ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি::
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সংরক্ষিত বনভূমিতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন, বনভূমি দখল এবং হাজার হাজার গাছের চারা ধ্বংসের ঘটনায় ১৪ জনের নামে উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেছে বন বিভাগ বিট কর্মকতা ফেরদৌস।
এ ঘটনায় সরকারি সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতির অভিযোগ এনে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
ছাতক রেঞ্জের বিট কর্মকর্তা কে. বি. এম. ফেরদৌসের লিখিত এজাহারের ভিত্তিতে ছাতক থানায় মামলাটি (মামলা নং-২২) রুজু করা হয়েছে। এ মামলাটি ২০১০ সালের বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন এবং ১৯২৭ সালের বন আইন-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় নথিভুক্ত করা হয়েছে।
এ মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ জুলাই ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে ছাতক উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের হাতিরলিয়া ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতাধীন নাছিমপুর মৌজার সিএস ১৫৩৬ নম্বর দাগভুক্ত সংরক্ষিত বন এলাকায় সংঘবদ্ধ একটি চক্র গভীর রাতে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র ও ট্র্যাক্টর (টলি) নিয়ে প্রবেশ করে। এরপর তারা বনভূমির ভেতর থেকে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ বালু উত্তোলন করে এবং বালু পরিবহনের জন্য বনাঞ্চলের ভেতরে চলাচলের রাস্তা তৈরি করতে হাজার গাছের চারা কেটে ও উপড়ে ফেলে।
এ মামলায় প্রধান অভিযুক্ত করেন আমির হোসেন (৩৫), আরকান মিয়া (৪৭), বদরুল ইসলাম (৪৬), আব্দুস সোবহান (৪০), দুদু মিয়া (৫১), আফছার (২৫), হেলাল (৩৫), কাওসার (৩২), সোহেল (৪৮), আয়না (৫৮), জয়নাল (৪৫), জাহাঙ্গীর (৩২), জয়নুল (৩২) ও ইমরান (৩২)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া ঘটনাস্থলে উপস্থিত অজ্ঞাতনামা আরও ১৫ থেকে ২০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বন বিভাগের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সংরক্ষিত বনের আওতাধীন প্রায় ৫০ হেক্টর সামাজিক বনায়ন এলাকায় বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান গাছের চারা রোপণ করা হয়েছিল। কিন্তু অবৈধ বালু উত্তোলনের সময় প্রায় ৭০০টি বিভিন্ন প্রজাতির চারাগাছ কেটে ও উপড়ে ফেলে সম্পূর্ণ নষ্ট করা হয়।
এতে বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, পরিবেশের ভারসাম্য এবং সরকারি বনসম্পদের কোটি কোটি টাকার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে বন বিভাগ।
এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে, অভিযুক্তরা বনভূমি থেকে আনুমানিক ৫০ হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করেছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়া গাছ কেটে বন ধ্বংসের কারণে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে। বালু উত্তোলন, পরিবহন, বনভূমির অবকাঠামো এবং সামাজিক বনায়নের রোপণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সহ সর্বমোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ৩৮ লাখ ৮ হাজার টাকা।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, সংরক্ষিত বন থেকে এভাবে বালু উত্তোলন শুধু সরকারি সম্পদের ক্ষতিই নয়, বরং পরিবেশের জন্যও মারাত্মক হুমকি। এতে মাটির স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ভূমিক্ষয়, বনভূমি ধ্বংস এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ছাতক থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা সাব-ইন্সপেক্টর (নিঃ) মো. রোমেন মিয়া ঘটনাস্থলের প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করে আইন অনুযায়ী মামলাটি রুজু করেছেন। এ মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান শুরু করছে।
স্থানীয় পরিবেশ সচেতন মহল দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বন এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও বন ধ্বংসের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে বন ও নদী এলাকার প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট করলেও অনেক সময় কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না।
এদিকে বন বিভাগ জানিয়েছে, সংরক্ষিত বন ও পরিবেশ রক্ষায় অবৈধ দখল, বালু উত্তোলন এবং গাছ কাটার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতেও কঠোর অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।#