ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি::
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। ভোটের আর মাত্র একদিন বাকি থাকতেই সুনামগঞ্জ–৫ (ছাতক–দোয়ারাবাজার) আসনে উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছে। শেষ সময়ের প্রচার, কৌশল নির্ধারণ ও ভোটারদের মন জয় করতে প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো এখন সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ ভোটারদের অভিমত—এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে।
যদিও আসনে মোট পাঁচজন দলীয় প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তবে বাস্তব ভোটের সমীকরণে বিএনপি মাঠে এগিয়ে, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণার প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভূত হচ্ছে। তবে সামগ্রিক রাজনৈতিক শক্তিমত্তা ও সংগঠনিক সক্ষমতায় এখনো বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে আছে বলেই মনে করছেন স্থানীয় পর্যায়ের পর্যবেক্ষকরা।
বিএনপির সুসংগঠিত প্রচারণায় গতি ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন—বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ–সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য। এ আসনে তার দলের অভ্যন্তরীণ অবস্থান আরও সুসংহত হয়েছে তখনই, যখন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরী দলীয় সিদ্ধান্তে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। ফলে এখন মিলনই বিএনপির একক মুখ।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, গত সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত ছাতক–দোয়ারাবাজারের ১৭০টি ভোটকেন্দ্র ঘিরে উঠান বৈঠক, পথসভা ও গণমিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছে। পীর ফুলতলী মশলক ও জমিয়েতে উলামায়ে হিন্দ ঘরানার প্রভাবশালী নেতারা মাঠে নেমে ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ৩১ দফা ইশতেহারের লিফলেট ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে প্রতিটি গ্রামে।
সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির নেতা নজরুল ইসলাম ,বিএনপি পৌর কমিটির আহ্বায়ক সামছুর রহমান সামছু, ছাত্রদলের কেন্দ্রিয় কমিটির সাবেক নেতা একেএম রিপন তালুকদার,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র নেতা তরুন ব্যরিষ্টার আব্দুর রকিবসহ একাধিক নেতাকমীরা জানান, “ধানের শীষ শান্তি, উন্নয়ন ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক। ছাতক–দোয়ারাবাজারের মানুষ মিলনের ওপর আস্থা রাখে। এ আসনে বিশাল ব্যবধানে ধানের শীষের বিজয় নিশ্চিত।”তারা দাবি করেন, কেউ বাধা দিলেও বিএনপির বিজয় ঠেকানো যাবে না।
প্রার্থী মিলনও আত্মবিশ্বাসী। নির্বাচিত হলে ছাতককে পৃথক উপজেলা ঘোষণা, স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ, রাস্তা–ঘাট সংস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়নকাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।
জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা: নীরব ভোটের আশায় অন্যদিকে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মাওলানা আব্দুস সালাম আল মাদানী—সিলেট মহানগর জামায়াতের সুরা ও কর্মপরিষদ সদস্য। যদিও ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী মাঠে সব সময় সমান ভাবে সক্রিয় রয়েছেন।
তবে শেষ মুহূর্তে নারী ও তরুণ ভোটারদের মাঝে জামায়াতের প্রচারণা উল্লেখ যোগ্য সাড়া ফেলেছে বলে জানা গেছে।
জামায়াতের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির পরিচালক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম তালুকদার বলেন, “দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। নারী কর্মীদের প্রচারণায় বাধা ও হুমকির ঘটনা দু:খজনক। জনগণ নীরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেবে।”
স্থানীয় রাজনৈতিক মহল মনে করছে, জামায়াতের সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক, তরুণ ভোটারদের সাথে ডিজিটাল যোগাযোগ, এবং নারীদের নিভৃত প্রচারণা দাঁড়িপাল্লাকে একটি শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।
দলের আনুগত্যে ফেরত বিএনপি নেতা বিএনপি নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী বলেন, “ধানের শীষ ছাড়া আমাদের কোনো অবস্থান বিকল্প নেই। আমরা মিলনের পক্ষে আজ ঐক্যবদ্ধ।” তার মনোনয়ন প্রত্যাহার–পরবর্তী অবস্থান বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে ঐক্যের মধ্যে নেতাকমীরা মাঠে কাজ করছেন।
অন্যান্য প্রার্থীরা আসনে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন—খেলাফত মজলিসের মোহাম্মদ আব্দুল কাদির (দেয়াল ঘড়ি),জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম (লাঙ্গল),এনপিপির মো. আজিজুল হক (আম)। তবে তারা মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে থাকলেও নিজ নিজ ভোটব্যাংক ধরে রাখতে মাঠে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আওয়ামী লীগ ভোট কোথায় যাবে? আওয়ামীলীগের পদ পদবী নেতাকমীরা বলছেন, ৭১ সালে স্বাধীনতা বিরোধী সংগঠনকে আওয়ামীলীগের অঙ্গ সংগঠন ও সাধারন ভোটার তাদেরকে ভোট দেবে না। বেশী নেতাকমীরা বিএনপির প্রাথীকে সমথন করেছেন। তারা ভোটের কেন্দ্রে গেলে ধানের শিষকে ভোট দেবে।
এই আসনে আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে অংশ না নিলেও তাদের সাধারণ ভোটাররা কোন দিকে ঝুঁকবেন—সেটি শেষ মুহূর্তে পাল্লা ভারী করতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অনেকে আশাবাদী, আওয়ামী লীগ–ঘেঁষা ভোটের বেশিরভাগ বিএনপির দিকে গেলে মিলনের জয়ের ব্যবধান আরও বাড়বে।
৫ লাখের বেশি ভোটারের আসন নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী—মোট ভোটার: ৫,২৭,৪৫৮ জনপুরুষ: ২,৭০,৬২০. নারী: ২,৫৬,৮৩৬, হিজড়া ভোটার: ২ জন মোট কেন্দ্র: ১৭০টি। ছাতক ও দোয়ারাবাজার—দুটি উপজেলায় বিস্তৃত এ আসনের ভোটাররা মূলত প্রবাসী নির্ভর অর্থনীতি, ধর্মীয় প্রভাব এবং স্থানীয় নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিয়ে সিদ্ধান্ত নেন।
টানটান উত্তেজনার অপেক্ষা ভোটের আগে শেষ রাত পর্যন্ত উভয় পক্ষ ঘরে ঘরে প্রচারণা চালাতে ব্যস্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ–ভিডিও, স্ট্যাটাস, প্রচারণামূলক পোস্টে সরব তরুণরা। গ্রামাঞ্চলেও সন্ধ্যার পরও মাইকিং, লিফলেট বিতরণ ও সম্পর্ক–জোরদার প্রচারণা চলছে। উৎসুক ভোটাররা এখন তাকিয়ে আছে ১২ ফেব্রুয়ারির দিকে—শেষ পর্যন্ত সুনামগঞ্জ–৫ আসনে কোন প্রতীক জয়ের মুকুট পরবে—ধানের শীষ, নাকি দাঁড়িপাল্লা?###