, আমি নিজে এসব কাজ করি। কিন্তু আমারে যে ঘরটা দেয়া অইছে তা এক্কেবারে নিম্নমানের। এক লাখ টাকাতো দুরের কথা এসব ঘর নির্মাণে ৬০-৬৫ হাজার টাকা খরচ হলেও বেশি হবে।

এসব এলাকার আরও ১০-১২ জন উপকারভোগী অভিযোগ করে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে বিনামূল্যে পাওয়া ঘরের মেঝেতে আমাদেরকে মাটি ভরাট করতে বাধ্য করেছে প্রকল্প বাস্তবায়নের সাথে জড়িত কর্মকর্তারা। এজন্য ধার-দেনা করে গুনতে হয়েছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। মাথাগোজার একমাত্র গৃহটি যাতে সুন্দর হয় সে জন্য কর্তব্যরত কর্তাদের কথামত ঘর নির্মাণকারী শ্রমিকদের নিয়মিত ২ বেলা এমনকি কখনও কখনও ৩ বেলা খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়েছে আমাদের।

বিভিন্ন সুত্রে আমরা জানতে পেরেছি যে, বরাদ্দকৃত অর্থের সম্পূর্র্ণ টাকা ব্যয় করা হয়নি। তড়িঘড়ি করে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সম্পূর্ন টাকা ব্যয়ে যদি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হত তাহলে অসহায়, দুস্থ ও পুণর্বাসিত ব্যক্তিদের স্বপ্ন শতভাগ পূরণ হত। ঘর নির্মাণ শেষে বাড়তি টাকা সুবিধাভোগীদের ফেরত দেয়ার নিয়ম থাকলেও এখন পর্যন্ত কেউ পায়নি।

প্রকল্প থেকে লুটপাটের জন্য ঘর নির্মাণে প্ল্যান, ডিজাইন প্রাক্কলন মোতাবেক গুণগত মান বজায় রাখা হয়নি বলেও অভিযোগ তাদের। এদিকে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা প্রশাসন থেকে পছন্দসই দু’জন ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়। যারা ঢাকার বাসিন্দা। সেই ঠিকাদারের নিয়োগকৃত রাজমিস্ত্রি ও কাঠমিস্ত্রিরা ইচ্ছেমাফিক কাজ করেছেন। সেই মিস্ত্রিদেরকে কিছু বললেই তারা ধমক দিয়ে খারাপ আচরণ করেছেন উপকারভোগিদের সাথে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইউপি চেয়ারম্যান জানান, নীতিমালা অনুযায়ি চেয়ারম্যানরা পদাধিকার বলে কমিটির সদস্য হলেও, কাজে কিংবা তালিকা করার সময় তাদেরকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। তবে বরমচাল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আহবাব চৌধুরী জানান, তালিকা করার সময় কিংবা কাজ করার কিছুই আমরা জানিনা। যখন জানলাম তখন দেখি এক ওয়ার্ডে ৩টা আরেক ওয়ার্ডে ৭টা ঘর। আর এসব ঘর নিয়া এখন আমি পড়ছি বিপাকে।

একাধিক সুত্র থেকে পাওয়া যায় ইউএনওর মনোনীত ঠিকাদার রাজিব মন্ডল এসব কাজ করিয়েছেন। মুঠোফোনে (নং-০১৬৭৭-৭১১৭৭৭) তার সাথে আলাপ হলে তিনি বলেন, সবকিছু জানেন ইউএনও আবুল লাইছ স্যার। তিনিই সব বলতে পারবেন। আমি শুধু টিন কিনে দিয়েছি। এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীদেরকে এই রাজিব মন্ডল একেক সময় নিজের বাড়ি খুলনা আবার আরেক সময় বলেন ঢাকা মিরপুরে।

এই রাজিব মন্ডলের সহযোগীতায় আছেন সুহেল ডায়মন্ড নামক আরেক ব্যক্তি। যিনি বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে নিজেকে সাংবাদিক (টিভি চ্যানেলের মালিক) পরিচয় দিয়েছেন। সেই সুহেল ডায়মন্ডের মুঠোফোনে (নং-০১৭১১-৩৪৮১৯৮) কল দেয়ার পর সাংবাদিক পরিচয় শুনেই ফোনলাইন কেটে দেন।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আবুল লাইছ জানান, এই প্রকল্পে প্রতিটি বাড়ির জন্য বরাদ্ধ ১ লাখ টাকা। এই বরাদ্ধের মধ্যেই বাড়ি নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। ফলে নির্মাণ করে দেয়া বাড়ি শক্ত, মজবুত, টেকসই বা সুবিধাভোগীর প্রত্যাশা অনুযায়ী নাও হতে পারে। ফলে সুবিধাভোগীরা অনেকেই অসন্তুষ্ট হতেই পারেন। কারণ নির্মাণ সামগ্রীর বাজারমুল্য ও শ্রমিকের মজুরি এখন অনেক বেশি।

এব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রায়ন প্রকল্প-০২ এর উপ-পরিচালক (যুগ্ম সচিব) এসএম হামিদুল হক গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, এ প্রকল্পটি উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা বাস্তবায়ন করছেন। কাজে কোন অনিয়মের খবর পাওয়া গেলে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেবো।#