- অর্থ ও বাণিজ্য, জাতীয়, ব্রেকিং নিউজ, মৌলভীবাজার, স্থানীয়, স্লাইডার

হাকালুকি হাওর তীরে নৌকার কারিগরদের দু:খ কথা

এইবেলা, কুলাউড়া, ০৬ জুন ::

নৌকা তৈরি করে এখন জীবিকা নির্বাহ করা দুষ্কর। ফলে এই পেশা ছেড়ে মানুষ পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। গুটি কয়েক পরিবার সনাতনী এই পেশায় আকড়ে আছে, বিদেশ যাবার সুযোগ নাই বলে।

এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকির তীরের মানুষের মাঝে চলাচলের ক্ষেত্রে একটা প্রবাদ ছিলো- বারিষায় (বর্ষায়) নাও (নৌকা) আর এওতে (শুষ্ক মৌসুমে) পাও (পা)। প্রবাদটি এখনও আছে। বর্ষা মৌসুম শুরুর আগে তাই নৌকা বানানোর কারিগর বা মিস্ত্রিরা বর্ষার নৌকা বানাতে ব্যস্ত সময় পার করেন। তবে ভিন্নতা এসেছে এই কারিগরদের মাঝেও। আগে ছোটবড় নৌকা বানালেও কালের পরিবর্তে এখানে এসেছে পরিবর্তন। এখন নৌকার চেয়ে ছোট ছোট ডিঙি নৌকা বেশি তৈরি করে থাকেন।

বর্ষা মৌসুমে হাওর অঞ্চলের মানুষের মালামাল পরিবহন ও চলাচলের একমাত্র বাহন হিসেবে নৌকার ব্যবহার দীর্ঘদিনের। হাকালুকি হাওর তীরে সবচেয়ে বেশি নৌকা বানানো ও কেনাবেচা হয় কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে। বর্ষার মৌসুম শুরু হওয়ার আগে চলে নৌকা বানানো। আর বর্ষামৌসুম শুরু হলে চলে বিক্রি। এই গ্রামেই বসে নৌকার হাট। হাকালুকি হাওরের তীরবর্তী কুলাউড়া, জুড়ী, বড়লেখা, ফেঞ্চুগঞ্জসহ নিম্নাঞ্চলের মানুষ এই হাটে আসেন নৌকা কিনতে।

জালালাপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আগে গ্রামের প্রায় সব মানুষই নৌকা তৈরির কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু এখন গ্রামে নৌকা বানানোর মিস্ত্রি খোঁজে পাওয়া দুষ্কর। নৌকা তৈরি করে বিক্রি করার দীর্ঘ মেয়াদি ঝামেলায় জড়াতে চায় না মানুষ। ফলে দিন দিন কমছে নৌকা তৈরির কারিগরদের সংখ্যা।

নৌকা তৈরির কারিগর ভুকশিমইল ইউনিয়নের জলালপুর গ্রামের অধির দাস জানান, বর্তমানে নতুন নৌকা তৈরির চেয়ে পুরনো নৌকা মেরামতের কাজই বেশি হচ্ছে। নতুন নৌকা তৈরির ক্ষেত্রে ছোট মাপের নৌকা অর্থাৎ ডিঙি নৌকা প্রতিটি খরচ পড়ে ৭-৮ হাজার টাকা এবং ছোট মাপের নৌকা তৈরিতে খরচ পড়ে ১২-১৫ হাজার টাকা। এরপর সেটা বিক্রি করে লাভ করা।

একই ইউনিয়নের দক্ষিণ সাদিপুর গ্রামের রশিদ মিয়া দুঃখ করে বলেন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা না থাকায় আমরা এ ব্যবসায় অনেক কষ্ট দুঃখের মধ্যে টিকে আছি। ভালো মানের বড় একটা নৌকা তৈরিতে প্রায় লক্ষ টাকা ব্যয় হয়। তবে এর সংখ্যা খুব কম। আমাদের এলাকায় মাঝারি ও ছোট মাপের নৌকা বেশি বানানো হয়। একটা মাঝারি সাইজের একটা নৌকা তৈরি করতে প্রায় ৪০-৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।

নৌকা তৈরির কারিগর বা মিস্ত্রিরা জানান, একেকটি নৌকা তৈরিতে মিস্ত্রি ও হেলপার (সাহায্যকারির) সময় লাগে ২০ থেকে ৩০দিন। এরপর কাঠের মুল্য। নৌকা বানাতে চন্দন ও জারুল কাঠই উত্তম। চন্দন কাঠ এখন আর পাওয়া যায় না। শুধু জারুল কাঠেই নৌকা বানাতে হয়। নৌকা বানিয়ে বিক্রি করে এখন আর জীবিকা নির্বাহ করা দুষ্কর। ফলে অনেকেই এই পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। বেশি আয়ের আশায় মধ্যপ্রাচে পাড়ি জমিয়েছেন। এখন আর আগের মত নৌকার জমজমাট হাট বসে না। মিস্ত্রিরা নৌকা ছাড়া আলাদা করে বিক্রির জন্য বৈঠা তৈরি করে থাকেন। একেকটি বৈঠা ৫শ থেকে ২ হাজার টাকা বিক্রি হয়ে থাকে।

নৌকা ব্যবসায়ী ভুকশিইল ইউনিয়নের আহছান উল্লাাহ জানান, যুগের পরিবর্তন হলেও হাকালুকি পাড়ের মানুষের জন্য এখনও নৌকার বিকল্প নেই। এছাড়া মাছ ধরার কাজেও নৌকা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ইঞ্জিন চালিত নৌকার প্রাদুর্ভাব হওয়ায় লগি-বৈঠাওয়ালা নৌকার প্রচলন কমে যাচ্ছে। চলাচলের ক্ষেত্রেও ইঞ্জিনের নৌকায় মানুষ অনেকটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।#

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *