ছাতকে সুরমা নদীভাঙনে বিলীন স্কুল-মসজিদ নদী : আতঙ্কে বাউসা-কেশবপুরের মানুষ – এইবেলা
  1. admin@eibela.net : admin :
সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫৪ পূর্বাহ্ন

ছাতকে সুরমা নদীভাঙনে বিলীন স্কুল-মসজিদ নদী : আতঙ্কে বাউসা-কেশবপুরের মানুষ

  • মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

Manual1 Ad Code

আনোয়ার হো‌সেন র‌নি,ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি::

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সদর ইউনিয়নের বাউসা-কেশবপুর গ্রামে সুরমা নদীর ভয়াবহ ভাঙন যেন থামছেই না। একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি, গাছপালা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শতবর্ষী পূর্ব বাউসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ এবং বাউসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে। প্রতিদিনই নতুন করে ভাঙছে নদীর পাড়, আর সেই সঙ্গে ভেঙে পড়ছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ।

স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু নদীভাঙন নয়—এ যেন একটি জনপদের ধীরে ধীরে মৃত্যুর গল্প। বর্ষা এলেই সুরমা নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। প্রবল স্রোত আর তীব্র ঢেউয়ের আঘাতে নদীতীরের মাটি ধসে পড়ে নদীর বুকে। বছরের পর বছর ধরে চলা এই ভাঙনে বাউসা ও কেশবপুর গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে চলে গেছে। অথচ স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।

Manual3 Ad Code

গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, যে স্থানে আজ নদীর উত্তাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে, কয়েক বছর আগেও সেখানে ছিল সবুজ ধানের ক্ষেত, ফলের বাগান, শিশুদের খেলার মাঠ, মানুষের বসতঘর এবং গ্রামের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ। এখন সেখানে শুধু অথৈ পানি আর নদীর গর্জন।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, একসময় নিজেদের জমিতে চাষাবাদ করে স্বচ্ছলভাবে সংসার চালাতেন। কিন্তু নদী তাদের সব কেড়ে নিয়েছে। জমি হারিয়ে অনেকেই নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। বাধ্য হয়ে কেউ দিনমজুর, কেউ রিকশাচালক, আবার কেউ শহরে গিয়ে শ্রম বিক্রি করে পরিবার চালাচ্ছেন। পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবার অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।

Manual1 Ad Code

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি। শতবর্ষের ইতিহাস বহনকারী পূর্ব বাউসা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ নদীগর্ভে বিলীন হওয়ায় এলাকাবাসী গভীরভাবে মর্মাহত। একইভাবে বাউসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হারিয়ে যাওয়ায় কোমলমতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

Manual1 Ad Code

স্থানীয়রা বলেন, একটি বিদ্যালয় শুধু একটি ভবন নয়; এটি একটি গ্রামের ভবিষ্যৎ গড়ার কারখানা। আর একটি মসজিদ শুধু নামাজের স্থান নয়; এটি মানুষের বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। সেই দুটি স্থাপনাই আজ নদীর গর্ভে হারিয়ে গেছে।

এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীতীরবর্তী সড়কের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের চলাচল চরম দুর্ভোগে পড়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ সড়কটিও নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।

স্থানীয়দের অনেকেই আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমরা আর আশ্বাস চাই না, চাই স্থায়ী সমাধান। আমাদের ঘরবাড়ি, মসজিদ, বিদ্যালয় ও কৃষিজমি রক্ষায় এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। নয়তো অচিরেই বাউসা-কেশবপুর গ্রামের নাম শুধু মানচিত্রে থাকবে, বাস্তবে থাকবে না।”

Manual3 Ad Code

এই ভাঙনের চিত্র যেন সুরমা নদীরও এক নীরব আর্তনাদ।“আমি তো জীবন দিতে এসেছিলাম। আমার জলেই তোমাদের ফসল হতো, নৌকা চলত, মাছ মিলত, জনপদ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ আর অবহেলায় আজ আমি নিজেই ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছি। আমি ভাঙতে চাই না, আমাকে সঠিকভাবে বাঁচাও। আমার দুই তীর রক্ষা করো, তাহলেই তোমাদের ঘরবাড়ি, বিদ্যালয়, মসজিদ ও ভবিষ্যৎও রক্ষা পাবে।”

স্থানীয়দের মতে, নদীভাঙন শুধু জমি বা স্থাপনা ধ্বংস করছে না; এটি এলাকার শিক্ষা, অর্থনীতি, ধর্মীয় জীবন, সামাজিক স্থিতি এবং মানুষের মানসিক নিরাপত্তাকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। প্রতিদিন ভাঙনের শব্দ শুনে আতঙ্কে রাত কাটান নদীতীরের মানুষ। কখন যে নিজের ঘরটিও নদীতে তলিয়ে যাবে, সেই ভয় তাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়ায়।

এলাকাবাসীর দাবি, জরুরি ভিত্তিতে সুরমা নদীর তীর রক্ষায় টেকসই প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ, নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ভাঙনকবলিত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে নদীভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা ও জনবসতি রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহি উদ্দিন নদীভাঙনের সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “সুরমা নদীর ভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হয়েছে এবং করণীয় বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”

এখন বাউসা-কেশবপুরের মানুষের একটাই প্রত্যাশা—আর কোনো আশ্বাস নয়, দ্রুত বাস্তব পদক্ষেপ। কারণ প্রতিটি নতুন বর্ষা, প্রতিটি নতুন ঢেউ তাদের জন্য নিয়ে আসে নতুন আতঙ্ক। আজ যদি কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তবে হয়তো আগামী প্রজন্ম শুধু গল্পেই শুনবে—সুরমার তীরে একসময় বাউসা-কেশবপুর নামে একটি জনপদ ছিল।#####

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২ - ২০২৪
Theme Customized By BreakingNews

Follow for More!