বড়লেখা প্রতিনিধি :
প্রায় ২৭ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইয়ের আজমান সিটিতে পানির ট্যাঙ্কারের ড্রাইভারের চাকুরি করতেন বড়লেখা পৌরশহরের বাঁশতলা এলাকার যুবক সালেখ উদ্দিন ওরফে আহমদ আলী (৪৮)। তিন মাস আগে দেশে ফিরে স্ত্রী-সন্তানদের সাথে ছুটি কাটিয়ে গেছেন সালেখ। ৭ মাস পর দেশে ফিরে ফাউন্ডেশন তোলা দ্বিতল বাড়ির নির্মাণ কাজ শেষ করে সেখানে ওঠার এবং বড় ছেলে আব্দুল হককে পর্তুগাল অথবা ইটালি পাঠানোর বন্দোবস্ত করার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু প্রবাসি সালেখের সব স্বপ্ন মুহূর্তেই চুরমার করে দিয়েছে ইরানের ছোড়া একটি ক্ষেপণাস্ত্র। শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) কর্মরত অবস্থায় ক্ষেপনাস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হলে আজমানে শেখ খলিফা সিটি মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সোমবার সকালে টেলিফোনে আমিরাতে নিহত বড়লেখার প্রবাসি সালেখ উদ্দিন ওরফে আহমদ আলীর স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের খবর নিয়েছেন। তিনি নিহতের লাশ দেশে নিয়ে আসা ও অন্যান্য সবধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এছাড়া মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেলও বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসার গালিব চৌধুরীকে পাঠিয়ে নিহত প্রবাসীর পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিয়েছেন সরকারি সাহায্য সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন।
সোমবার দুপুরে নিহত সালেখ উদ্দিন ওরফে আহমদ আলীর বাড়িতে গেলে স্বজনদের মাতম চলতে দেখা যায়। স্ত্রী-সন্তান, বোন-সহ আত্মীয়-স্বজনের বিলাপে এলাকার বাতাস ভারি হয়ে ওঠেছে। স্ত্রী মিনু বেগম বিলাপ করতে করতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ছেন। সালেখের ৮ বোনের ছয়জনই ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ছুটে এসেছেন, কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছেন মুর্চা যাচ্ছেন। অপর দুই বোনও পৌঁছার পথে। সালেখ উদ্দিন দুই ভাই জাকির হোসেন ও বোরহান উদ্দিনও দুবাই থাকেন। লাশের অভিভাবক হিসেবে এখন তারা সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন।

নিহত সালেখ উদ্দিন ওরফে আহমদ আলীর বড় ছেলে আব্দুল হক জানান, তার বাবা তাকে ইউরোপ যাওয়ার জন্য দুবাই নেন। কিন্তু প্রতারকের খপ্পড়ে পড়ে তাকে জেলে যেতে হয়। জেল খেটে ২০ দিন আগে দেশে ফিরেছেন। জেলে থাকা ও দেশে ফেরার সময় বাবার সাথে দেখা হয়নি। বাবা বলেছিলেন ‘৭ মাস পর দেশে এসে ঘরের কাজ শেষ করবেন ও ভাল লোক ধরে আমাকে ইউরোপ পাঠাবেন।’ কিন্তু এর আগেই ইরানের ছোড়া ক্ষেপনাস্ত্র আমার বাবাকে কেড়ে নিয়েছে। তার দাবি সরকার যেন তার বাবার লাশ দেশে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।
ইউএনও গালিব চৌধুরী জানান, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে সোমবার দুপুরে তিনি নিহত প্রবাসীর বাড়িতে গিয়ে তার স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন এবং কোনো সমস্যা রয়েছে কি-না জানার চেষ্টা করেছেন। এব্যাপারে সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি স্বজনদের আশ্বাস প্রদান করেন। এর আগে থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান খান আবুধারিতে ক্ষেপনাস্ত্র হামলায় নিহত সালেখ উদ্দিন ওরফে আহমদ আলীর বাড়িতে গিয়ে স্ত্রী-সন্তানের খোঁজ খবর নিয়েছেন।
গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক পৌর কাউন্সিলার মো. শাহজাহান জানান, সালেখ উদ্দিন ও আহমদ আলী দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসে থাকেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মোটামুটিভাবে সংসার চালাচ্ছিলেন। স্ত্রী শারীরিক প্রতিবন্ধী স্ত্রী মিনু বেগম, থেলাসমিয়া রোগি মেজো ছেলে সালমান আহমদ। থেলাসমিয়া রোগি ছেলের চিকিৎসায় মাসে ১৮ হাজার টাকা ব্যয় হয়। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সালেখ উদ্দিনের মৃত্যুতে অসুস্থ ছেলের চিকিৎসা ও জীবন যাপন নিয়ে স্ত্রী-সন্তানরা চরম অসহায় ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।