- আলোচিত সংবাদ, কুলাউড়া, জাতীয়, ব্রেকিং নিউজ, স্লাইডার

কুলাউড়া সদর ইউপি- ভবনের স্থান নিয়ে মামলায় কেটে গেছে ১৮ বছর !

এইবেলা, কুলাউড়া, ০৪ অক্টোবর :: 

কুলাউড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের ২৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ভবনের উদ্বোধনের আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নির্মাণকাজের ৯০ শতাংশ শেষ হওয়ার পর পরিত্যক্ত অবস্থায় এভাবেই পড়ে আছে গত ১৮ বছর থেকে। ভবনটির কার্যক্রম চালু না হওয়াতে অস্থায়ীভাবে ইউনিয়নের দাপ্তরিক কার্যক্রম চলছে শহরে অবস্থিত জেলা পরিষদের জায়গায় একটি জরাজীর্ণ পুরাতন ভবনে। শহরের এই অফিস থেকে ওই ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার। যার ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শহরে গিয়ে নাগরিক সেবা পেতে নানা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয়রা।

২০০০ সালের ১৫ জুন প্রায় ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে সদর ইউনিয়নের স্থানীয় জনতাবাজারে একটি দ্বিতল ইউনিয়ন কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ। তৎকালীন সময়ের অত্যাধুনিক এই ভবনে হলরুমসহ চেয়ারম্যানের কক্ষ, সচিবের কক্ষ, ইউপি সদস্যদের (মেম্বার) কক্ষ, কৃষি, আনসার-ভিডিপি ও গ্রাম পুলিশদের কক্ষ রয়েছে।

চেয়ারম্যান-মেম্বাররা যান না। ফলে ভবনে ইউনিয়ন পরিষদের কোন কার্যক্রম চলে না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে স্থানীয়রা। এখানে একটি ভুমিহীন হিন্দু পরিবার বসবাস করছে। তারা কয়েক বছর থেকে এই ইউনিয়ন ভবনে পরিবার নিয়ে বসবাস করছে। এছাড়া এই আলিশান ভবনটিতে ফার্ণিচার তৈরির কাজের জন্য সুযোগ লাগাচ্ছেন স্থানীয় কাঠমিস্ত্রীরা।

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায় যে, পরিত্যক্ত ভবনটির সম্মুখ অংশে পিলারের সাথে গরু, ছাগল বাধা অবস্থায় রয়েছে। ভবনের নিচতলায় চলছে ফার্ণিচার সামগ্রী তৈরির কাজ। বেশির ভাগ কক্ষের দরজা-জানালা নেই। বাকি দরজা- জানালাগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। কক্ষগুলো ময়লা-আবর্জনায় সয়লাব। তাছাড়া প্রায় কক্ষে রয়েছে গরুর খড়, জ্বালানি কাঠ, পারিবারিক কাজে ব্যবহৃত নানান আসবাবপত্র। কক্ষের মেঝেতে বিভিন্ন প্রাণীর মলমূত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। শেওলা ধরে ছাদ ও দেয়ালের বিভিন্ন অংশ নষ্ট হয়ে গেছে।

কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের জনগন তাদের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সাথে তাদের সুখ, দুঃখ, সমস্যা, সম্ভাবনা ও অভিযোগগুলি তুলে ধরা অনেক কষ্টসাধ্য। মফস্বলের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে কৃষক শ্রমিক কিংবা একজন অতি সাধারণ হতদরিদ্র নাগরিক বর্তমানে যেখানে অস্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে সেখানে পর্যন্ত আসা আর্থিক, মানসিক কিংবা শারিরীক সামর্থ্য কোনোটাতে ওদের শতভাগ সামর্থ্য নেই। তার পরও বাধ্য হয়ে তাদের যেতে হয়। এমনটি জানালেন কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামের নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত শতাধিক মানুষ। শহরে গিয়ে চেয়ারম্যানের সাথে দেখা করতে আমাদের ১০০-১৫০ টাকা খরচ হয়।

স্থানীয় লোকজন জানান, ১৯৯৬ সালে কুলাউড়া পৌরসভা গঠনের পর কুলাউড়া ইউনিয়ন আলাদা হয়ে যাওয়ায় সদর ইউনিয়নের শংকরপুরে ইউনিয়ন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। ইউনিয়ন ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্তকে সে সময় প্রতাবী, গুতগুতি, লক্ষীপুর, শংকরপুর, মীরের গ্রাম, বালিশ্রী, মিনার মহল, নাজিরের চক গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের সমর্থন থাকলেও গাজীপুর, শ্রীপুর, বনগাঁও, করের গ্রাম, হাসনপুর, বড়কাপন, বাগাজুড়া, হরিপুর, দাসের মহল গ্রামের বাসিন্দাদের সমর্থন না থাকার কারণে এই স্থানে ইউনিয়ন ভবন নির্মানের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তীতে ২০০০ সালের ২৩ এপ্রিল তৎকালীন ইউএনও মো. নিয়াজুল হকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ইউনিয়ন ভবনের জায়গা নির্ধারণের জন্য কুলাউড়া বিটিআরআই’এ ৫২ শতক জায়গা পরিদর্শন করেন। এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ওই স্থানে ইউনিয়ন ভবন নির্মাণের জন্য। সে মোতাবেক একই বছরের ২৬ এপ্রিল দলিলপত্রও প্রস্তুুতও করে দরপত্র আহবান করা হয়। কিন্তুু এখানে ইউনিয়ন ভবন নির্মাণ হলে কুলাউড়া ইউনিয়নের আরেকটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পক্ষে এখানে এসে প্রতিনিয়ত সেবাগ্রহণ করা সম্ভব নয় বিধায় সেখানে শেষতক ইউনিয়ন ভবন নির্মিত হয়নি।

