‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের শতবর্ষ উদযাপনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিন দাবি – এইবেলা
  1. admin@eibela.net : admin :
বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:৩১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
ছাতকে ফুটবল টুর্নামেন্টের বিরোধে দুই গ্রামবাসীর সংঘর্ষ : আহত শতাধিক চা শ্রমিক ইউনিয়ন নির্বাচন- বড়লেখায় ১৮ চা বাগানে ভোটার ৪ হাজার, প্রশাসনের প্রস্তুতি শুরু বড়লেখায় ইউসি ব্যাংকের ক্যাশলেস লেনদেন বিষয়ক র‌্যালি ও আলোচনা সভা কর্মজীবনের ইতি টানছেন ব্যাংকার সালাহ্ উদ্দিন : গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় ভাতিজির সাথে অসমপ্রেম : প্রেমিকার পিতার হাতে যুবক নি হ ত জেলা প্রশাসক ও ইউএনওর কাছে অভিযোগ : ছাতকে নীতিমালা লঙ্ঘন করে পাগনা বড়বিলে মাছ লুটের প্রস্তুতি! খন্ডিত শিক্ষা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি হয় না- ড. আবেদ চৌধুরী জুড়ীতে ১৩ বায়োগ্যাস প্লান্ট প্লান্ট থেকে ৮০ পরিবার বায়োগ্যাস ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছে কুড়িগ্রামে ৯ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল : জেলায় পাসের হার ৪০.৭২%  ওসমানীনগরে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ৩ দফা দাবিতে মানববন্ধন ও সমাবেশ

‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের শতবর্ষ উদযাপনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিন দাবি

  • শনিবার, ২২ মে, ২০২১
শ্রীমঙ্গল :: 'মুল্লুক চলো' আন্দোলনের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে পদযাত্রার একাংশ। ছবি :: এইবেলা

Manual3 Ad Code

সৈয়দা হাজেরা সুলতানা , এইবেলা :: চা শ্রমিকদের জীবনে ঐতিহাসিক রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ‘মুল্লুক চলো’ দিবসের বৃহস্পতিবার (২০ মে ২০২১) শতবর্ষ পূর্ণ হলো। দিবসটি পালনে শ্রীমঙ্গলে চা-শ্রমিক সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও চা শ্রমিক ছাত্র সংগঠন দিন ব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহণ করে।

বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ দিনব্যাপী কর্মসূচীর মাধ্যমে ঐতিহাসিক “মুল্লক চল” আন্দোলন এর শতবর্ষ পুর্তি উদযাপন ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনটি দাবী পেশ করে জেলা প্রসাশকের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করে।

দিনের কর্মসূচীর মধ্যে শুক্রবার ২১ মে ২০২১ দুপুর দেড়টায় বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজনে শ্রীমঙ্গলস্থ লেবার হাউস মিলনায়তনে  আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মাখন লাল কর্মকার।

প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাধারণ সম্পাদক ও কমলগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান রাম ভজন কৈরী। স্বাস্থ্যবিধি মেনে অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য রাখেন পরেশ কালিন্দী, বৈশিষ্ট তাঁতী, রেখা বাগতী, বিজয় হাজরা প্রমূখ।

Manual6 Ad Code

এর আগে সকাল ১১টায় ঐতিহাসিক “মুল্লক চল” আন্দোলনের শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে শ্রীমঙ্গলস্থ ভাড়াউড়া চা বাগানে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পদযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

Manual3 Ad Code

‘বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ’ এর কার্যনির্বাহী কমিটির পরিচালনায় তিন পর্বে অনুষ্ঠিত কর্মসূচীর প্রথম পর্বে উপস্থিত সবাই পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে। পদযাত্রাটি বধ্যভূমি হতে শুরু করে ভাড়াউড়া চা বাগান হয়ে আবার বধ্যভূমিতে শেষ হয়।

দ্বিতীয় পর্বে বধ্যভূমিতে নির্মিত অস্থায়ী বেদিতে “মুল্লুক চল” আন্দোলন এর শহীদ চা শ্রমিকদের স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন ও ১ মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

‘বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদ’ এর বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি মনোজ যাদব এর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক রাজু নুনিয়ার সঞ্চালনায় তৃতীয় পর্বে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা।
এতে বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয় চা ছাত্র সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক পল্লব কুমার তাঁতী, কোষাধ্যক্ষ বিশ্বজিত কৈরী, পূনম বর্মা প্রমূখ।

Manual8 Ad Code

বক্তারা আজকের এই ঐতিহাসিক দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামেও অংশগ্রহণ করেন চা শ্রমিকেরা। বক্তারা আক্ষেপ করে বলেন, ঐতিহাসিক “মুল্লুক চল” আন্দোলন আজ শতবর্ষে পদার্পন করলেও এই দিনটিকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি। এই দিনে শহীদ হওয়া চা শ্রমিকদের স্মরণে এখন পর্যন্ত কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মান করা হয় নি। এখনো অনেক চা শ্রমিক এই ঐতিহাসিক দিনটির তাৎপর্য সম্পর্কে অবগত নন। সবাইকে এই দিনটির তাৎপর্য সম্পর্কে অবহিত করাতে চা বাগানের সকলের সহযোগিতা কামনা করেন বক্তারা।

আলোচনা সভা শেষে বক্তারা তাদের বক্তব্যে আজকের ঐতিহাসিক দিনটির উপর ভিত্তি করে বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী বরাবর তিনটি দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হলো, ২০ মে দিনটিকে ‘চা শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান, ২০ মে দিনটিকে স্ব-বেতন ছুটি ঘোষণা ও এই ঐতিহাসিক ঘটনাটিকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তকরণ।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ইংরেজ মালিকেরা এই অঞ্চলের চা চাষের জন্য শ্রমিক হিসেবে মধ্য ভারতের বিভিন্ন এলাকা হতে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে লোভ দেখিয়ে নিয়ে আসে। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় এ জনগোষ্ঠী শ্রমিক হিসেবে আসে ‘গিরমিট প্রথা’ চুক্তিতে। বাস্তবে ইংরেজ মালিকগণ তাদের সাথে দাসের মতো আচরণ করেছে। জংগল পরিষ্কার করতে গিয়ে হিংস্র বন্যপ্রাণীর আক্রমণে অনেক শ্রমিক মারা যায়। ম্যালেরিয়া, কালাজ্বরসহ আরো মারাত্মক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পাশাপাশি চলে মালিকের অত্যাচার ও নিপীড়ন।

Manual4 Ad Code

এই বঞ্চনার প্রতিবাদে ১৯২১ সালের মে মাসে অবিভক্ত ভারতের সিলেট ও কাছাড় অঞ্চলের প্রায় ত্রিশ হাজার চা শ্রমিক স্ত্রী, পুত্র,পরিজন নিয়ে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার(মুল্লুক চলো) আন্দোলনের ডাক দিয়ে রেলষ্টেশনের দিকে যাত্রা শুরু করে। ১৯২১ সালে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন ও গণজাগরণ তাদেরকে এই আন্দোলনে উৎসাহিত করে।

আন্দোলনরত শ্রমিকরা রেলষ্টেশনে জড়ো হয় আসাম যাওয়ার উদ্দেশ্যে। কিন্তু ব্রিটিশ মদদপুষ্ট রেল কর্তৃপক্ষ তাদের রেলে ওঠতে দেয়নি। অতঃপর তারা রেললাইন ধরে হাঁটতে থাকে চাঁদপুরে স্টিমারঘাটে জাহাজে ওঠার জন্য।পথিমধ্যে খাদ্য, পানীয় ও বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে নারী,শিশুসহ অনেক চা শ্রমিক মারা যায়। ১৯২১ সালের ২০ মে চাঁদপুর স্টিমারঘাটে পৌঁছলে জাহাজে ওঠতে শাসক গোষ্ঠীর নির্দেশে আসাম রাইফেলস এর গুর্খা সৈন্যরা বাধা দেয় ও গুলি চালায়। তাদের গুলিতে হাজার হাজার চা শ্রমিক নিহত হয়।অনেকে গ্রেফতার হয়।

মুল্লুকে চলো আন্দোলন ও চা শ্রমিক গণহত্যার ১০০ বছর পূর্তিতে ও ঐতিহাসিক বীরত্বগাথা রক্তাক্ত সংগ্রামের এক মহাউপাখ্যান সৃষ্টিকারী চা শ্রমিকদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদক মণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আমিরুজ্জামান বলেন, “যে অধিকার রক্ষার জন্য চা শ্রমিকদের ঐতিহাসিক আত্মত্যাগের দুঃখগাথা রচিত হয়েছে তার বাস্তবায়ন এই ১০০ বছরেও হয়নি। বছরের পর বছর বাগানমালিক ও সরকারের শোষণ-নিপীড়নের স্বীকার হচ্ছে চা শ্রমিকরা। নামমাত্র মজুরির পাশাপাশি ন্যূনতম মৌলিক অধিকার বরাবরই অধরাই থেকেছে। চা শ্রমিকদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়, এমন মজুরি চাই। মুনাফা ও সম্পদের ৯০% মালিকানা শ্রমিকদের হওয়া উচিত।

তাই বলা যায় চা শ্রমিকদের অধিকার আজও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভোগবাদী সমাজব্যবস্থার পুঁজিবাদী মনোভাব চা শ্রমিকদের জীবন চা গাছের ন্যায় বনসাই করে রেখেছে। চা শ্রমিকদের অমানবিক পরিশ্রমে ক্রমান্বয়ে চা শিল্পের বিকাশ ঘটেছে যার দরুন চা উৎপাদনের নতুন রেকর্ড গড়ে জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের পাশাপাশি রফতানিমুখী শিল্প হিসেবে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে কিন্তু দুষ্টচক্রে বাধা চা শ্রমিকদের জীবন মানের উন্নয়ন আর হয় না।

শ্রম আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে চা জনগোষ্ঠীকে বাসস্থান, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ও শিক্ষার অধিকার থেকে দূরে রেখেই বাগান পরিচালনা করছে মালিক পক্ষ। সরকারের এ ব্যাপারে তো কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। এতেই বোঝা যায় মুনাফালোভী বাগানমালিক আর রাষ্ট্রব্যবস্থা একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত। ১০০ বছর পরও চা শ্রমিকদের মুল্লুকে চলো আন্দোলনের আবেদন বারবার তাৎপর্যমণ্ডিত হয়ে ফিরে ফিরে আসে। চুক্তির মাধ্যমে চা শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরিব্যবস্থা চালু করা যায়নি। অদ্যাবধি আইনগতভাবে ন্যূনতম মজুরি বোর্ড দ্বারা শ্রমমূল্যের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা হয়নি। ফলে চা শ্রমিকদের শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরির নিশ্চয়তা এই রাষ্ট্র নির্ধারণ করে দিতে পারেনি।

আর চা শ্রমিকদের ভূমির অধিকার না থাকায় বাগানমালিকরা একুশ শতকেও জমিদার হিসেবেই রয়ে গেছে। হাজার হাজার চা শ্রমিকের বলিদানের পর আজ তার শতবর্ষেও এই রাষ্ট্র তাদের জীবনের মর্যাদা দেয়নি। গণহত্যার এই দিনটিকে মহান চা শ্রমিক দিবস হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় মহান চা শ্রমিক দিবস চিরভাস্বর হয়ে থাকুক। চা শ্রমিক দিবসের সংগ্রামের চেতনায় বারবার অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে চা শ্রমিকরা পুনর্জীবিত আর উদ্দীপ্ত হোক এই প্রত্যাশা রাখি।”

এসএইচএস/জেএইচজে

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২ - ২০২৪
Theme Customized By BreakingNews