এপ্রিল ২১, ২০১৯
Home » নির্বাচিত » মানুষ তার অভ্যাসের বাইরে যেতে পারে না

মানুষ তার অভ্যাসের বাইরে যেতে পারে না

এম. এ. কাইয়ুম, ২১ এপ্রিল ::

১.

রাত তখন ৩টা। ভাবছি আর ভাবছি। ক’দিন হতে মনের গহীনে একটি অভাগা কষ্টের প্রশ্ন বড়ই নাড়া দিচ্ছে। দাগ কাটছে নিজের দেহ-মনে। তোষামোদ সাধারণত ক্ষমতা বা অর্থের পিছু নেয়। হাতলে তেল কার সাথে মানায় ?। তবে বর্তমান সময়ে এবং স্ব-গৌরবে ফর্মালিন মুক্ত যদি কিছু পাওয়া যায় তা হলো একমাত্র এই ‘তেলবাজি’। কামাল মামা এক প্রসঙ্গে বলেছিলেন-‘প্রত্যেক মানুষই ‘তেল খেতে’ পছন্দ করে। আর কিছু মানুষ তেল দিতে পছন্দ করে। কামাল মামা পেশায় ছিলেন সাংবাদিক। মানবজমিন পত্রিকার প্রতিষ্ঠাকালীন সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। তিনি বর্তমানে লন্ডন আ’লীগের নেতৃস্থানীয় একজন। যাই হোক আমার তেল দ্রষ্টার কথায় আসি। সেই তেল দ্রষ্টা একজন সু-শিক্ষিত ও লেখক এবং নৈপুন্য তৈলাক্ত খাবারে আসক্ত বটে।

২.

নানা কারণে কুলাউড়ার রাজনৈতিক মাঠ তখন উত্তাপ। পর পর মিছিল আর মিটিংয় ভরপুর কুলাউাড়ার শহর। দফায় দফায় অরিক্তি পুলিশ মোতায়েন করছে প্রশাসন। সেই ক্ষনে এক অনুষ্ঠানে তৎক্ষালীন সদ্য যোগদানকারী এক পুলিশ কর্তকর্তার অসৌজন্যমূলক আচরণ ঘটে উনার (আমি যার কথা বলছি) সাথে। এএসআই পদ মযার্দার সেই পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গীয় দুই কনস্টেবল নাকি মারমুখি হয়ে উঠলেন উনার। নিজরে পরিচয় উপস্থাপন করলেও নাকি ছাড় দেয়নি সেই দুই অতি উৎসাহী পুলিশ। কোন কারণ ছাড়াই নাকি সেই আক্রমণ। উনার ভাষায়। তিনি নির্বোধ চাহনীতে লোকলজ্জার ভয়ে ত্যাগ করলেন অনুষ্ঠানস্থল। উনার সাথে আমার দেখা হবার কথা বিকেলে। কিন্তু সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত ৮টা দেখা নাই। মুঠোফোনের বদৌলতে দেখা হল। দেখলাম বিচলিত মন, বিষন্নতা আচ্ছন্ন ।

জানতে চাইলে না সূচক উত্তর। কিন্তু মানুষের চোখ মনের কথা বলে এটা চিরসত্য। আমি নাছোড় বান্দা, কিছু সময় পর ঘটনার রহস্য উদঘাটনে সক্ষম হলাম। সাথে সাথে সিনিয়র একজনকে ফোন দিলাম (তিনি সাংবাদিকদের স্থানীয় পর্যায়ে বড়  নেতা)। ঘটনার বর্ননা শুনে আমায় তোষামোদ করলেন। আর বললেন-‘খোঁজ নিয়ে দেখো হে কিতা করছে, পরে প্রতিবাদ করবায়’। আমি কিছু বুঝাতে গেলে অপাশ থেকে আবারও-‘সবতাত ফাল দিও না, বুঝিও, এটা পুলিশর বিষয়।’ আমার বুঝতে বাকী রইল না নেতার দায়িত্ব নড়বড়ে। আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চোখে মুখে বিষন্নতার ছাপ । সিদ্ধান্ত নিলাম ফোনে যা শুনেছি তা বলা যাবে না। অপরাধ বোধ মনে করেও বললাম- ‘তিনি ঘটনা শুনে রাগ করেছেন, আর আসছেন আমাদের কাছে। ততক্ষনে ফোন দিলাম ছোট এক নেতাকে। অকল্পনীয় হলেও সত্য, ফোন পেয়ে তড়িৎ গতিতে মোটরবাইকে থানায়। একে একে একই পেশায় আবদ্ধ ৭-৮ জন একত্র হলাম। ফোনের চাপে এক পর্যায়ে বড় নেতা আসলেন এবং সবাই প্রবেশ করলেন ওসি সাহেবের
রুমে। বিষয়টি অবগত হয়ে দূরদর্শী ওসির তাৎক্ষনিক এ্যাকশনে তিনি —-। আপ্যায়ন শেষে সবাই ত্যাগ করলাম থানা।

