মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। এ উদ্যোগে বিশেষ সাফল্য দেখিয়েছে জুড়ী উপজেলার সাগরনাল ইউনিয়ন। বায়োগ্যাস উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের আগ্রহ ও সাফল্যের কারণে ইউনিয়নটিকে ‘বায়োগ্যাস পল্লী’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
গবাদিপশুর গোবর থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস দিয়ে নিজেদের রান্নার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত গ্যাস বিক্রি করে আয় করছেন তাঁরা। একই সঙ্গে প্লান্ট থেকে উৎপাদিত জৈব সার কৃষিকাজে ব্যবহার ও বাজারজাত করে বাড়তি অর্থ উপার্জন করছেন। এতে একদিকে যেমন জ্বালানি ব্যয় কমছে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ও জৈব সার উৎপাদনের মাধ্যমে সৃষ্টি হচ্ছে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ। ইতোমধ্যে সেখানে ১৩টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লান্ট থেকে প্রায় ৮০টি পরিবার বায়োগ্যাস ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাগরনাল ইউনিয়নের টিলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা জমির উদ্দিন ২০২৫ সালের জুন মাসে প্রথম বায়োগ্যাস উৎপাদন শুরু করেন। তাঁর এই উদ্যোগ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে একই ইউনিয়নের বরইতলী গ্রামের খসরু মিয়া ও আপ্তাব আলী, কলাবাড়ি বাজারের বদরুল ইসলাম ও আব্দুল কাদির এবং সাগরনাল গ্রামের জামালুর রশিদ, সজল শর্মা, আব্দুল করিম, লুৎফুর রহমান, মুস্তাকিম হোসেন, আব্দুল মুহিত ও সাহেদ আহমদ এবং দক্ষিণ সাগরনাল গ্রামের ফখর উদ্দিনসহ আরও অনেকে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেছেন। তাঁরা নিজ নিজ উদ্যোগে গ্যাস ও জৈব সার উৎপাদন করে আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।
উদ্যোক্তা জমির উদ্দিন জানান, প্রায় দেড় লাখ টাকা বিনিয়োগ করে তিনি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন করেন। নিজের গরুর খামারের গোবর ব্যবহারের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী বাইরে থেকেও গোবর কিনে আনেন। তাঁর প্লান্টে উৎপাদিত গ্যাস দিয়ে তিনটি চুলা জ্বালানো যায়। এরমধ্যে একটি চুলা তিনি নিজের পরিবারের প্রয়োজনে ব্যবহার করেন এবং বাকি দুটি চুলার গ্যাস বিক্রি করে প্রতি মাসে প্রায় সাত হাজার টাকা আয় করছেন।
তিনি আরও জানান, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বায়োগ্যাস ও জৈব সার উৎপাদনের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছেন। তার প্লান্ট থেকে প্রতি মাসে প্রায় পাঁচ টন জৈব সার উৎপাদিত হয়। উপজেলা কৃষি অফিস এসব সার কিনে কৃষকদের মধ্যে বিতরণ করে। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকরাও নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী তাঁর কাছ থেকে সার কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
জুড়ী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, জুড়ী উপজেলায় বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপন কর্মসূচি সফলতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সাগরনাল ইউনিয়নকে বায়োগ্যাস পল্লী ঘোষণা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে ১৩টি প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লান্টের মাধ্যমে প্রায় ৮০টি পরিবার বায়োগ্যাস ব্যবহারের সুফল ভোগ করছে।
তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এ কার্যক্রম আরও ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষ প্রচলিত সিলিন্ডার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে পারবেন। আগ্রহী উদ্যোক্তারা বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের জন্য যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ঋণ নিতে পারবেন। ঋণ গ্রহণের পর প্রথম তিন মাস কোনো কিস্তি পরিশোধ করতে হয় না। পরবর্তী সময়ে ২.৫০ শতাংশ সুদে ২৪টি কিস্তির মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সুযোগ রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম খান জানান, পরিবেশ দূষণ ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কৃষিতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে জৈব সারের বিকল্প নেই। বিশেষ করে কেঁচো সারসহ বিভিন্ন জৈব সারের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বায়োগ্যাস প্লান্টের মাধ্যমে উদ্যোক্তারা একই সঙ্গে জ্বালানি গ্যাস ও জৈব সার পাচ্ছেন। এতে তাঁরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার পাশাপাশি কৃষিও উপকৃত হচ্ছে। কোনো উদ্যোক্তা বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনে আগ্রহী হলে উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।
জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফজলে রাব্বানী চৌধুরী বলেন, বায়োগ্যাস অত্যন্ত উপকারী ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি উৎস। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে একদিকে উৎপাদনকারীরা জ্বালানি ও সার পাচ্ছেন, অন্যদিকে কৃষকরাও উপকৃত হচ্ছেন। পরিবেশবান্ধব এ উদ্যোগ জুড়ী উপজেলায় একসময় বড় ধরনের বিপ্লব ঘটাতে সক্ষম হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
স্থানীয়ভাবে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের এই উদ্যোগ শুধু বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং গ্রামীণ পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কৃষির উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উদ্যোক্তা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকলে জুড়ীর এই সাফল্য দেশের অন্যান্য এলাকাতেও অনুকরণীয় হয়ে উঠতে পারে।#