বড়লেখা প্রতিনিধি:
দীর্ঘ প্রায় ৫ বছর আইনি লড়াই শেষে বড়লেখা উপজেলার নিজ বাহাদুরপুর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণের পথে আর কোনো বাধা রইল না রশিদ আহমদ সোনামের। হাইকোর্ট বিভাগের সর্বশেষ রায়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর দায়ের করা রিট পিটিশন খারিজ হওয়ায় তিনি এখন আইনত দায়িত্ব গ্রহণের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছেন। নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে পুনরায় ভোট গণনায় ২২ ভোট বেশি পেয়ে তিনি বিজয়ী হন।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল ও মৌলভীবাজার সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন সুনামকে বিজয়ী ঘোষণা করে রায় দেন। কিন্তু সংশোধিত গেজেট প্রকাশের পরও প্রতিপক্ষ প্রার্থী খসরুজ্জামানের নানা মারপ্যাচে বিগত তিন বছরেও তিনি শপথ নিতে পারেননি। বিচার বিভাগের সকল স্তরের আইনি লড়াই শেষে অবশেষে তিনি জয়ী হয়েছেন। ২৭ জুলাই শপথ গ্রহণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ইউপি সদস্য রশিদ আহমদ সোনাম বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।
জানা গেছে, বিগত ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বড়লেখা উপজেলার গল্লাসাঙ্গন দাখিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ইউপি সদস্য পদে ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন তখনকার ইউপি সদস্য রশিদ আহমদ সোনাম। তার সাথে মোরগ প্রতীকে লড়েন খসরুজ্জামান। ভোট গণনা শেষে প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তারা সোনামের ৫৩টি ব্যালট পেপার অবৈধ ঘোষণা করে খসরুজ্জামানকে ৫ ভোটে বিজয়ী ঘোষণা করেন। সে সময় সোনামের পোলিং এজেন্ট এ কারচুপির জোরালো আপত্তি জানালেও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিষয়টির গুরুত্ব দেয়নি। এছাড়া, প্রিজাইডিং কর্মকর্তা জোরপূর্বক ফলাফল শিটে এজেন্টের স্বাক্ষর নিলেও তাকে ফলাফল শিটের অনুলিপি দেওয়া হয়নি। ওই একই কেন্দ্রে চেয়ারম্যান পদের ফলাফলে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয়েছিল ১৩৩৫টি, কিন্তু মেম্বার পদের ফলাফলে তা দেখানো হয় ১৩৪৬টি।
পরবর্তীতে পরিকল্পিত জালিয়াতির সব তথ্য সংগ্রহ করে নির্বাচনী ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে রশিদ আহমদ সোনাম মৌলভীবাজারের নির্বাচনী ট্রাইব্যুনাল আদালতে মামলা করেন। আদালত ভোট পুনঃগণনা শেষে রশিদ আহমদ সোনামকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে রশিদ আহমদ সোনামের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী খসরুজ্জামান নির্বাচনী আপিল ট্রাইব্যুনাল আদালতে আপিল করলে সেখানেও সোনামের বিজয় বহাল থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ২২ জুন নির্বাচন কমিশন সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে। ইউপি সদস্য রশিদ আহমদ সোনামের নামে উপজেলা প্রশাসন শপথগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করে চিঠিও ইস্যু করে। রশিদ আহমদ সোনাম ইউপি সদস্য হিসেবে শপথ গস্খহণ করতে উপজেলা পরিষদে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হলে শেষ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ ইউপি সদস্য খছরুজ্জামানের হাইকের্টের রিট পিটিশনের কপি জমা দিলে শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান স্থগিত করেন তৎকালীন ইউএনও গালিব চৌধুরী।
তবে আদালতের পুনঃভোট গণনায় পরাজিত ইউপি সদস্য খসরুজ্জামান আপিল ট্রাইব্যুনাল আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন (৮৯১৯/২০২৫) দায়ের করলে বিষয়টি আইনি জটিলতায় আটকে যায়। বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে শপথের চিঠি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্টের স্থগিতাদেশের কারণে শপথ গ্রহণ স্থগিত হয়ে যায়।
সর্বশেষ গত ৯ জুলাই বিচারপতি মো. হাবিবুল গনি ও বিচারপতি সৈয়দ মোহাম্মদ তাজরুল হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানি শেষে খসরুজ্জামানের দায়েরকৃত রিট পিটিশনটি সরাসরি খারিজ করে দেন। একই সাথে আদালত নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের মূল রায় বহাল রেখে আগের সব স্থগিতাদেশ বাতিল ঘোষণা করেন।
প্রায় পাঁচ বছরের আইনি জটিলতা নিরসন হওয়ায় গত ২৭ জুলাই রশিদ আহমদ সোনাম বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে শপথ গ্রহণের জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে আবেদন জানিয়েছেন। তিনি দ্রুত দায়িত্ব বুঝে পেতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
রশিদ আহমদ সোনাম বলেন, ‘দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সত্য ও ন্যায়বিচারের প্রতফলন ঘটেছে। আমি জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করছি।’
মামলায় রশিদ আহমদ সোনামের পক্ষে হাইকোর্টে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী তৌফিক আনোয়ার চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ শুনানি শেষে মহামান্য হাইকোর্টের রায়ে আমার মক্কেল ন্যায়বিচার পেয়েছেন। এখন রশিদ আহমদ সোনামের নির্বাচিত ইউপি সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণে আর কোনো আইনগত বাধা নেই।’