মে ১৩, ২০১৯
Home » ব্রেকিং নিউজ » অদম্য মেধাবী: টাকার অভাবে কমলগঞ্জের অদিতির চিকিৎসক হবার স্বপ্ন ভঙ্গের উপক্রম

অদম্য মেধাবী: টাকার অভাবে কমলগঞ্জের অদিতির চিকিৎসক হবার স্বপ্ন ভঙ্গের উপক্রম

প্রনীত রঞ্জন দেবনাথ, কমলগঞ্জ, ১৩ মে ::

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর ইউনিয়নের চা বাগান অধ্যুষিত মাধবপুর বস্তি লাইন এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের মেধাবী কন্যা অদিতি নুনিয়া। বাবা নেই সংসারে। মা রুমা নুনিয়া ও ভাই অতুল নুনিয়া। অনেক কষ্টে কোনভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে যে পরিবারটি। সে পরিবারের দুই সদস্যের লেখাপড়া করানো দুঃসাধ্যই বৈকি। তবুও লেখা পড়া করে মানুষ হবার ব্রত নিয়ে শত বাঁধা ডিঙিয়ে অদিতি পড়ছে। এবছর এসএসসি পরীক্ষায় মাধবপপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগে গোল্ডেন জিপিএ-৫ লাভ করেছে সে। অদিতি পিএসসি ও জেএসসিতেও জিপিএ-৫ সহ বৃত্তি লাভ করে। আর বৃত্তির টাকায় এতদুর পর্যন্ত আসতে পেরেছে। বৃত্তির টাকা আর মা এর সহযোগীতা না পেলে হয়তো এ পর্যন্ত আসা সম্ভব হতোনা বলে জানায় অদিতি। কিন্তু অদম্য মেধাবীদের কি দমিয়ে রাখা যায় ? ভালো ফলাফলে দু’চোখ ভরা উচ্ছ্বাস থাকলেও উচ্চশিক্ষার ব্যয় কিভাবে মিটবে সে দুশ্চিন্তা তাড়া করে ফিরছে অদিতির।

কমলগঞ্জের মাধবপুর উচ্চ বিদ্যলয়ের ইতিহাসে থেকে অদিতি প্রথম গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে। মা রুমা নুনিয়া মাধবপপুর চা বাগানের ভেতর একটি ছোটখাটো বিউটি পার্লারের দোকানে কাজ করেন। নুন আনতে পান্তা ফুরায় সংসারে অনেকদিন না খেয়েই ঘুমাতে হয় অদিতিদেরকে । ক্ষুধার যন্ত্রণা আর দারিদ্র্যের কঠোরতায় তবু তার শিক্ষা অর্জনের ¯পৃহাকে একটুও দমিয়ে রাখতে পারেনি। তাই খেয়ে না খেয়ে প্রতিদিন নিয়মিত ক্লাস করে এবারের এসএসসিতে এ ফলাফল লাভ করেছে অদিতি। অনেক আশায় বুক বেঁধে স্বপ্ন দেখেছিলো অদিতি। বাবা চিকিৎসার অভাবে হারানোর পর চিকিৎসক হয়ে দরিদ্র রোগীদের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দেয়ার ব্রত নেয়। আঁধার ঘরে চাঁদের আলো চা বাগানের মেয়ে অদিতির সে স্বপ্ন বোধ হয় আর পুর্ণ হবেনা, ভেঙে যাবে অচিরেই।

মা চাচ্ছেন ভাল কোন বর দেখে মেয়ের বিয়ে দিতে। কিন্তু অদিতি চায় উচ্চশিক্ষা অর্জন করে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্নের ব্রত পূরণ করতে। শুধু অর্থের অভাবে দারিদ্রতার করাল গ্রাসে মেধাবী এ সন্তানের লেখাপড়ার অদম্য ইচ্ছাকে পিষে ফেলে এ বয়সেই বিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তার মা ।

মা রুমা নুনিয়া কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন,অদিতির বাবা অনন্ত নুনিয়া ছিলেন একজন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার, সে বেঁচে থাকতে আমাদের কোন কিছুর অভাব ছিলোনা। কি সুখের সংসার ছিলো আমাদের। ও হঠাৎ করে মরে গিয়ে আমাদের ভাঁসিয়ে গেল অথৈ সাগরে। এমনও দিন গেছে মানুষের বাড়ি থেকে দু’মুঠো আটা এনে নিজে অপোস থেকে ছেলে মেয়েকে গুলোকে শুকনো রুটি বানিয়ে খেতে দিয়েছি, আর অন্যবেলা রেখেছি অপোস।

অনেক কষ্টে সন্তানদের লেখাপড়া করিয়েছি। আর পারছি না। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। এত টাকা আমি কোথায় পাব ? পরিবারে এখন আনন্দের পরিবর্তে বিরাজ করছে শোকাবহ পরিবেশ। উচ্চ শিক্ষার প্রত্যাশা তার ও তার পরিবারের কাছে চরম বিলাসিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

অদিতি নুনিয়া ভবিষ্যতে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজ ও সংসারের জন্য কিছুটা অবদান রাখতে চায়, চায় ডুবন্তপ্রায় সংসারের হাল ধরতে। এ অবস্থায় এসএসসি পরীক্ষায় এমন আশ্চর্য্যজনক ফলাফলের পরও তার পরিবার চরম দূর্ভাবনায়। অভাগিনী মায়ের সাধ আছে, সাধ্য নেই। এ অবস্থায় কতোদুরই যেতে পারবে অদিতিরা।

নুন আনতে পানতা ফুরানো সংসারের ভাত-কাপড়ের চাহিদা মিটাতে হিমশিম অবস্থা যাদের,কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানকে পড়ানো তাদের জন্য ভাঙা ঘরে ছেড়া কাঁথায় আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন বৈকি। কিন্তু অপ্রতিরোধ্য দারিদ্রের সুকঠিন বাধা ডিঙিয়ে এতটুকো পথ যারা পাড়ি দিতে পেরেছে, শাণিত মেধার মঙ্গল আলোয় স্বপ্ন পূরণের দৃঢ় প্রত্যয়ে তারা এগিয়ে যাবে যদি সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসে, তবেই পুরণ হতে পারে অদিতির উচ্চ শিক্ষার স্বপ্নসাধ। নতুবা এখানেই থেমে যাবে অদম্য মেধাবী অদিতির শিক্ষা জীবন। ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করার স্বপ্ন অদিতির। কিন্তু টাকার অভাবে সেই স্বপ্ন পূরণ হবে কিনা জানা নেই তার।#