এইবেলা, কুলাউড়া ::
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা থেকে দেশীয় নৃত্যের শুদ্ধ ধারাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে দিচ্ছেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী, কোরিওগ্রাফার ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মোঃ দেলোয়ার হোসেন দূর্জয়। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ঐতিহ্যবাহী পারফর্মিং আর্টসের বিকাশে নিরলসভাবে কাজ করে যাওয়া এই গুণী শিল্পী আজ দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক সুপরিচিত নাম।
মোঃ দেলোয়ার হোসেন দুর্জয়ের নৃত্য জীবনের শুরু ও এই অনন্য সাফল্যের পেছনে রয়েছে একনিষ্ঠ সাধনা এবং দেশের শ্রেষ্ঠ মহীরুহদের নিবিড় দিকনির্দেশনা। সিলেট বিভাগের অত্যন্ত স্বনামধন্য ও শীর্ষস্থানীয় প্রধান নৃত্যগুরু নীলাঞ্জনা দাস জুঁইয়ের হাত ধরে নৃত্যাঙ্গনে তার প্রথম হাতেখড়ি হয়। গুরু নীলাঞ্জনা দাস জুঁইয়ের অনন্য শৈল্পিক ছায়াতলেই দুর্জয় নৃত্যের প্রাথমিক ব্যাকরণ ও শুদ্ধ রস আস্বাদন করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকার প্রখ্যাত ও অত্যন্ত বড় মাপের দেশবরেণ্য কথক নৃত্যগুরু সাজু আহমেদের সান্নিধ্যে এসে দীর্ঘ সময় শাস্ত্রীয় কথক নৃত্যের জটিল তত্ত্ব, মুদ্রা ও নান্দনিকতার নিবিড় পাঠ গ্রহণ করেন। তবে দুর্জয়ের আজকের এই অনন্য অবস্থান, কোরিওগ্রাফিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং দেশব্যাপী পরিচিতির মূল কাণ্ডারি, পথপ্রদর্শক ও প্রধান পরম অভিভাবক হলেন একুশে পদকপ্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রখ্যাত নৃত্য সারথি লায়লা হাসান। দুর্জয় অত্যন্ত জোর দিয়ে ও কৃতজ্ঞচিত্তে অকপটে স্বীকার করেন—”আজকের এই দুর্জয় এই জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে শুধুমাত্র পরম শ্রদ্ধেয় লায়লা হাসানের স্নেহ, অসীম ভালোবাসা এবং অভিভাবকত্বের কারণে।”

জাতীয় গণমাধ্যম ও বড় বড় ঐতিহাসিক মঞ্চে মোঃ দেলোয়ার হোসেন দুর্জয়ের কোরিওগ্রাফি ও পরিচালনা বরাবরই প্রশংসিত হয়েছে। প্রখ্যাত নৃত্যগুরু লুবনা মারিয়মের বিশেষ আমন্ত্রণে ও প্রত্যক্ষ আহ্বানে মোঃ দেলোয়ার হোসেন দুর্জয় তার দল ‘নৃত্যালয় কুলাউড়া’ নিয়ে বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন দেশ টিভিতে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করেন। দেশ টিভির পর্দায় গুরু লুবনা মারিয়মের মাধ্যমে দুর্জয়ের একক কোরিওগ্রাফি ও পরিচালনায় নির্মিত বিশেষ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক নৃত্যালেখ্য “দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা” দেশব্যাপী সফলভাবে সম্প্রচারিত ও সর্বমহলে উচ্চ প্রশংসিত হয়। এছাড়াও মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা থানায় তার নির্দেশনায় দেবী দুর্গার জীবনী অবলম্বনে নির্মিত ঐতিহাসিক নৃত্যনাট্য “মহিষাসুর মর্দিনী” মঞ্চস্থ হয়, যা দর্শকদের কাছে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

মোঃ দেলোয়ার হোসেন দুর্জয়ের নৃত্য ক্যারিয়ারের পথচলা অনন্য ও ঐতিহাসিক সব জাতীয় কীর্তি দ্বারা সুসজ্জিত। ২০১৫ সালে জাতীয় শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় সৃজনশীল নৃত্যে নিজের অসামান্য প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে তিনি দেশসেরা হন এবং জাতীয় স্বর্ণপদক লাভ করেন। এর ঠিক পরের বছরই ২০১৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) পর্দায় দেশবরেণ্য নৃত্যগুরু শিবলী মোহাম্মদ এবং শামীম আরা-র পরিকল্পনা ও পরিচালনায় প্রচারিত অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘তারানা’ নৃত্য প্রতিযোগিতায় এক অবিস্মরণীয় সাফল্য ছিনিয়ে আনেন তিনি। সেই প্রতিযোগিতায় নিজের হাতে গড়া সংগঠনের পক্ষে প্রধান নৃত্যশিল্পী, কোরিওগ্রাফার ও সংগঠক হিসেবে বহুমুখী দক্ষতার পরিচয় দিয়ে পুরো বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান (রানার্স-আপ) অর্জন করার গৌরব লাভ করেন দুর্জয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালে বিটিভির অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ বহুধাপ বিশিষ্ট জাতীয় অডিশন পার হয়ে তিনি স্থায়ীভাবে তালিকাভুক্ত গ্রেডেড নৃত্যশিল্পী (গ্রেড সি) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে মোঃ দেলোয়ার হোসেন দূর্জয়ের বিচারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রহণযোগ্যতা সুউচ্চ। কুলাউড়া অঞ্চলের একজন প্রধান নৃত্যশিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ হওয়ার কারণে বাংলাদেশ শিশু একাডেমির জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা,নজরুল বর্ষ এবং জাতীয় কন্যা শিশু দিবসসহ সরকারের বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক ইভেন্টে তিনি নিয়মিত প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার এই কারিগরি