- নির্বাচিত, ব্রেকিং নিউজ, স্লাইডার

বাংলাদেশে মণিপুরি মুসলিম পাঙালদের ঈদ উৎসব!

রফিকুল ইসলাম জসিম, ০৪ জুন ::

মানব সভ্যতার শুরু থেকেই বিভিন্ন সমাজ ও সম্প্রদায়ের উৎসবের প্রথা রয়েছে। তবে আমেজ ও আচারে রয়েছে ভিন্নতা। ঈদ অপরাপর ধর্ম, সংস্কৃতি, জাতি ও দেশের উৎসব অনুষ্ঠান থেকে ভিন্নতর। এটাই ইসলামের স্বাতন্ত্র্য ও অনন্য বেশিষ্ট্য। ঈদের গুরুত্ব ও মহত্ত্ব অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের চেয়ে অনেক গুন বেশি। ঈদ শুধু একটি জাতি কিংবা একটি দেশের সৌভ্রাতৃত্বের কথা বলে না; ঈদ বিশ্বের সব জাতি মানুষের সম্প্রীতি ও সৌভ্রাতৃত্বের কথা বলে।

ঈদ মুসলমাদের আনন্দমুখর উৎসব, তবে ঈদ কিন্তু নিছক উৎসব নয়। ঈদে ব্যক্তিগত আনন্দ বা ফুর্তির যে আমেজ, তার চেয়ে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে সামাজিক সন্তুোষে রুপান্তরিত হয়। বাংলাদেশে বৃহত্তর জনসমষ্টির বাঙালি মুসলিমদের নিকট ঈদুল ফিতর তেমনি দেশের অতি স্বল্প পরিচিত নৃ-গোষ্ঠী মণিপুরি মুসলিম (পাঙাল) সম্প্রাদায়ের এক আনন্দঘন অনুষ্ঠান।

ঈদ পাঙনদের বড় ধর্মীয় উৎসব। ঈদের দিনে গোত্র বংশ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর পাঙন এক কাতারে সমবেত হয় এই বিশেষ দিনটিকে উদযাপন করার জন্য। ঈদের জামাতও নির্দিষ্ট স্থানে অনুষ্ঠিত হয়। মসজিদে, দোকানে, হাটবাজারে, খেয়াঘাটে সবখানে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পালা চলে। আত্মীয় স্বজন ও পরিচিত জনদের দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হয়। পরিবারের সবার জন্য নতুন জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করা হয়। এদিন মেয়েদের জন্য পর্দা কিছুটা শিথিল থাকে। ঈদের দিনে পাঙন মেয়েদের ঐতিহ্যবাহী পোষাক পরে দল বেঁধে আত্মীয় স্বজনের বাড়ী বেড়াতে যাওয়ার দৃশ্য তাকিয়ে দেখার মতো।

পাঙ্গালরা সুন্নী মুসলমান। ধর্মীয় বিশ্বাস এক হলেও স্থানীয় বাঙালী মুসলিম জনগোষ্ঠির সঙ্গে সামাজিক কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে। তাদের ধর্মাচরন, সমাজব্যবস্থা ও রীতিনীতির সঙ্গে বাঙালী মুসলমানদের যথেষ্ঠ পার্থক্য। প্রচন্ড ধর্মভীরু ও রক্ষনশীল তারা। পাঙন মেয়েরা কঠোর পর্দপ্রথা মেনে চলে। নিজেদের সম্প্রদায়ের বাইরে বৈবাহিক সম্পর্ক পাঙন সমাজ অনুমোদন দেয় না। নানান সামজিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মাতৃভাষা ও ঐতিহ্যকে গুরুত্ত্ব দিয়ে থাকে। তাদের সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোতে কোরান শরীফের তর্জমা ও তাফসীর, হাদিসের পাঠ ও ব্যাখ্যা সবকিছু মাতৃভাষায় করা হয়ে থাকে। এছাড়া বিয়ের দিনে “কাসিদা” নামে পরিচিত এক ধরনের লোক ঐতিহ্যবাহী বিয়ের গান ও নাচের অনুষ্ঠান থাকে যা পাঙলদের একান্ত নিজস্ব।

