ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি ::
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নে উন্নয়ন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে একের পর এক অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান আবু বক্কর এবং সংশ্লিষ্ট কিছু জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে। গ্রামীণ রাস্তা সংস্কার, কাঁচা রাস্তা মেরামত ও মাটি ভরাট প্রকল্পের বরাদ্দকৃত লাখ লাখ টাকা কোনো কাজ না করেই আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর দাবি, দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রকল্পে নামমাত্র কাজ দেখিয়ে কিংবা কোনো কাজই না করে মিথ্যা বিল-ভাউচার, জাল মাস্টাররোল ও মেকাপ রিপোর্ট তৈরি করে সরকারি অর্থ লুটে নিচ্ছে। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণসহ ভুক্তভোগীরা পরপর তিনবার ছাতক উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উপজেলা প্রশাসনের এই নীরবতা স্থানীয়ভাবে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
দড়ারপার–সেনপুর সড়কে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার প্রকল্প—কাজই হয়নি। দক্ষিণ খুরমা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের দড়ারপার বাজার থেকে সেনপুর পর্যন্ত একমাত্র কাঁচা রাস্তাটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ, স্কুল–কলেজের শিক্ষার্থীসহ নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ চলাচল করেন। বর্ষা এলে রাস্তাটি একেবারেই অচল হয়ে পড়ে। এ জনদুর্ভোগ কমাতে গত জানুয়ারি মাসে রাস্তা সংস্কারের জন্য ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড মেম্বার সপ্না বেগম। অভিযোগ রয়েছে—তিনি কাজ পুরোপুরি বন্ধ থাকার পরও প্রথম কিস্তির ৬৫ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। শুধু তাই নয়, কাজ না করেই দ্বিতীয় কিস্তির টাকাও তোলার জন্য প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসে নিয়মিত তদবির চালাচ্ছেন। এই অনিয়ম ও জালিয়াতির বিরুদ্ধে গ্রামের পক্ষ থেকে তামিদ আহমদসহ একাধিক ব্যক্তি ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
গ্রামবাসীর চাঁদায় রাস্তায় মাটি ভরাট, অথচ সরকারি বরাদ্দ পুরো তুলে নিলেন জনপ্রতিনিধিরা ১নং ওয়ার্ডের মাধবপুর গ্রামে ফজরের বাড়ি থেকে উকিল আলীর বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা দীর্ঘদিন চলাচলের অনুপযোগী ছিল। এলাকাবাসী চেয়ারম্যান–মেম্বারের দ্বারে বহুবার ঘুরেও কোনো কাজ না পেয়ে গত ৫ জানুয়ারি নিজেরাই চাঁদা তুলে রাস্তা মাটি দিয়ে ভরাট করেন। পরে জানা যায়—উক্ত রাস্তাটির জন্য সরকারিভাবে ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু কোনো কাজ না করেও চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট মেম্বার যোগসাজশে ভুয়া মাস্টাররোল ও জাল রিপোর্ট দাখিল করে পুরো টাকার উত্তোলন করে নিয়েছেন। গ্রামবাসীর পকেটের টাকায় করা কাজকে সরকারি কাজ দেখিয়ে এই অর্থ আত্মসাৎকে এলাকাবাসী প্রকাশ্য daylight robbery হিসেবে দেখছেন। এই ঘটনায় আব্দুল আলী (বাবুল)সহ একাধিক ভুক্তভোগী গত ১০ মে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পৃথক লিখিত অভিযোগ জমা দেন।
নোয়াগাঁও থেকে সেনপুর প্রধান সড়কটি সংস্কার ও মাটি ভরাটের জন্য সরকারিভাবে বরাদ্দ ছিল ৩ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। প্রকল্প অনুযায়ী ইউসুফ আলীর বাড়ির দক্ষিণ সীমা, নোয়াগাঁও–সেনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের ভাঙন এবং আমিনুর রহমানের বাড়ির পশ্চিম পাশের ভাঙনে মাটি ভরাট করার কথা ছিল।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত সিন্ডিকেট মাত্র ১ লাখ টাকার নামমাত্র কাজ দেখিয়ে প্রকল্পকে সমাপ্ত ঘোষণা করে। বাকি ২ লাখ ৮৪ হাজার টাকা কোনো ধরনের কাজ না করেই কৌশলে আত্মসাৎ করা হয়। ফলে রাস্তার গুরুত্বপূর্ণ ভাঙনগুলো আগের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে এই অংশগুলো একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। নোয়াগাঁও ও সেনপুর গ্রামের পক্ষ থেকে জমিলসহ বহু বাসিন্দা এ অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ—উপজেলা প্রশাসনের উদাসীনতা ও পর্যবেক্ষণের অভাব দুর্নীতিবাজদের আরও উৎসাহিত করছে। ভুক্তভোগীরা মনে করছেন, বারবার অভিযোগ দিয়েও কোনো পদক্ষেপ না হওয়ায় জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে ‘দায়মুক্তির’ মানসিকতা তৈরি হয়েছে। তারা দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা ও প্রকল্পগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এব্যাপারে চেয়ারম্যানের বক্তব্য মিলেনি এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান আবু বক্কর–এর মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মহি উদ্দিন বলেন, “আমি নতুন এখানে যোগদান করেছি। অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”###