- নির্বাচিত, ব্রেকিং নিউজ, স্লাইডার

“আমার নাম পচ্চিম..”

ডা. সাঈদ এনাম, ১০ আগস্ট ::

লোকটা’ তো ভারি ত্যদড়। পরপর দুইবার বললাম একটু জোরেসোরে ঘষা দাও। তাকালই না। আরে বাবা কথা পছন্দ না হলে মুখের দিকে তাকিয়ে সরি, হ্যাঁ বা না কিছু একটাতো বলতে হয়। এটা নিতান্তই ভদ্রতা। পাত্তাই দিলো না, সে তার আপন মনে বাঁহাতে একটি জুতো ধরে ডান হাত দিয়ে আস্তে আস্তে ব্রাস করছে, তার আগে ট্রাক ড্রাইভার’রা পান খেতে গিয়ে হাতে যেভাবে চুন নেয়, সেভাবেই একবার আঙ্গুলে সাদা রঙের কি যেনো একটা নিয়ে মেখে নিলো জুতো’টাতে।

শেষমেশ একটু ধমকের সুরেই বললাম, “এই মিয়া শুনোন, বললাম যে একটু জোরে জোরে ঘষতে”।

এবার কপাল কুঁচকে সে তাকালো আমার দিকে, “আমারে কিতু কইতেন?”।

“তো আরে কারে বলি, আর কেউ নাইতো পাশে”, আমি দাত খিটমিট করে বললাম।

লোকটা কানে হাত দিয়ে হেসে হেসে বললো, ‘তার আমি কানে কম তুনিতো, আরেকতু দোরে দোরে কন….’।

চুপসে যাওয়া বেলুনের মতো আমর রাগ গেলো দমে। আরে লোকটাতো কানেই শুনেনা। অথচকিনা একটু আগে মনে হচ্ছিলো, আস্তো একটা বেয়াদব।

জুতোটা পায়ে সামনে ধরে বললো, ‘দেখতেন তার, ক্যামুন তুন্দর অইসে। তার আপনি আর আইয়েন না, আমি রুম থাইকা আপনার দুতা আনমু, পালিত কইরা দিমু, তিক আতে?”।

কথায় খুব মায়া হলো তার প্রতি।

লোকটার নাম অসীম। পেশায় মুচি। অসীমের সাথে সেদিনই আমার প্রথম পরিচয়। আমি যেখানে চেম্বার করি তার নোচেই অসীম বসে। ডাক্তারদের জুতোয় কালি করে। আর যদি কোন পেশেন্ট বা তার সাথে আসা কারো জুতো, ব্যাগ টুকটাক ছিড়ে সেটাও সে করে।

সেদিনের পর থেকে চেম্বারে বসা মাত্রই অসীম এসে জুতো নিয়ে যায়, আবার পালিশ করে ফেরত দেয়। পয়সা দুইটা বাড়িয়েই দেই। বাড়তি নোট গুলোতে সে আলাদা চুমু খায়।

অসীম ছেলে বেলা থেকেই এ পেশায়। এটা তার বাপ দাদার পেশা। একদিন চেম্বারে মিনিট পাঁচেক গল্প করলাম তার সাথে। সে খুব খুশি তাকে ডেকে নিয়ে তার সাথে কথা বলায় আর সব খবরাখবর নেওয়ায়।

প্রথম দিন নাম জিগ্যেস করতেই বিপত্তিতে পড়লাম। জিগ্যেস করলাম, নাম কি তোমার?

সে বললো, “পচ্চিম”
কি? পশ্চিম আবার কারো নাম হয় নাকি?

আমার কথা শুনে সে জোরে জোরে বললো, ‘অচ্চিম নাতো অচ্চিম’

পড়লাম বিপদে। এসিস্ট্যান্ট এসে উদ্ধার করলো। “স্যার ওর নাম অসীম। আলগা জিহবা ছোট তাই অসীম বলতে পারে না। বলে অচ্চিম। হি হি.. “।
কোন কিছু না শুনে, না বুঝে অসীম ও হাসে, “হি হি…”। আহা কি সুন্দর তার হাসি।

আমাদের দেশের চামড়ার জুতো গেলো তেমন একটা ভালো না। এক বর্ষা পেলেই জুতো স্যঁতস্যঁতে হয়ে শেষ। এবার ভাবছিলাম শীতে অপেক্ষা না করেই আরেক জোড়া কিনে নেবো। ডাক্তারদের ব্যবহৃত সব চকচকে নাকি থাকতে হয়। কিন্ত এক বছর হয়নি। বর্ষা কেবলই শুরু। এখনই স্যঁতস্যতে ভাব চলে এসেছে জুতোয়।

অসীম কে বললাম, অসীম জুতোটা পাল্টাতে হবে, বৃষ্টির পানি সোলের ভিতর ঢুকে মনে হয়।

অসীম লাফ দিয়ে উঠে। “না না তার। নতুন কিনা লাগতো না। আমি নতুন তোল (সোল) লাগাওয়া দিমু। এক বতর দাইবো। পানি দুকতো না”।

বললাম, ওকে তাই দাও।

অসীম জুতো ঠিক করে দেয়। সত্যিই চমৎকার গ্লেজ করেছে। একেবারে নতুনের মতো লাগছে।

“তা কতো দিতে হবে অসীম”?

“তার, বেতিনা, তিন’তো..”

বলো কি?

“তার, দুই’তো তাকা খরত। একতো তাকা ঈদের বকতিত, হি হি হি…”

অসীমের সাথে দরাদরি করিনা। ওকে আমার কেমন জানি খুব ভালো লাগে। তাছাড়া দরদাম বেশি করে মেয়েরা। মেয়েরা মুচি’দের সাথে খুব দরাদরি করে। সারা ছেঁড়া জুতা পলিশ সহ সেলাই করতে পঞ্চাশ টাকা চাইলে তার দশ টাকা দিয়ে শুরু করবে। গাওছিয়া মার্কেটে এক জোড়া দুল কিনতে দশটা দোকান যাবে, দশবার চক্কর হবে, দশটা দাম হবে। চক্করে চক্করে স্যান্ডেলের সোল ছিড়বে। ছেঁড়া সোল নিয়ে পা টেনে টেনে তাও চক্কর চলবে। মাঝখানে হয়তো পাঁচ টাকার ঝালমুরি খেয়ে নেবে একটু। একেই বলে ধৈর্য। তারা পারেও বাবা।

মানিব্যাগ থেকে তিনটা কড়কড়ে একশো টাকার নোট বের করে অসীম কে দিলাম। ঈদের জন্যে ও বকশিস চাইছে। যদিও সে ঈদ করবেনা। তবুও আনন্দ ভাগ করতে দোষ কি? একশো টাকা তাকে বকশিস দেয়াই যায়। তাছাড়া যেভাবে সে জুতো জুড়ো মেরামত করেছে, পাক্কা নতুনের মতো চিকচিক করছে। টেনেটুনে দুই মৌসুম দিব্যি চালানো যাবে।

অসীম কড়কড়ে নোট গুলো হাতে নিয়ে চুমু খায়। আর হাসে। খুব মায়াময় তার হাসি।#

লেখক : সাইকিয়াট্রিস্ট
মেম্বার, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন
মেম্বার, আমেরিকান একাডেমি অব নিউরোলজি।

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *