আনোয়ার হোসেন রনি ::
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন এলাকার নবনির্বাচিত এমপিদের প্রতি আচমকাই বদলে গেছে এক শ্রেণির মানুষের ব্যবহার। নির্বাচনের আগে যারা ছিলেন দূরে, ছিলেন নিষ্ক্রিয় কিংবা নিরব—তাদের অনেকেই এখন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দিকে ঝুঁকছেন এক প্রকার হঠাৎ পাওয়া ‘সুযোগ’ হিসেবে পাশে গিয়ে ছবি তোলার হিড়িক পড়েছে।
এসব ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জুড়ে দেখা যাচ্ছে কৃত্রিম প্রশংসা, অভিনন্দন পোস্ট আর ঘনিষ্ঠতার প্রদর্শনী। রাজনৈতিক অঙ্গনে যাদের ‘স্বার্থবাদী’ বা ‘চামচা’ বলা হয়, এই দলটি আবার নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
নির্বাচনের সময় মাঠপর্যায়ে যারা সত্যিকারের শ্রম দিয়েছেন, ভোটারদের কাছে গেছেন, সমর্থন আদায়ে ঘাম ঝরিয়েছেন—তারা এখন অনেকেই সামাজিকভাবে আড়ালে চলে যাচ্ছেন।
কারণ, নির্বাচনের পরপরই দৌড়জোড় শুরু হয় স্বার্থসন্ধানী একটি মহলের। এই মহল সাধারণত ক্ষমতার গন্ধ পেলেই সক্রিয় হয়। প্রার্থীকে ঘিরে দলীয় নেতৃত্ব, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা প্রশাসনিক সম্পর্কের খাতিরে তারা নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে ছুটে যান নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই দৃশ্য নতুন নয়, বরং প্রতি নির্বাচনের পরই এক ধরনের ‘নতুন আনুগত্যের ককটেল’ তৈরি হয়। যারা ভোটের সময় কোনো ভূমিকা রাখেন না, বরং অপেক্ষা করেন ফলাফলের—তাদের মূল লক্ষ্য থাকে নির্বাচিত এমপির নিকটে অবস্থান নিয়ে ভবিষ্যতে সুবিধা আদায় করা ধান্দায়।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের হঠাৎ করে আবির্ভাব ঘটে নির্বাচিত এমপির প্রশংসায় পোস্ট দিতে, ছবি আপলোড করতে এবং নিজেদের ‘ঘনিষ্ঠ’ পরিচয় তুলে ধরতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
এমন পরিস্থিতিতে নবনির্বাচিত এমপিদের জন্য রয়েছে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তারা যদি প্রকৃত শ্রমিক, ত্যাগী নেতা-কর্মী ও নিবেদিতপ্রাণ সমর্থকদের অবমূল্যায়ন করে এই স্বার্থবাদীদের প্রভাবিত হতে দেন, তাহলে রাজনৈতিক সংগঠন ও দলীয় কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অভিজ্ঞ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা বারবার সতর্ক করে বলেছেন—ক্ষমতা পাওয়া মানেই নতুন একজন রাজনীতিবিদের চারপাশে ‘স্বার্থের বলয়’ তৈরি হওয়া। সেখান থেকে নিজেকে এবং দলকে রক্ষা করতে হলে শুরু থেকেই বেছে চলা জরুরি।
নির্বাচনোত্তর বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত অনেকেই প্রতিযোগিতা শুরু করেছেন নতুন এমপির কাছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। কেউ দৌঁড়ে গিয়ে ‘অভিনন্দন’ জানাচ্ছেন, কেউ আপ্যায়ন আয়োজন করছেন, আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সমর্থন’ দেখিয়ে পরিচিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।
অথচ অধিকাংশই ভোটের সময় মাঠে ছিলেন না, ছিলেন দূর থেকে দেখার ভূমিকায়। কিন্তু এখন তারা নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
স্থানীয় জনগণও এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন—যখন প্রার্থীকে প্রয়োজন ছিল, তখন তারা কোথায় ছিলেন? ভোট চাইতে, গণসংযোগে, কর্মী সমাবেশে কিংবা বিভিন্ন দ্বায়িত্ব পালনে তখন তারা অংশ নেননি। অথচ বিজয়ের পর তারা সবচেয়ে বেশি সক্রিয়। জনগণ মনে করছে, এরা মূলত ক্ষমতার কাছে থাকতেই অভ্যস্ত; কে ক্ষমতায়, কে নির্বাচিত—তা দেখেই তারা নিজেদের সুবিধার স্বার্থে অবস্থান বদলায়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রকৃত নেতা-কর্মী ও জনগণ। তাই এমপিদের উচিত এই স্বার্থবাদী গোষ্ঠী থেকে দূরে থাকা এবং প্রকৃত ত্যাগী, নিবেদিতপ্রাণ নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করে যাওয়া। কারণ স্বার্থবাদীরা সাময়িকভাবে পাশে থাকলেও রাজনৈতিক সংকট বা কঠিন সময় এলে তারা প্রথমেই সরে দাঁড়ায়। ফলে তাদের ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ।
এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর নিজের চারপাশে কারা ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, কারা স্বার্থে এগিয়ে আসছে—তা বোঝার ক্ষমতাই একজন জনপ্রতিনিধির দূরদৃষ্টি ও রাজনৈতিক দক্ষতার পরিচয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নবনির্বাচিত এমপিদের তাই বিশেষভাবে অনুরোধ ও আহ্বান জানানো হচ্ছে—স্বার্থবাদীদের চাতুর্য থেকে সজাগ থাকুন, দল ও জনগণের স্বার্থে কাজ করুন এবং প্রকৃত পরিশ্রমী ও ত্যাগীদের মর্যাদা দিন। কারণ রাজনীতির প্রকৃত শক্তি স্বার্থবান্দা নয়—জনগণই। ##