এমতাবস্থায় এই ইউনিয়নের সর্বস্তরের বাসিন্দারা তাদের এই সমস্যার কথা তৎকালীন ও বর্তমান এমপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুরের কাছে তুলে ধরলে তিনি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শাহজাহানকে নির্দেশ দেন তিন দিনের মধ্যে ইউনিয়ন ভবনের জন্য স্থান নির্ধারণ করে দেয়ার জন্য। সুলতান মনসুরের নির্দেশের ৩ দিনের মাথায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইউনিয়নের মধ্যবর্তীস্থান জনতা বাজারে অবস্থিত ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মানের উদ্যোগ নেন। ভবন নির্মানের জন্য সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হবার পর দেখা দেয় আরেক জটিলতা। জনতা বাজারে ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের নির্মাণ স্থগিত করে বিটিআরআই’এ প্রস্তাবিত স্থানে ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মান করার জন্য শাহ সুন্দর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. সোহাগ মিয়া ও সাবেক শিক্ষক মো. আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে ২৪ জন বাদী হয়ে কুলাউড়া ইউনিয়ন পরিষদের বিরুদ্ধে মৌলভীবাজার জজ আদালতে মামলা (নং- সত্ত্ব ৭৭/২০০০) দায়ের করেন। আইনি মোকাবেলায় মামলার রায় চলে আসে কুলাউড়া ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে। এরপর বাদীপক্ষ উচ্চ আদালতে রিট করেন। এর পর ফের উচ্চ আদালতে আপীল করলে ফের মামলার রায় চলে আসে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে। এসব আইনী প্রক্রিয়ার বেড়াজালে ইউনিয়নের প্রশাসনিক ভবনের কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে। এদিকে ভবন নির্মাণের পর গত ১৮ বছর থেকে দু’জন চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করেছেন। ভবন নির্মাণের সময় দায়িত্বে ছিলেন সাবেক চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান। পরে তিনি আরও দু’বার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বর্তমানে সাবেক চেয়ারম্যানের স্ত্রী নার্গিস আক্তার বুবলী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এ দুজনের কেউই ওই ভবনে এক দিনের জন্যও অফিস করেননি। তাঁরা দুজনই কুলাউড়া পৌর শহরে অবস্থিত জেলা পরিষদের জায়গায় একটি পুরনো ভবনে অস্থায়ীভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

উপজেলা প্রকৌশলী মুহাম্মদ ইসতিয়াক হাসান জানান, মামলার রায়ের কপি পেলে নতুন করে টেন্ডার আহবান করা হবে। এই ইউনিয়ন ভবন নতুন করে মেরামত ও অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে ৪০-৪৫ লক্ষ টাকার প্রয়োজন।

ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান নার্গিস আক্তার বুবলী জানান, আমি নতুন করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। আমার স্বামী দীর্ঘদিন থেকে ইউনিয়ন নিয়ে প্রতিপক্ষের সাথে আইনী মোকাবেলা করেছিলেন। অবশেষে আইনী লড়াইয়ে উচ্চ আদালত থেকে মামলার রায় ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষে আসে। এলজিইডির মাধ্যমে টেন্ডার আহবান করে ইউনিয়নের অবশিষ্ট কাজ শেষ করে নতুন করে কার্যক্রম শুরু হবে।

জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান জানান, পৌর শহরের ভেতরে কোন অবস্থাতেই ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চলতে পারেনা। জেলা পরিষদের জায়গায় দীর্ঘদিন থেকে সদর ইউনিয়ন পরিষদের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। এটা ঠিক না। জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন স্থানান্তরের জন্য সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানের কাছে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। জেলা পরিষদের জায়গায় একটি আধুনিক মার্কেট নির্মাণের কাজ প্রক্রিয়াধীন। মার্কেট কাজ শুরু হলে ইউনিয়ন সেখান থেকে স্থানান্তর করতে হবে।

মৌলভীবাজার-২ আসনের সংসদ সদস্য সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ জানান, ১৮ বছরে যখন ইউনিয়ন ভবনের কার্যক্রম চালু হয়নি, তখন ১৮ মাস অপেক্ষা করতে হবে। এটাই আমার বক্তব্য। #

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *