এইবেলা, কুলাউড়া ::
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া পৌরসভায় আইইউজিআইপি প্রকল্পের আওতায় ড্রেন নির্মাণের কাজ চলছে কচ্ছপ গতিতে। একসাথে সবক’টি ড্রেনের কাজ শুরু করায় কোনটির কাজ অর্ধেকও সম্পন্ন হয়নি। অত্যন্ত ধীর গতিতে কাজ করায় যানজট করেছে প্রকট আকারের পাশাপশি সেইসাথে পৌচেছে চরমে।
১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কুলাউড়া পৌরসভা গত ৩০ বছরে সি গ্রেড থেকে এ গ্রেডে উন্নীত হওয়া ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোন উন্নয়ন হয়নি। শেষতক ২০২২ সালের মার্চ মাসে আইইউজিআইপি প্রকল্পে কুলাউড়া পৌরসভাকে অন্তর্ভূক্ত হয়।
জানা গেছে আইইউজিআইপি প্রজেক্ট হচ্ছে পারফরমেন্স বেইজড একটি প্রজেক্ট অর্থাৎ এই প্রকল্প বাস্তবায়নে যে পৌরসভা পারফরমেন্স যত ভালো করবে বরাদ্দ তত বেশী পাবে। কিন্তু নির্বাচিত মেয়র ও কাউন্সিলর না থাকার করণে কুলাউড়া পৌরসভায় এই প্রজেক্টের অধীনে পরিচালিত বহু প্রকল্প বাস্তবায়নে সৃষ্টি হয়েছে অশ্চিয়তা। বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ যখন চলমান থাকে বা কাজ শুরুর আগে অনেক জটিলত সৃষ্ঠি হয়। তখন প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয়ের সাথে যোগযোগ রক্ষা করে সেগুলো সমাধান করতে হয়। কিন্তু কুলাউড়া পৌরসভার উন্নয়নমূলক কাজে যথাযথ তদারকির অভাবে প্রায় শত কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তাছাড়া এখনও আলোর মূখ দেখেনি বহু প্রকল্প।
জনা যায়, কুলাউড়া শহরের প্রধান সড়ক চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে ২০২১ সালে উদ্যোগ গ্রহন করে পৌর পরিষদ। তৎকালীন মেয়র অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদের উদ্যোগে কুলাউড়া পৌরসভা ও সড়ক ও জনপদ বিভাগ যৌথভাবে সীমানা নির্ধারণের কাজ সম্পন করে। ঐ সময় মেয়র, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সড়ক বিভাগ মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী শহরের প্রধান সড়ক পরিদর্শণ করেন। সড়কের সীমানা ঘেষে ড্রেইন নির্মানের কাজও শুরু হয়। প্রজেক্টের অধীনে কুলাউড়া পৌরসভা প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে উছলাপাড়া ব্রিজ হতে উত্তর কুলাউড়া রেলক্রসিং পর্যন্ত এবং কুলাউড়া স্টেশন রোডের দু’পাশে ড্রেইন ও ফুটপাত নির্মাণ এবং রাস্তা সংস্কারের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের মে মাসে। কিন্তু ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণে ৩ বছরেও সেই কাজের এক তৃতীয়াংশও শেষ হয়নি। এ কাজটি নিয়ে জনমনে শংঙ্কা তৈরী হয়েছে। “কুলাউড়া বাজারের ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, কাজের কোন ধারাবাহিকতা নেই, ড্রেনের কাজ এক জায়গায় একটু করে এখানে শেষ না করে আরেক জায়গায় গিয়ে আরেকটু করে, সেখানেও শেষ না করে অন্য জায়গায় চলে যায়, এতে করে আমাদেরকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। “
১০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮নং ওয়ার্ড আলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে মনসুর পৌর সাইনবোর্ড পর্যন্ত ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণ ও পৌর সাইনবোর্ড হতে মরা গুগালী পর্যন্ত আরসিসি ড্রেন নির্মাণের কাজ ৬ মাসে সম্পন্ন করা সম্ভব হলেও সম্পুর্ন কাজ এখনও সম্পন্ন হয়নি। আলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হতে মনসুর পৌর সাইনবোর্ড পর্যন্ত ড্রেন ও রাস্তার কাজ আড়াই বছরে শেষ হলেও সাইনবোর্ড হতে মাগুরা মরা গুগালী অভিমুখে ড্রেনের কাজ এখনও শেষ হয়নি।
এদিকে প্রজেক্টের অধীনে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে চলমান সোনাপুর বিহালা, সাদেকপুর গ্রামের রাস্তা, দক্ষিণ বাজার ভূমি অফিস হতে উছলাপাড়া ভিশন শো রুম পর্যন্ত রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ কাজ এতো ধীর গতিতে চলছে, এই কাজগুলো নিয়েও জনমনে ক্ষোভ বিরাজ করছে। অথচ এই কাজের টেন্ডার হয় ২০২৩ সালে। এই কাজগুলোসহ এই প্রজেক্টের অনেক কাজে ধীরগতি এবং কিছু কাজ এখনও শুরুই হয়নি। সোনাপুরের আব্দুল আজিজ জানান, ২ বছর ধরে আস্তে আস্তে কাজ চলছে, এলাকার মানুষ সীমাহীন কষ্ট পাচ্ছে। তিনি বলেন মেয়র নাই কমিশনার নাই।
প্রজেক্টের অধীনে প্রথম ধাপে প্রায় শত কোটি টাকার ৫টি প্যাকেজ চূড়ান্ত করা হয়। ৩টি প্যাকেজের কাজ চলমান থকলেও ২টি প্যাকেজের অধীনে প্রকল্পগুলোর কাজ আরো আগে শুরু করার কথা ছিল সেগুলো হলো- ৬নং ওয়ার্ডের জয়পাশায় রেলওয়ে দিঘির পার হতে গুগালী ছড়া খাল পর্যন্ত ২ কোটি ৪৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে আরসিসি ড্রেইন নির্মাণ। ১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬নং ওয়ার্ডের ভোলানাথ খালের রাস্তা ও গার্ডওয়াল নির্মাণ। জয়পাশা গ্রামের প্রধান সড়ক অর্থাৎ টাউন সার্কুলার রোড প্রশস্তকরণ। ২ কোটি ১৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে ৭নং ওয়ার্ড জয়পাশা গফুর মিরার বাড়ী হতে ঘাগটিয়া রাস্তায় আরসিসি ড্রেইন নির্মাণ। ৬২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে দত্তরমুড়ি-আলালপুর রাস্তার পাশে আরসিসি ড্রেইন নির্মাণ। ২নং ওয়ার্ড শিবির রোডে ৪ কেটি টাকা ব্যয়ে রাস্তা ও আরসিসি ড্রেইন নির্মাণ। বিদ্যুতের একাধিক খুটি ড্রেনের মাঝে রেখে চলছে ড্রেন নির্মাণ কাজ। এই প্রকল্পগুলোর কাজ শুরু করতে গড়িমসি করা হচ্ছে। কাজের মানও খারাপ।
প্রজেক্টের অধীনে যেসব প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি সেগুলো হলো- ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮নং ওয়ার্ডের গ্যাস অফিস হতে দক্ষিণ চাতলগাও পর্যন্ত রাস্তা ও আরসিসি ড্রেইন নির্মাণ। দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে ৮নং ওয়ার্ডের কাছুর কাপন গ্রামে আরসিসি ড্রেইন নির্মাণ। উছলাপাড়া জুই প্লাজা হতে ঘাগটিয়া পর্যন্ত রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণ। ৯নং ওয়ার্ড দক্ষিণ লস্করপুর নুর মিয়ার দোকান হতে মনু মিয়ার বাড়ী পর্যন্ত ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণ।
৭ কোটি টকা ব্যয়ে মরাগুগালী খালে ব্লক স্থাপন ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ। প্রজেক্টের অধীনে উত্তর ও দক্ষিণ রেল কলোনীসহ অন্তত ৫টি বস্তি উন্নয়নের কাজ এখনও শুরুই হয়নি।
জানা গেছে, আইইউজিআইপি প্রজেক্টের অধীনে কুলাউড়া পৌরসভা ট্রাক রোলার, এসকেবেটর, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ভেহিকল- পাওয়ার কথা থাকলে ইতিমধ্যে সামান্য কিছু ভেহিকল পেয়েছে। প্রকল্প পরিচালক অফিসের সাথে যোগাযোগের অভাবে বড় বড় ভেহিকলগুলো এখনও বরাদ্দ পায়নি কুলাউড়া পৌরসভা। এছাড়া প্রজেক্টের অধীনে পৌরসভার আয় বর্ধক প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ ১২ কোটি টাকার কোন প্রকল্প এখনও গ্রহন করতে পারেনি কুলাউড়া পৌরসভা।
এদিকে আইইউজিআইপি প্রজেক্টের অধীনে চলমান কাজগুলো দ্রুত সম্পন্ন করে আরও কাজ অনুমোদন পাওয়ার কথা থাকলেও খারাপ পারফরমেন্সের জন্য কুলাউড়া পৌরসভা সেটা করতে পারছে না।
আইইউজিআইপি প্রকল্প সূত্র জানিয়েছে, কুলাউড়া পৌরসভা আরও প্রায় শত কোটি টাকার উন্নয়ন পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে পারে। কারণ এই প্রজেক্টের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে পারফরমেস বেইসড প্রজেক্ট। অর্থাৎ পারফরম্যান্স ভালো করবে সেই পৌরসভা আরও বরাদ্দ পাবে। কিন্তু কুলাউড়া পৌরসভা সেই কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
জনদূর্ভোগ প্রসঙ্গে কুলাউড়া ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক এম আতিকুর রহমান আখই জানান, আমরা একাধিকবার পৌর প্রশাসকদের সাথে কথা বলেছি। প্রকল্প কাজে শুধু ধীর গতিই নয় নিম্নমানের কাজও হচ্ছে। যেন পৌরসভায় তদারকির কেউ নেই। কাজের পাশে নির্বাহী প্রকৌশলী, ইঞ্জিনিয়ার কারো মুখ দেখা যায় না। অফিসে বসে এরা যেন নিজের আখের গোচাতে এবং পকেটের স্বাস্থ্য ভালো করার কাজে নিমগ্ন।
এব্যাপারে কুলাউড়া পৌর প্রশাসক ও ইউএনও সানজিদা আক্তার প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন এবং সমস্যার বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীকে নির্দেশ দিয়েছি। আশা করি এসব ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।##