- আলোচিত সংবাদ, ব্রেকিং নিউজ, লাইফ স্টাইল

পাঙাল নারীদের বৈচিত্র্যময় পোষাক নিয়ে কিছু কথা!

রফিকুল ইসলাম জসিম, ৩১ আগস্ট ::

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও যুদ্ধজনিত কারণে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মণিপুর রাজ্যের অধিবাসীরা বিভিন্ন সময় দেশত্যাগ করে। তখন অনেকে পাকিস্তান-ভারত উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আশ্রয় নেয়। তাদের মধ্যে বার্মা (মিয়ানমার)-মণিপুর যুদ্ধের সময় (১৮১৯-১৮২৫) তৎকালীন মণিপুরের রাজা চৌরজিৎ সিংহ, তার দুই ভাই মারজিৎ সিংহ ও গম্ভীর সিংহসহ আশ্রয় গ্রহণ করেন বৃহত্তম সিলেট অঞ্চলে। বর্তমানে সিলেট, মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলায় মণিপুরী জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। এখন দেশে যে কয়টি আদিবাসী জনগোষ্ঠী রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম মণিপুরী সম্প্রদায়।

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এসব পোশাক বাঙালিদের কাছে পরিচিতি পেয়েছে উপজাতি পোশাক হিসেবে। তাদের স্বকীয় আর ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও গহনায় ভিন্নতা থাকায় তা ফ্যাশন হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে সমতলের মানুষের কাছে। চাকমা, মারমা, মগ, মুরং, সাঁওতাল মনিপুরিসহ আরও প্রায় ৪০টির মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রয়েছে বাংলাদেশে। তাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে নিজস্ব ধরন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে অবশ্য মিলও খুঁজে পাওয়া যায়। এই সব পোশাক নিয়ে আমাদের ফ্যাশন ডিজাইনাররা প্রতিনিয়ত নিরলস চেষ্টায় ফুটিয়ে তুলছেন পুঙ্খানুপুঙ্খ ডিজাইন। মনিপুরী তাঁতবস্ত্র আমাদের দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে একটি প্রধান আকর্ষণ।

ভাষাগত এবং ধর্মীয় কারণে বাংলাদেশে মণিপুরীরা তিনটি শাখায় বিভক্ত। বিষ্ণুপ্রিয়া, মৈতৈ ও পাঙন। এর মধ্যে বিষ্ণুপ্রিয়ার সংখ্যাই বেশি। বিষ্ণুপ্রিয়া ও মৈতৈ হিন্দুধর্মে এবং পাঙনরা মুসলিম ধর্মে বিশ্বাসী। সব মিলিয়ে জনসংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। শাখা তিনটি হলেও সব মণিপুরীর প্রায় একই সংস্কৃতি। তাদের ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এদেশে যোগ করেছে ভিন্ন মাত্রা।

নিজস্ব কোমর তাঁতে তৈরি ফানেক তোলা ছবি – শারমিন!

মণিপুরীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা ‘পাঙাল বা মণিপুরী মুসলিম নামেই পরিচিত। সিলেটে মৌলভীবাজার জেলা কমলগঞ্জ উপজেলায় ৩০টি পাঙাল অধ্যুষিত গ্রামে বসবাস করে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও পাঙালরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ঐতিহ্য আজও বজায় রেখেছে। তাদের ঘরবাড়ি, পোষাক-পরিচ্ছদ ও খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্রে ভরপুর।

মনিপুরী পাঙাল সম্প্রাদায়ের পোষাক পরিচ্ছদে স্বতন্ত্রতা রয়েছে। পুরুষরা বাঙালিদের মতো পোষাক ব্যবহার করে এবং মহিলারা ঘরোয়া বা সামাজিক পরিবেশে নিজেদের বোনা কাপড় -চোপড় পরিধান করে। নিজস্ব কোমর তাঁতে তৈরি ফানেক ( কোমর পর্যন্ত প্যাচানো কাপড়) পরে থাকে। যেমন – লাই, সালু, হাংগামপাল, সোনারং, চুমহাপ্পা, মকং ( বিভিন্ন ধরনের রং ও কাজ করা) ইত্যাদি।

বিবাহিত মেয়েরা লৈফানেক আরলবা, লৈফানেক মায়াইরনবি, সালু ফানেক আরনবা, লৈচিল ফানেক, উরেং আরনবা, উরেং চুমহাপ্পা, লৈচিল উরেং ( বুক পর্যন্ত প্যাচানো বিভিন্ন রং ও ডিজাইনের কাপড়) ইত্যাদি পরিধান করে থাকে।

পাঙাল মহিলারা সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিজেদের ঐতিহ্যগত স্বর্ণের হার পরিধান করে। তবে বিশেষ ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্টানে (বিয়ে) যুবকরা- পাঞ্জাবি, যুবতীরা লৈফানেক নামের কারুকার্যময় দামি এক ধরনের পোষাক পরিধান করে।ইসলাম ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও  মনিপুরি মুসলিমরা তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ঐতিহ্য আজও বজায় রেখেছে।তাদেরঘরবাড়ি,পোষাক-পরিচ্ছদ খাদ্যাভ্যাস ও জীবনধারা স্বতন্ত্র এবং বৈচিত্রে ভরপুর।

মনিপুরি মুসলিমরা সুন্নী মুসলমান। ধর্মীয় বিশ্বাস এক হলেও স্থানীয় বাঙালী মুসলিম জনগোষ্ঠির সঙ্গে সামাজিক কোন সম্পর্ক নেই বললেই চলে। তাদের ধর্মাচরন, সমাজব্যবস্থা ও রীতিনীতির সঙ্গে বাঙালী মুসলমানদের যথেষ্ঠ পার্থক্য। প্রচন্ড ধর্মভীরু ও রক্ষনশীল তারা। পাঙন মেয়েরা কঠোর পর্দপ্রথা মেনে চলে।

 মনিপুরি মুসলিম নারীরা যেসব উপায়ে ‘পর্দা’ করেঃ

বোরকা

মনিপুরি মুসলিম নারীরা সারা চেহারা এবং সারা শরীর পুরোপুরি ঢেকে ফেলে বোরকা পরিধান করেন৷ ক্ষেত্রবিশেষে বোরকার চোখের অংশে জাল দেয়া থাকে, যাতে তারা দেখতে পারেন৷ কালো ছাড়াও বিভিন্ন রংঙের বোরকা হয়৷

ওড়না বা খুদায়

এই মুসলিম নারীদের মধ্যে জনপ্রিয়  ওড়না বা খুদায়।  নিকাব বা বোরকার মতো না হলেও এই পোশাকেও নারীর শরীর অনেকটা ঢাকা থাকে৷ তবে চুলের কিছুটা, চেহারা এবং গলা দেখা যায়৷ তাদের ভাষায় খুদায় বলে সচরাচর মনিপুরি মুসলিম  মেয়েরাও পরেন৷

চাদর বা নাবঙ

শীতকালে  মেয়েদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় চাদর৷ বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় সাধারণত সে দেশের নারীরা চাদর পরে নেন৷ মনিপুরি মুসলিম ভাযায় নাবঙ।

বাংলাদেশে নীরবে একটি বোরকা বিপ্লব ঘটে গেছে। নারীর পোশাকে এতবড় নীরব পরিবর্তন, অভূতপূর্ব। এটা গত কয়েক বছরে বাংলাদেশের অভিজাত বিদ্যাপীঠ থেকে শুরু করে অজপাড়াগাঁয়ের সর্বত্র চোখে পড়ছে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের মাঝে হিজাব পরিধান করার প্রবণতা দিন দিন ক্রমবৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশ ও সংস্কৃতি মিল রেখে  এই ব্যবহার প্রচলন শুরু হয়েছে মুসলিম মনিপুরিরা।

হিজাব /নিকাব

দেশ এবং সংস্কৃতিভেদে অনেক মুসলমান নারী হিজাব পরিধান করেন৷ মূলত মাথা, চুল এবং গলা এবং ঘাড়ের খোলা অংশ ঢাকা হয় এই পোশাক দিয়ে৷ বিভিন্ন ডিজাইনের এবং রঙের হিজাব পাওয়া যায় যেগুলো পরলে চেহারা পুরোটাই দেখা যায়৷ নতুন প্রজন্মের মনিপুরি মুসলিমরা ।  নিকাব পরলে নারীর পুরো শরীর ঢেকে যায়, শুধু চোখ দু’টো খোলা থাকে৷ সাধারণত পুরোপুরি রক্ষণশীল মুসলমান নারীরা নিকাব পরেন৷ নিকাব মূলত কালো রঙের হলেও অন্যান্য রঙের নিকাবও ইদানীং দেখা যায়৷

হিজাব

মনিপুরি মুসলিম মেয়েরা কৃষিকাজে পুরুষের সমান পারদর্শী। এছাড়া কোমর তাঁতে কাপড় বোনা এবং সুচিকর্মে পাঙন মেয়েদের দক্ষতা রয়েছে। মণিপুরীদের পরিধেয় ফানেক বা চাকসাবির উপর পাঙন মেয়েদের সুঁই সুতার সুক্ষ কারুকাজ দেখলে বিস্মিত হতে হয়।মনিপুরি মুসলিম  নারীদের নিপুণ হাতে গড়া পুরুষ ও মহিলাদের জন্য রকমারী পোষাকগুলো যে কারো দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিঃসন্দেহ। কাপড়ের আঁচলে গাঁথা আর পরতে পরতে আঁকা রঙ-বেরঙের নকশাগুলো যেন সহসাই মনে করিয়ে দেয় মনিপুরী সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের কথা। মনিপুরী পরিবারগুলোর মধ্যে এসময় দিনরাত বিরামহীন প্রতিযোগীতায় চলে তাঁতের কাপড় বুননের কাজ। ঐতিহ্যের ধারায় মনের স্বপ্ন ফুটিয়ে তুলতে যেমন ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন মনিপুরী নারীরা তেমনি ব্যস্ত হয়ে উঠেছে তাঁতগুলোও। তাঁতের প্রতিটি সুতার ফাঁকে যেন লোকিয়ে আছে মনিপুরী জীবনের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য।

মনিপুরি মুসলিম বিডি – সম্পাদক।

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *