- আন্তর্জাতিক, কুলাউড়া, জাতীয়, ব্রেকিং নিউজ, স্থানীয়, স্লাইডার

কুলাউড়ার মুরইছড়া ও আলীনগর সীমান্ত এলাকা যেখানে সন্ধ্যা নামে অজানা আতঙ্ক নিয়ে

এইবেলা, কুলাউড়া, ০৩ জুলাই ::

কুলাউড়া উপজেলার মুরইছড়া ও আলীনগর সীমান্ত এলাকায় বিজিবির সোর্সদের কাছে জিম্মি সাধারণ মানুষ। দুটি সীমান্ত এলাকার কমপক্ষে ১০টি গ্রামে সন্ধ্যা নামে হামলা, মামলা, গ্রেফতার, ঘরের গরু ভারতীয় বলে নিয়ে যাওয়া, মাদক দিয়ে গ্রেফতার করাসহ নানা আতঙ্ক নিয়ে। কখন কাকে ধরে নিয়ে যায় এই আতঙ্কে সাধারণ মানুষ এলাকায় শান্তিতে ঘুমাতেও পারে না।

সরেজমিন মুরইছড়া ও আলীনগর সীমান্ত এলাকা গেলে মানুষের চোখে মুখে ফুটে উঠে এক অজানা আতঙ্ক আর ভয়। সাংবাদিক যেনেও কেউ মুখ খুলতে চান না। কারণ পরের দিন সংবাদে নাম প্রকাশ হলে আরও বেশি হয়রানির শিকার হতে হবে ভেবে। এই দুটি সীমান্তের মুল চোরাচালানীরা সোর্সের মারফত বিজিবিকে মাসোহারা দিয়ে নির্বিঘ্নে তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নিরীহ মানুষকে হতে হচ্ছে হয়রানির শিকার। সীমান্তের যেসব গ্রামে এমন আতঙ্ক বিরাজমান সেগুলো হলো মুরইছড়া সীমান্ত এলাকার ফটিগুলি. পাট্রাই, মুরইছড়াবস্তি, দশটেকি, রাঙ্ছিড়া, নলডরি, টাট্রিউলি, পূর্বটাট্রিউলি এবং আলী নগর সীমান্তের গণকিয়া, আলীনগর, ধামুলি। কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে চক্রটি।

স্থানীয় লোকজন জানান, ভারত থেকে মুরইছড়া ও আলীনগর সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন ভারতীয় গরু, নাসিরবিড়ি, কাপড়, ফেন্সিডিল, ইয়াবাসহ বিভিন্ন প্রকার মাদক দ্রব্য, টাটাস্কাই নামক ডিসএন্টিনা চোরাই পথে দেশে আসে। প্রতিটি গরু থেকে সোর্সরা বিজিবির নাম ব্যবহার করে ৫শ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করে থাকে। একইভাবে নাসিরবিড়ি থেকে রাত প্রতি সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা এবং মাদক, কাপড় ও টাটাস্কাই ডিস এন্টিনা থেকে নির্দিস্ট পরিমান টাকা আদায় করেন সোর্সরা।

বিজিবির সোর্স হিসেবে যারা কাজ করেন এলাকাবাসী তাদের নাম অকপটে স্বীকার করেন। সীমান্ত এলাকায় যারা বিজিবির সোর্স হিসেবে যাদের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত তারা হলো মুরইছড়া সীমান্তের টাট্রিউলি গ্রামের বাসিন্দা কানা ইছরাব, ল্যাংড়া জবেদ, পূর্বটাট্রিউলির জহুর আলী, দশটেকি গ্রামের বাসিন্দা তৈয়ব আলী, টাট্রিউলির নুরই ও হারিছ ও গনকিয়া এলাকার জসিমের নাম উল্লেখযোগ্য।

উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া সীমান্ত এলাকার ফটিগুলি গ্রামের বাসিন্দা মো. গনি মিয়া গত ৩১ জুলাই মিথ্যা মামলায় হয়রানি বন্ধের দাবিতে এবং সোর্সদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসক মৌলভীবাজার, বিজিবির সেক্টর কামান্ডারসহ বিভিন্ন দফতরে লিখিত আবেদন করেছেন।

তার লিখিত আবেদন থেকে জানা যায়, সোর্সদের মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে মাদক পাচারের অভিযোগ এনে বেশ কয়েকটি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। এতে কুলাউড়া পৌর এলাকার মো. সুমন মিয়াসহ ৪ জনকে আসামী করা হয়। গনি মিয়ার ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি ভারতীয় বলে আটক করে নিয়ে যায় বিজিবি।

সুমন মিয়া জানান, তিনি পৌর এলাকার বাসিন্দা। ঘটনাস্থল তার বাড়ি থেকে ২০ কিলোমিটার দুরে। পরিকল্পিতভাবে আমাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।

একইভাবে পৌর এলাকার চাঁতলগাঁও গ্রামের বাসিন্দা কামালকে রাঙিছড়া বাজার থেকে ধরে নিয়ে মাদক মামলায় থানায় সোপর্দ করা হয়। টাট্রিউলি গ্রামের বাসিন্দা ও মৌলভীবাজার আদালতের আইনজীবির সহকারি আব্দুস সালামকে বছর দেড়েক আগে মুরইছড়া বাজার থেকে ধরে নিয়ে মাদক পাচারের মামলায় আটক করে বিজিবি। সেই মামলায় তিনি বিনা অপরাধে দেড় মাস জেল খেটে জামিনে মুক্তি লাভ করেন। ওই মামলায় টাট্রিউলি গ্রামের নুর মিয়া ও আসুক মিয়াকে আসামী করা হয়। ক্ষতিগ্রস্থ আব্দুস সালাম এ ব্যাপারে বিজিবির হেডকোয়ার্টার পিলখানায় অভিযোগ দেন। সেই অভিযোগ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এতে বিজিবি ও তাদের সোর্সদের দৌরাত্ম্য কিছুটা কমলেও বর্তমানে ফের তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। ফলে তাদের কাছে নিরীহ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছে।

গ্রামবাসী জানান, দিনের বেলায় মাঠে চরানো গরু এবং রাতে বাড়িতে গোয়াল ঘরে রাখা পালিত গরু ভারতীয় বলে বিজিবির উপস্থিতিতে সোর্সরা গরু নিয়ে যায়। এক রাতে সাজ্জাদ মিয়ার ঘর থেকে ৬াট গরু নিয়ে যায় বিজিবি। যার আনুমানিক মুল্য দেড় লক্ষাধিক টাকা। তিনি বিষয়টি স্থানীয় চেয়ারম্যান মেম্বারকে জানিয়ে কোন সুফল পাননি।

এব্যাপারে অভিযুক্ত ইছরাব, হারিছ, জাবেদ জহুর আলী জানান, অভিযোগগুলো সঠিক নয়। ইছরাব আলী জানান, গত ১৮-২০ বছর থেকে তিনি বিজিবির সোর্স হিসেবে কাজ করছেন। ভারত থেকে দেদারছে গরু আসছে। যারা এসব অপকর্ম করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। আমি টাকা নেই না। তবে এসব ঘটনার সাথে কারা জড়িত তাদের নাম বলতে রাজি হননি। তবে মুরইছড়া নতুন বস্তির মৌর মিয়া, আলী নগর সীমান্তের আছকির ও সুন্দর এরা সোর্স হিসেবে কাজ করছে।

এব্যাপারে সীমান্তবর্তী কর্মধা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এমএ রহমান আতিক জানান, স্থানীয় নিরীহ মানুষ বিজিবি ও তাদের সোর্সের হয়রানির শিকার হচ্ছে এটা সত্য। এব্যাপারে দফায় দফায় ক্যাম্পের দায়িত্বরতদের সাথে বৈঠক করেছি। এমনকি কমান্ডিং অফিসারের সাথেও কথা হয়েছে। বেল্ট এরিয়া বলে বিজিবি জোর করে মানুষের বাড়িতে প্রবেশ করে হয়রানি করে থাকে। মিথ্যা মামলা বলতে, সোর্সদের সাথে কারো ব্যক্তিগত বিরোধ হলে, তারা বিজিবিকে ব্যবহার করে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে দেয়।

মুরইছড়া ক্যাম্পের নায়েক সুবেদার মো. আকরামুজ্জামান এব্যাপারে তাঁর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ শ্রীমঙ্গলের সাথে কথা বলার অনুরোধ জানান।

এব্যাপারে বিজিবি ৪৬ ব্যাটেলিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল আরিফুল হক জানান, আমি এখনও কোন লিখিত অভিযোগ পাই নি। এই সীমান্ত দিয়ে প্রচুর ভারতীয় গরু আসে। গরু আসলে রাখল কাটা তারের বেড়া অতিক্রম করা চেস্টা করবে। এতে সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ গুলি করবে। মানুষ মরতে পারে। চেয়ারম্যান আমার সাথে কথা বলেছিলেন, তখন আমি বলেছি, যারা এসবের সাথে জড়িত তাদের বন্ধ করেন। কিন্তু রাতের বেলায় সীমান্ত এলাকায় যেসব গরু পাওয়া যায় কেবল সেগুলো আটক করা হয়। আমরা কারো বাড়ি গিয়ে গরু ধরছি না। সম্প্রতি যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে তাদের খোঁজ নিয়ে দেখেন, তারা কেমন মানুষ? কাউকে হয়রানি করার প্রশ্নই উঠে না।#

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *