মে ১২, ২০১৯
Home » জাতীয় » কুলাউড়ায় গ্রাম আদালতের বিচারক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে তোলপাড়

কুলাউড়ায় গ্রাম আদালতের বিচারক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে মামলা নিয়ে তোলপাড়

এইবেলা, কুলাউড়া, ১২ মে ::

কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নে ইছরাইল আলী (২৮) নামক এক যুবকের বিষপানে আত্মহত্যার ঘটনায় ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার দিন ইছরাইল আলীর বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগে কাদিপুর ইউনিয়ন গ্রাম আদালতে ৩৫ হাজার টাকা দন্ড হয়। একটি প্রভাবশালী মহলের ইন্দনে বিষপানের আত্মহত্যার পর নিহত ইছরাইল আলীর পিতা বিচারক ইউপি চেয়ারম্যান, ঘটনার বাদি ও বাদিপক্ষের গন্যমান্য ব্যক্তিকে আসামী করে কুলাউড়া থানায় মামলা দায়ের করেন। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলা জুড়ে তোলপাড় চলেছে।

সরেজমিন কাদিপুর ইউনিয়নে গেলে স্থানীয় লোকজন, ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান সালাম, গ্রাম আদালতের পেশকার, সহকারীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকতারা জানান, ইউনিয়নের মধ্য মনসুর গ্রামের সামছুল ইসলাম চৌধুরী পাবেল কাদিপুর ইউনিয়ন গ্রাম আদালতে তার বাসা চুরির ঘটনায় গত ০৮ এপ্রিল একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় একই গ্রামের আছদ আলীর ছেলে ইছরাইল আলীকে অভিযুক্ত করা হয়। গত ৫ মে গ্রাম আদালতে বিষয়টি শুনানি শেষে বিচারক ও কাদিপুর ইউপি চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ছালাম বাদি-বিবাদী পক্ষের ২ জন করে ৪ জন এবং তিনিসহ ৫ সদস্যের প্যানেল বোর্ড গঠন করেন।

গ্রাম আদালতে বাদি পক্ষে ছিলেন ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা ও নজরুল ইসলাম চৌধুরী। বিবাদী পক্ষে ছিলেন ইউপি সদস্য সাতির খান ও ইউপি সদস্য নজরুল ইসলাম ইরা। গ্রাম আদালতে ইছরাইল আলীর পিতা আছদ আলীর বক্তব্যে চুরির ঘটনা প্রমানিত হয়। ৫ সদস্যের বিচারক প্যানেল সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক অভিযুক্ত আসামী ইছরাইল আলীকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। তবে গ্রাম আদালতে মারপিটের কোন ঘটনা ঘটেনি।

গ্রাম আদালতের রায়ের পর আদালতের বারান্দায় ইছরাইল আলী তার বাবা আছদ আলী সাক্ষী দিয়ে তাকে চোর সাব্যস্ত করেছেন বলে বাবাকে দোষারোপ করে। এরপর বাড়ি ফিরে বাবা ও ছেলে পরস্পরকে অভিযুক্ত করেন। ঘটনার দিন বিকেল ৫টায় এক পর্যায়ে বাবা আছদ আলীর বিরুদ্ধে অভিমান করে ছেলে ইছরাইল আলী কীটনাশক পান করেন। প্রথমে কুলাউড়া হাসপাতালে ও পরে সিলেট ওসমানী হাসপাতালে ভর্তি করলে পরদিন ৬ মে সকাল ৮টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় ইছরাইল আলী।

ইছরাইল আলীর মৃত্যুর পর প্রভাবশালী মহলের প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে ৭ মে রাতে আছদ আলী কুলাউড়া থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগ এনে ইউপি চেয়ারম্যান ও গ্রাম আদালতের বিচারক হাবিবুর রহমান ছালাম, গ্রাম আদালতের মামলার বাদী গোলাম মোস্তফা চৌধুরী পাবেল ও বাদী পক্ষের মনোনীত গণ্যমান্য ব্যক্তি নজরুল ইসলাম এবং একটি অনলাইন পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি এমএ কাইয়ুমসহ অজ্ঞাতনামা ৫-৬ জনের নামে কুলাউড়া থানায় মামলা দায়ের করেন।

মামলার এজাহারে ঘটনাস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয় কাদিপুর ইউনিয়র চেয়ারম্যানের অফিস ও গ্রাম আদালতের কক্ষ। অথচ ইছরাইল আলী নিজ বাড়িতে কীটনাশক পান করে। আদালত কক্ষে চেয়ারম্যান আসামী ইছরাইল আলীকে মারপিট করেছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়।

এদিকে গ্রাম আদালতের বিচারক ও অভিযোগকারীকে আসামী করে মামলার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। গ্রাম আদালত বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের একটি প্লান বাস্তবায়ন করছে ইউনিয়ন পরিষদ। অথচ সেই প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা গ্রহণ করায় সংস্থার লোকজন ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। সেই সাথে ঘটনায় ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন কাদিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দারা। তারা যতক্ষণ পর্যন্ত মামলা প্রত্যাহার না করা হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রাম আদালতের কার্যক্রম স্থগিত রাখার জোর দাবি জানান।

ব্রাস্ট’র জেলা ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী তাহমিনা পারভীন জানান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের মাধ্যমে গ্রাম আদালত পরিচালিত হচ্ছে। গ্রাম আদালতে ক্ষতিগ্রস্থরা আসবেন, স্বাক্ষী প্রমাণ নিয়ে প্যানেল বোর্ডের মাধ্যমে চেয়ারম্যান তথা বিচারক মন্ডলী রায় প্রদান করবেন। এটা সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আদালত পরিচালনার সময় কোন হামলার সুযোগ নেই। কাজেই কাদিপুরের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ছালাম গ্রাম আদালতের সকল বিধিবিধান মেনেই চুরির ঘটনার রায় প্রদান করেন। এখানে পুলিশি হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। আদালতের কোন কার্যক্রমের বিরুদ্ধে উচ্চতর আদালত দেখতে পারেন, পুলিশ নয়। তিনি আরও বলেন, বিষয়টি ব্রাস্ট’র এবং পুলিশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও অবহিত করা হয়েছে।

প্রকল্পের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা নামপ্রকাশ না করারা শর্তে জানান, পুলিশ উক্ত মামলা নেয়ায় সরকারের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে বিবেধ সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে চেয়ারম্যান গ্রাম আদালত পরিচালনা করেন। বিষপানে আত্মহত্যার ঘটনা বাইরে ঘটে থাকলে এজন্য গ্রাম আদালত কিংবা বিচারক দায়ী নয়। কয়েকদিনের মধ্যে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল বিষয়টি সরেজমিনে তদন্ত করবে। তিনি বলেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিষয়টি দেখা হচ্ছে।

কুলাউড়া থানার ইন্সপেক্টর (তদন্ত) সঞ্জয় চক্রবর্তী জানান, চেয়ারম্যান মারপিট করেছে এবং এ ঘটনায় অভিমানে সে বিষপান করেছে এজন্যই মামলা নেয়া হয়েছে। বাদি প্রথমে ৩ জনকে আসামী করলেও পরে সম্পুরক এজহারে আরও ৫-৬ জনকে অভিযুক্ত করেছে। #