- নির্বাচিত, ব্রেকিং নিউজ, স্লাইডার

ছাত্র রাজনীতি : নিষিদ্ধ একমাত্র সমাধান নয়

মো: এবাদুর রহমান শামীম, ১১ অক্টোবর ::

ছাত্র রাজনীতির স্বর্ণ যুগ এখন আর নেই। ছাত্র রাজনীতি এখন এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। সরকারি ও বেসরকারি কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি। ক্যাম্পাসে কথিত দলদাস ও নেতাদাস ভিত্তিক রাজনীতির বদৌলতে উচ্চ শিক্ষা আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা, অচলাবস্থা ও বিশৃঙ্খলা তথা নৈরাজ্য সৃষ্টির জন্য শুধু ছাত্র রাজনীতিকে দায়ী করা যাবে না।

শিক্ষক রাজনীতি, ভিসি তথা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব জ্ঞানহীন আচরণ, ক্ষমতাসীনদের মদদ ও প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতির নামে বাড়াবাড়ি সহ আরও অনেক কারণ রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদ পুষ্ট নেতাকর্মী, শিক্ষক ও দু’-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলা যেতে পারে। শিক্ষাঙ্গনে সব ধরণের অপতৎপরতা রোধে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়া শুরুর আগে কিছু বিষয় মাথায় রাখা দরকার।

বিশেষ করে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত বাঙালির সকল আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্র রাজনীতি সবচেয়ে কৃতিত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

৭১’র পরে ৯০’র স্বৈরাচারী ও ১/১১’র অগণতান্ত্রিক সরকার পতনে ছাত্র রাজনীতি নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। এখনও জনকল্যাণমূলক যেকোনো যৌক্তিক দাবি/অধিকার আদায়, অন্যায়ের প্রতিবাদ ও অশুভ শক্তির উত্থান রোধে ছাত্ররা সবচেয়ে বড় ভরসার নাম। তাছাড়া আমাদের ছাত্র রাজনীতির একটা গৌরবজ্জ্বল সমৃদ্ধ অতীত ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে; যা আজ অবধি আমাদের প্রেরণার উৎস।

একতরফা ভাবে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি মানে পক্ষান্তরে জাতিসত্তার এ গৌরবগাঁথা ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে অস্বীকার করার নামান্তর। নিকট অতীতে ঢাবিতে কোটা আন্দোলনকারীর ওপর ছাত্রলীগের হামলা এবং সম্প্রতি ছাত্রলীগ কর্তৃক বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর এদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তথা শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতির যৌক্তিকতা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন। এর মধ্যে বড় একটি অংশ লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার পক্ষে মতামত দিয়েছেন।

এটা সত্য যে, ছাত্র রাজনীতি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পরিবেশ বিনষ্ট করছে; ফলে জাতির ভবিষ্যৎ কর্ণধার অদম্য মেধাবি শিক্ষার্থীরা বিপথগামী হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতি ছাত্রদের গুম-খুন, মাদক, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির মতো ঘৃণ্য কর্মের দিকে ধাবিত করছে। ছাত্র রাজনীতির নৈতিক এ অবক্ষয় নতুন নয়, এ অবক্ষয় শুরু হয়েছে ৯০’র পর থেকে।

এটা বলা বাহুল্য যে, আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ বা নিষিদ্ধ করা সম্ভবপর নয় এবং বন্ধ করা সরকারের জন্য সমীচীন হবে না। বাংলাদেশে ছাত্র রাজনীতির অপরিহার্যতা এখনো ফুরিয়ে যায়নি। তবে ইন্টারমিডিয়েট লেভেল পর্যন্ত ছাত্র রাজনীতি একেবারে নিষিদ্ধ করা উচিত। পাশাপাশি শিক্ষকদের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি সম্পূর্ণ বন্ধ করা উচিত। একথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলতে চাই, শিক্ষাঙ্গনে সব দল-মত-পথের পারস্পরিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব না যায়; তাহলে ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি নিয়ে সরকারকে একটা কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার উপযুক্ত সময় এখনই।

সর্বোপরি, শিক্ষাঙ্গনে বা ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ উল্লিখিত সমস্যার একমাত্র সমাধান নয়। বরং দল/নেতার অন্ধ অনুকরণ ও দাসত্বমূলক রাজনীতির পরিবর্তে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সমন্বয়ে মেধা ও জ্ঞান নির্ভর বুদ্ধিভিত্তিক রাজনীতি করার সুযোগ করে দিতে হবে। যাতে করে, ছাত্র/শিক্ষার্থীরা একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সৎ, যোগ্য, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

  লেখক- আয়কর আইনজীবী সিলেট ও মৌলভীবাজার জেলা কর আইনজীবী সমিতি।

About eibeleamialabula

Read All Posts By eibeleamialabula

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *