ভালোবাসা দিবস : এক অন্ধ আর পাগলীর ভালোবাসাময় ২৫ বছর – এইবেলা
  1. admin@eibela.net : admin :
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬, ০৯:৩০ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
কুলাউড়ায় স্বেচ্ছাশ্রমে এক কিলোমিটার রাস্তা মেরামত করলো নতুন কুঁড়ি ক্লাব জুড়ীতে স্ত্রীকে কুপিয়ে হত্যার দায়ে স্বামী গ্রেফতার : দুই শিশু সন্তানের আর্তনাদে এলাকায় বিষাদ বড়লেখা সীমান্তে ভারতীয় মাদক ব্যবসায়ি আটক পরিচয়পত্র আধার কার্ড জব্দ সংবাদ সম্মেলন :: কুলাউড়ায় আ’লীগ নেতার বিরুদ্ধে প্রাণ নাশের হুমকি ও  জমি দখলের অভিযোগ জুড়ীতে শিক্ষার্থী নির্যাতনের অভিযোগ : ইউএনও বরাবর আবেদন ফেঞ্চুগঞ্জে নৌকায় বজ্রপাত রাজনগরের ৩ বড়শি শিকারির মৃত্যু প্রকাশিত সংবাদের নিন্দা ও প্রতিবাদ আত্রাইয়ে রেললাইনের পাশে পড়েছিলো লাশ ওসমানীনগরে সংস্কৃতি কেন্দ্রের উদ্যোগে হিজরি নববর্ষ উদযাপন ও আলোচনা  সিলেট বিভাগের বিদ্যুৎ উন্নয়ন মেগা প্রকল্প: হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি : ধামাচাপা দিতে সক্রিয় সিন্ডিকেট

ভালোবাসা দিবস : এক অন্ধ আর পাগলীর ভালোবাসাময় ২৫ বছর

  • শনিবার, ১৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬

Manual4 Ad Code

এইবেলা, কুলাউড়া :: 

বাসমতিকে এলাকার মানুষ পাগলী বলে ডাকে। আর তিনি এক অন্ধ  ব্যক্তির সাথে প্রেমে জড়িয়ে যান। তাই বাসমতিকে তার পরিবার ঘর থেকে বের করে দেয়। আর অন্ধ ব্যক্তিকেও শুধু পাগল নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্কের কারণে ঘর থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ ভালোবাসার দায়ে দু’জনেই হলেন ঘরছাড়া।

Manual2 Ad Code

অন্যদিকে তাদের কেউ কাজও দেয়না। কোন উপায় না পেয়ে গ্রামের পাশেই এক বাজারে থাকতে শুরু করলেন ছাপরি (বাগানীদের ভাষায় ভাঙা ঘর) বানিয়ে।

সেই পাগলীর দিন শুরু হতো সবার মতো ভোরবেলায়, তার অন্ধ স্বামীকে সাহায্য করার মাধ্যমে। কারণ স্বামী জন্মান্ধ। নাস্তা তৈরি থেকে শুরু করে তাকে স্নান করানো এবং পোশাক পরা – সবকিছুই তার দায়িত্ব। তারপর তারা একেঅন্যের হাত ধরে বেরিয়ে যেতেন ভিক্ষা করতে।

গত ২৫ বছর ধরে এভাবেই চলছে ৪৫ বছর বয়সী বাসমতি রবিদাস ও তার স্বামী রামনারায়ন রবিদাসের জীবন। তাদের গল্পকেবল শারীরিক অক্ষমতার সাথে লড়াই করার জন্য নয়; তাদের গল্প সংগ্রাম এবং প্রতিকূলতার দ্বারা পরীক্ষিত যেন এক নিখাঁদ প্রেমের গল্প।

মৌলভীবাজার  জেলার কুলাউড়া উপজেলার পালকিছড়া চা বাগানে দম্পতির ছোট টিনের ঘরে পরিদর্শনের সময়, দম্পতিকে একসাথে হাত ধরে হাটতে দেখা যায়।

রামনারায়ন প্রথম বিয়ে করেছিলেন কিন্তু সেই স্ত্রী মারা যায় সন্তান প্রসবের সময় সেটা প্রায় ৩০ বছর আগে। তারপর তিনি ছন্নছাড়া হয়ে পড়েন। পরিবারের পক্ষ থেকে কেউ তাকে আর গুরুত্ব দিতো না।

তারপর দেখা হয়ে যায় বাসমতির সাথে। চা বাগানের রাস্তায় কথা হতো একজনের সাথে আরেকজনের। চা বাগানের সেকশনেই শুরু হয় ভালোবাসার গল্প। সেই থেকে প্রেম।

বাসমতি বলেন, তার সাথে দেখা হলে মন ভরে কথা বলতাম। কিন্তু আমার পরিবার কেউ তাকে সহ্য করতো না সবাই আমাকে পাগল বলতো। তার সাথে সম্পর্কটা কেউ মেনে নিতে পারেনি। একদিন আমাকে তারা ঘর থেকেই বের করে দিলো। আমিও উপায় না পেয়ে তার ঘরে আশ্রয় নেই। কিন্তু আমার স্বামীর বাবা আমাকে গ্রহন করলেন না। আমার কারণে তাকেও  বাড়ি থেকে বের করে দেন।

তারপর থেকেই আমরা একে অন্যের হাত ধরে রাস্তায় থাকতে শুরু করলাম। সারাদিন একসাথেই থাকতাম। ভিক্ষা করতাম। আমার স্বামীর আত্মীয় স্বজনরাতো আমাদের দেখলে থুথু দিতো। কারণ আমি অন্ধ ব্যক্তিকে বিয়ে করেছি। তাই আমার বোনের সংসার টিকবে না এই দোহায় দিয়ে আমাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়।

আমাদের নিজের জাতের মানুষজন আমাদের এতো অবমুল্যান করতো যে দেখে বড় কষ্ট লাগতো। প্রায় পাঁচমাস বাজারের গাছের নিচে থাকলাম। ভিক্ষায় যা পেতাম তা দিয়ে খাবার ও  কাপড় চোপড়  দিয়ে কোনমতে দিনকাল পার করতাম। তারপর এক লোক দয়া করে তার বারান্দায় থাকতে দেয়। সেই সময় প্রতিদিন যেতো শুধু কান্নাকাটি করে। শুধু ভগবানকে বলতাম এতো কষ্ট কেনো দিলে ভগবান তুমি।

তিনি বলেন, আমার স্বামী অন্ধ দেখতে পায় না ঠিকই। কিন্তু সে আমার সঙ্গ কোনদিন ছাড়ে নি। আমার কথা সে শুনে সবসময়। আমাকে সবাই পাগলি বলতো।  তখন একটা কথায় মনে হতো, আমার মতো পাগলের কথা কেউ না শুনলেও একজনতো শুনে।

এদিকে রামনারায়ণ বললেন, আমার স্ত্রী মারা যাওয়ার পর আমি যেন ছন্নছাড়া হয়ে পড়ি। কেউ আমার খেয়াল করতো না। তখনই দেখা হতো বাসমতির সাথে। মন খুলে কথা বলতাম। তার সাথে সম্পর্কের কথা জানাজানি হলে আমার বাবা বললেন, তোমার জনমের ভাগী আমি হলেও কর্মের ভাগীতো আমি হতে পারবো না। বলে আমার বাবা আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। উপায় না পেয়ে বাড়ি ছেড়ে গেলাম।

তিনি বলেন, বাসমতি যখন দেখা করতে আসতো। খুব অবাক হতাম। আর শুধু ভাবতাম। আমার মতো অন্ধ যার ঠাই নেই পরিবারেই তাকে আবার কেউ ভালোবাসে। সেই থেকে তার কথা শুনতে লাগলাম। তার প্রতি আসক্ত হতে শুরু করলাম।তার প্রতি কৃতঞ্জতা জন্মাতে শুরু করলো।

রামনারায়ণ’র জীবনে তার স্ত্রীর ভূমিকার কথা বলতে বলতে তার চোখ জলে ভরে ওঠে। তার কাঁধে হাত রেখেই আমাকে চলতে হয়, তার চোখেই আমার ভরসা।

Manual2 Ad Code

যখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তিনি কি কখনও তার স্ত্রীর জন্য কিছু করার সুযোগ পেয়েছেন, তখন তিনি বলেন, আমি কেবল তার পাশে ছিলাম। সে আমাকে জীবনের বাকি সবকিছু দিয়েছে।

Manual3 Ad Code

তিনি বলেন, আমার আর এমন মনে হচ্ছে না যে আমি আর সংগ্রাম করছি। আমি যা করতে চাই তা হল আমার বাকি জীবন এই মানুষটির যত্ন নেওয়া।

বাসমতি বলেন, একবছর হতে না হতেই এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয় আমাদের পরিবারে। তখন আমাদের মধ্যে এক আশার সঞ্চার হয়। কিন্তু তার ভরণ পোষন নিয়ে চিন্তায় আমরা ঘুমাতে পারতাম না।

তিনি বলেন, খাবার অভাবে অনেক সময় আমার বুকে দুধ হতো না। প্রতিবেশীরা এসে দুধ খাওয়ে দিতেন। প্রায় দিন আমাদের সন্তান উপোষ ঘুমাতো। কারণ ভিক্ষা করে  আসতে আসতে রাত হয়ে যেতো। সন্তান উপোষ ঘুমিয়ে যেতো।তারপর আমাদের আরেক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তারপর আমরা আস্থা পেতে থাকি।

Manual8 Ad Code

সন্তান নিয়ে ভিক্ষা করা দেখলে বাজারের অনেকে বলতো সন্তানকে রোদ লাগায়েন না। এই কথা বলে তারা  তিনচারজন মিলে একদিনে খোরাক দিয়ে দিতো। তখন মনে হতো এখনো ভালো মানুষ আছে।

চোখে না দেখলেও জীবনের নিষ্ঠুরতা তিনি হাড়ে হাড়ে দেখেছেন। টিনের চালার নিচে চারজনের পরিবার নিয়ে তাঁর প্রতিদিনের যুদ্ধ শুধু বেঁচে থাকার। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ভিক্ষা করে কোনো রকমে দিন পার করতেন। তবু মনের ভেতরে ছিল একটুখানি স্বপ্ন—এই জীবন বদলাবেন, ভিক্ষার থালা নামিয়ে রাখবেন চিরতরে।

অনেক কষ্টে, অনেক লজ্জা আর অনিশ্চয়তা সয়ে তিনি নিলেন, এক লাখ টাকার ঋণ। ঘরের জমানো শেষ সম্বল যোগ করে কিনলেন একটি অটোরিকশা। ভেবেছিলেন, ছেলে সেটি চালাবে, ঘরে দু’মুঠো ভাত নিশ্চিত হবে, ভিক্ষার জীবনের অবসান হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বাঁচলো মাত্র ছয় মাস।

গত ৩১শে ডিসেম্বর ভোরে ঘুম ভাঙতেই রামনারায়নের জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার যেন জন্মান্ধতার চেয়েও ভয়ংকর। উঠোনে এসে দেখেন তালা ভাঙা, ভেতরে অটোরিকশা নেই। সব শেষ। যে বাহনটি ছিল বেঁচে থাকার শেষ ভরসা, সেটিও চোরের হাতে হারিয়ে গেল।

উঠোনে দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় রামনারায়ন বলেন, বড় অভাবে দিন চলে। ভিক্ষা করেই সংসার চলতো। অনেক কষ্টে এক লাখ টাকা লোন নিয়ে রিক্সাটা কিনছিলাম। ভাবছিলাম, আর ভিক্ষা করতে হবে না। ছেলে চালাবে, সংসার চলবে। কিন্তু ভগবান আর সে সুখ দিলেন না। এই কথাটুকু বলতেই তাঁর কণ্ঠ ভেঙে আসে, চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু।

পাশে দাঁড়িয়ে স্ত্রী বাসমতি রানী রবিদাস শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলেন, এই অটোরিক্সাটাই আছিল বিপদের ভরসা। মনে করছিলাম, আর ভিক্ষা করবো না। সংসারটা একটু দাঁড়াইবো। সব শেষ হয়ে গেল। চোরে মরা মানুষরে মারিয়া গেল। রামনারায়নের কণ্ঠে আছে ক্ষোভের চেয়ে বেশি হতাশা।

স্বামীর প্রতি বাসমতির ভক্তি দেখে দম্পতির প্রতিবেশীরা বিস্মিত। সমস্ত বিস্ময় এবং গৌরব দেখে বিচলিত না হয়ে, বাসমতি দীর্ঘন ধরে এই সংগ্রামের সাথে শান্তি স্থাপন করেছেন।

সুমন যাদব নামে একজন প্রতিবেশী বলেন, এতো অভাব, অপমান, দুঃখ কষ্ট, লাঞ্চনা তবু শুধু ভালোবাসার জন্য একটি সংসার টিকে আছে ২৫ বছরের উপরে। একজন স্ত্রীর ভালোবাসা, নিষ্ঠা এবং দায়িত্ব কতটা শক্তিশালী হতে পারে তা বিশ্বাস করা কঠিন, যদি না আপনি বাসমতিকে দেখেন।#

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২ - ২০২৪
Theme Customized By BreakingNews

Follow for More!