সেই তিনি আজ ভালো আছেন। ন্যায় সঙ্গত এক বিষয়ের প্রতিবেদনের আলোকে আমায় ব্যঙ্গ করতে দারস্ত হলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধমের। মনের খায়েশ পুরো করে গদগদ করে লিখলেন। আমি তখন ঢাকা থেকে কুলাউড়া আসার পথে আন্ত:নগর জয়ন্তীকা ট্রেনে। সম্ভবত নয়াপাড়া রেলস্টেশন অতিক্রম কলে তেলের বাহারী স্ট্যাটাস দেখলাম, মৃদৃ হাসি খানা আটকাতে পারলাম না। লেখায় প্রমান করে- উনার পেশার প্রতি ভালোবাসা নিতান্ত্যই সামান্য। লেখায় ফুটিয়ে তুললেন ‘তেলবাজির এক মায়াকান্না’। যেহেতে মাথা উচু করে, কাচুমাচু না করে তেলেই সয়লাভ- বুঝলাম চিচিংফাঁক।

৩.

অহেতুক, অতিরিক্ত, কখনোবা অনুপস্থিত গুণাবলির প্রশংসা করে তার মাধ্যমে লাভবান হওয়ার ব্যক্তিত্বহীন বা নির্লজ্জ প্রয়াসের নাম তেলবাজি।
প্রচলিত ভাষায় এর নাম ‘তেল দেয়া’। আর ব্যক্তির নাম তেলবাজ। তোষামোদকারীকে চাটুকার বা খয়ের খা-ও বলা হয়। বলাবাহুল্য, এসময় তোষামোদকৃত ব্যক্তির কোন ব্যর্থতা বা দোষ তোষামোদকারীর দৃষ্টিগোচর হয়না কিংবা স্মরণে আসলেও তা উল্লেখ করা হয়নি সেই লেখনিতে। কিন্তু ন্যায়ের বেলা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলেও তেলের সাগরে আমার নূন্যতম প্রাপ্তি টুকু প্লাবিত। ব্যক্তি যেহেতু এটি পছন্দ করে সাংবাদিকতায় সম্পর্ক তৈরি, উন্নয়ন ও সংরক্ষণ এবং তথ্য সংগ্রহে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছেন। তাই অনেক সাংবাদিক ব্যক্তিজীবনে বন্ধুমহলে ‘তেলবাজ’ হিসেবে অভিহিত হন।

আমার মৃদৃ হাসির রহস্য জানতে চাইলেন সামনের সিটে বসা এক ভদ্র যুবতী। (তিনি অবশ্যই স্বামীর বাড়ি আসছিলেন। স্বামীর বাড়ি কুলাউড়ার সদর ইউনিয়নের গাজীপুরে)। রহস্য আড়ালে রেখে তৈলাক্ত গল্পে পাশ কাটালাম। তবে আজ একটু লিখলাম। আসন্ন রমজানে তেল বড্ড চাহিদা। তেলহীনরা যখন একাট্টা, তেলের একক রাজত্ব চলছে আলাদা। তাই বাধ্য হয়ে তেল দ্রষ্টার কাছে চাই সহযোগীতা। তেল নিয়ে বাহারী রেসিপি তৈরিতে কাজে আসবে ইফতারে।

তবে আমার আত্মসম্মানবোধের বিষয় লক্ষনীয়। সততা, উদারতা, পরিশ্রমপ্রিয়তা, পরোপকারিতা, বিনয় প্রভৃতি গুণাবলির মধ্যে ব্যক্তির মত একটি জাতির জন্য সবচেয়ে গর্ব করার মত গুণ হতে পারে এই-আত্মসম্মানবোধ। হাটি হাটি পা পা করে হলেও আত্মসম্মানবোধ নিয়েই ‘বড়’ হতে হয়। যারা বলেন, তোষামোদ করে নিজের স্বার্থসিদ্ধি করে ‘বড়’ হয়ে নিই পরে আত্মসম্মানবোধের দিকে খেয়াল করব; তাদেরকে বলব, মানুষ তার অভ্যাসের বাইরে যেতে পারে না। আর ব্যক্তির নাম তেলবাজ।

লেখক: সংবাদকর্মী