দক্ষতা ও যোগ্যতার কারণে মৌলভীবাজার জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক স্বনামধন্য জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা জ্যোতি সিনহার বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি জেলা পর্যায়ে অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রোগ্রামে আমন্ত্রিত হন। কালচারাল অফিসার জ্যোতি সিনহার আমন্ত্রণে ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তিনি মৌলভীবাজারের বড় বড় সাংস্কৃতিক উৎসবে যেমন সফলভাবে পারফর্ম করেছেন, তেমনি জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতাসমূহের মূল প্যানেলে প্রধান নৃত্য বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে খাতের নীতিনির্ধারণে বিশেষ অবদান রেখেছেন।
একজন উচ্চমানের নৃত্যশিক্ষক ও প্রশিক্ষক হিসেবে মোঃ দেলোয়ার হোসেন দূর্জয় দেশের প্রথম সারির স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নটরাজ’, ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর’ এবং ‘নজরুল একাডেমি’-তে অত্যন্ত সফলতার সাথে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত নৃত্য শিক্ষা দিয়েছেন। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই নয়, তার কোরিওগ্রাফিক পারদর্শিতার কারণে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমন্ত্রিত হয়েছেন। তিনি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি এবং রংপুর বিভাগের ঐতিহ্যবাহী কুড়িগ্রামের নৃত্যকনা একাডেমির বিশেষ আমন্ত্রণে আমন্ত্রিত হয়ে সেখানকার স্থানীয় নৃত্যশিল্পীদের জন্য অত্যন্ত সফলতার সাথে নাচের বিশেষ ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেছেন এবং সেখানে শিক্ষার্থীদের নিবিড়ভাবে উন্নত নৃত্যকলা ও নতুন কোরিওগ্রাফির ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। এছাড়া তিনি দেশের বিভিন্ন বিভাগে ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমন্ত্রিত হয়ে সফলভাবে পারফর্ম করেছেন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পর্ষদ থেকে প্রচুর সম্মাননা ও স্বীকৃতি লাভ করেছেন।
মোঃ মোস্তাক আহমেদ-এর রচনায় মরমী কবি হাছন রাজার জীবনী অবলম্বনে নির্মিত জনপ্রিয় নৃত্যনাট্য “হাছন রাজা” মূলত দুর্জয়ের কোরিওগ্রাফি ক্যারিয়ারের অন্যতম একটি সিগনেচার প্রোডাকশন। তার নিজের হাতে গড়া শীর্ষস্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘নৃত্যালয় কুলাউড়া’-র অষ্টম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রোডাকশনে এই নৃত্যনাট্যটির প্রথম (উদ্বোধণী) মঞ্চায়ন সফলভাবে সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর, কুলাউড়ার এমপি এম এম শাহীনের বিশেষ আমন্ত্রণে কুলাউড়া ডাকবাংলো প্রাঙ্গণে এই “হাছন রাজা” নৃত্যনাট্যটির দ্বিতীয় মঞ্চায়ন অনুষ্ঠিত হয়, যা পুরো অঞ্চলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে তার অনন্য নেতৃত্বে নৃত্যালয়ের দশম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আন্তর্জাতিক নৃত্য উৎসবে এই কালজয়ী নৃত্যনাট্যটির সফল তৃতীয় মঞ্চায়ন সম্পন্ন হয়।
২০২৪ সালের সেই আন্তর্জাতিক উৎসবটি ছিল কুলাউড়ার সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি মাইলফলক। দুর্জয়ের সফল পরিকল্পনা ও আমন্ত্রণে এই উৎসবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ (কলকাতা), ঢাকা, সিলেট, বগুড়া, যশোর, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের শীর্ষস্থানীয় নৃত্য দলসমূহ অংশগ্রহণ করে বিশ্বমঞ্চে কুলাউড়াকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।
বর্তমানে দুর্জয় মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ শিশু একাডেমির কুলাউড়া উপজেলা শাখার একমাত্র মনোনীত নৃত্য শিক্ষক হিসেবে একঝাঁক নতুন প্রজন্মকে তৈরি করছেন। একই সাথে তিনি ‘নৃত্যালয় কুলাউড়া’-র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তিনি এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা কুলাউড়া উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এবং মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তার এই অনন্য অভিজ্ঞতার কারণে ২০২৫ সালে তিনি দেশের অন্যতম বৃহৎ রিয়েলিটি শো “মার্কস অলরাউন্ডার”-এর নৃত্যের সম্মানিত প্যানেল বিচারকের দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে পালন করেন।
নৃত্যের আলো ছড়িয়ে দুর্জয় শুধু দেশের মাটিতেই নয়, একজন আন্তর্জাতিক নৃত্যশিল্পী হিসেবে দেশের বাইরেও একাধিকবার সফলভাবে পারফর্ম করে এসেছেন। এর মধ্যে তিনি ভারতের মেঘালয়ের শিলং, আসামের শিলচর এবং পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা ও বর্ধমানে শো সম্পন্ন করেছেন। শিকড়ের সংস্কৃতিকে ধারণ করে মোঃ দেলোয়ার হোসেন দুর্জয় এই নান্দনিক যাত্রাকে আগামী দিনে আরও বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে চান।#