সপ্তদশ শতকের প্রথম দিকে (১৬০৬ খ্রি:) হবিগঞ্জের তরফ অঞ্চলে পাঠান শাসক খাজা ওসমানের সেনাপতি মোহাম্মদ সানীর নেতৃত্বে ইসলাম ধর্মের অনুসারী একদল সৈন্য মণিপুর রাজ্যে অভিযান চালায়। এই যুদ্ধের ফলাফল সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। অনেক ঐতিহাসিক মতে এই যুদ্ধে মোহাম্মদ সানীর বাহিনী পরাজয় বরণ করে এবং ৩০টি হাতি, অসংখ্য হাতবন্দুকসহ মহারাজ খাগেম্বার হাতে বন্দি হন। আবার ভিন্ন মতাবলম্বীদের মধ্যে ঐ ব্যাপক যুদ্ধের অবসান ঘটেছিল সন্ধির মাধ্যমে। অধিকাংশ ঐতিহাসিকদের মতে তখনকার মণিপুরের রাজা খাগেম্বার সাথে এক সন্ধির ফলে সেনাপতি মোহাম্মদ সানী মহারাজা খাগেম্বার ছোট রানীকে বিয়ে করেছিলেন। ফলে সৃষ্টি হয় ‘মাতা মণিপুরি ও পিতা মুসলমান’ এর সমন্বয়ে নতুন এক সম্প্রদায়, যার নাম মৈতৈ পাঙাল বা মণিপুরি মুসলিম (পাঙাল)।

ভিন্ন ভিন্ন সময়ে মণিপুরের রাজপরিবারের পারিবারিক কলহ, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক, বিশেষ করে যুদ্ধবিগ্রহের কারণে মণিপুরিরা উপমহাদেশে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলশ্রুতি হিসাবে বর্তমানে বাংলাদেশে সিলেট বিভাগে মৌলভীবাজারে কমলগঞ্জে প্রায় পঁচিশ হাজার মণিপুরী মুসলিম বাস করে।

ইতিহাসবিদদের ধারনা “পাঙন” শব্দটি এসেছে “পাঙ্গাল” শব্দ থেকে যার উৎপত্তি “মুঘল” থেকে (পাঙ্গাল>মুঙ্গাল>মুঘল এভাবে)। অনেকে আবার পাঙ্গাল শব্দটিকে “বাঙ্গাল” শব্দের বিবর্তিত রূপ বলেও মনে করেন। পাঙনদের শারীরিক গঠন ও দেহাবয়ব মণিপুরী বিষ্ণুপ্রিয়াদের মতোই মিশ্র আর্য। তাদের মাতৃভাষা মণিপুরী মৈতৈ ভাষারই একটি রূপ।

পাঙনরা প্রচন্ড পরিশ্রমী জাতি। ভিক্ষাবৃত্তিকে এরা ঘৃণ্যতম পেশা মনে করে। কৃষিকাজ ছাড়াও তারা বাঁশ ও বেত দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কৃষি যন্ত্রপাতি ও আসবাব তৈরীতে দক্ষ।পাঙন মেয়েরা কৃষিকাজে পুরুষের সমান পারদর্শী। এছাড়া কোমর তাঁতে কাপড় বোনা এবং সুচিকর্মে পাঙন মেয়েদের দক্ষতা রয়েছে। মণিপুরীদের পরিধেয় ফানেক বা চাকসাবির উপর পাঙন মেয়েদের সুঁই সুতার সুক্ষ কারুকাজ দেখলে বিস্মিত হতে হয়।

ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও পাঙ্গানরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ঐতিহ্য আজও বজায় রেখেছে। তাদের ঘরবাড়ি, পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্রে ভরপুর।#

লেখক ও সাংবাদিক ; মোবা : ০১৭৭৯৬৬৬৯৩২

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *