মোঃ বুলবুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি::
কুড়িগ্রাম সদরের হলোখানা ইউনিয়নে মানসিক ভারসাম্যহীন এক তরুণী (২২) ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছেন। নির্জন স্থানে একটি ঘরে বসবাস করা ওই তরুণীকে প্রায়ই মারধর করেন তার আপন বাবা। পেটের সন্তানসহ তরুণীর প্রাণহানীর আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। তবে গ্রামবাসী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কিংবা সরকারি কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে ওই তরুণীকে উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হলোখানা ইউনিয়নে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, গ্রাম থেকে খানিক দূরে, বিলের ধারে কৃষি জমির মাঝে একটি টিনের ঘর। ওই ঘরে বাবা আর মেয়ের বসবাস। দিনমজুর বাবার সাথে একা এক বাড়িতে বসবাস করেন ওই তরুণী। বাবা কাজে বের হওয়ায় তরুণী সারাদিন বাড়িতেই থাকেন। গ্রামের কারও সাথে মেলামেশা নেই। বাড়িটিতে কারও নিয়মিত যাতায়াতও নেই। তাকে কে বা কারা ধর্ষণ করেছে সে বিষয়ে কিছুই বলতে পারেন না ওই তরুণী।
গ্রামের কয়েকজন নারী ও পুরুষকে সাথে নিয়ে বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তরুণীর বাবা বাড়িতে নেই। ঘরের ভেতর একা তরুণী। গায়ে ছেড়া, জীর্ণ ও নোংরা পোশাক। মাথায় জট লাগানো চুল। স্থানীয় এক নারী তার শারীরিক অবস্থা জানতে চাইলে তরুণী ঠিক গোছালো উত্তর দিতে পারছিলেন না। শুধু জানালেন, তার বাবা তাকে লাঠি দিয়ে প্রচন্ড মারধর করেছেন।
তিনি বললেন, ‘ রাইতে আব্বা নাটি (লাঠি) দিয়া ডাঙাইছে (মারছে)। বিষতে (ব্যাথায়) হাঁটপার পাঙ না। মুই কনু আব্বা ডাঙাইস না। কোনো কথা শুনিল না। এগলা (আঘাতের স্থান দেখিয়ে) ডাঙে ফোলে থুইছে।’
স্থানীয় এক নারী দেখে ঠিক ঠাওর করতে পারছিলেন না যে তরুণীর পেটে বাচ্চা নাকি টিউবার কিংবা অন্যকিছু। তরুণী শুধু জানালেন তার পেটে ব্যাথা হয়।
তরুণীর শারীরিক অবস্থা নিশ্চিত হতে স্থানীয় এক স্বাস্থ্যকর্মীর সহায়তা নেওয়া হয়। কিছু পরে একটি বেসরকারি সংস্থার স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী শিউলী বেগম ওই তরুণীর বাড়িতে পৌঁছেন। স্থানীয় নারীদের সহায়তা নেন। তরুণীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন।
স্বাস্থ্যকর্মী শিউলী বলেন, ‘প্রাথমিক পরীক্ষা করে মনে হলো তার পেটের সন্তানের বয়স ৭ মাস পেরিয়েছে। বাচ্চার অবস্থা এখনও স্বাভাবিক আছে। কিস্তু তরুণীর বাবা তাকে বেদম মারধর করেছে। ওর জরুরি চিকিৎসা দরকার। তা না হলে মা ও শিশু কাউকেই বাঁচানো যাবে না।’
স্থানীয় নারীরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে ওই বাড়িতে বাবাসহ তরুণীর বসবাস। সে মানসিক ভারসাম্যহীন। ওই বাড়িতে গ্রামের কেউ যেতে চায় না। ওর বাবা উল্টা পাল্টা কথা ছড়ান। গ্রাম থেকে বাইরে হওয়ায় মানুষের নজর এড়িয়ে কেউ ওই বাড়িতে গিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করে থাকতে পারে। ওর বাবার দায় আছে। তাকে নির্জন স্থানে একা এক বাড়িতে রাখা উচিৎ হয়নি। তাকে কে ধর্ষণ করেছে সেটা নিশ্চিত বলা সম্ভব নয়। তদন্তের দাবি এলাকাবাসীর।
গ্রামের কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, গ্রামের কেউ ওই বাড়িতে গিয়ে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পেছনে জড়িত ব্যক্তির বিষয়ে তার মেয়েকে জিজ্ঞাসা করার চেষ্টা করলে তার বাবা কথা বলতে বাধা দেন।
স্থানীয়দের দাবি, ওই তরুণীকে দ্রুত উদ্ধার করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক। এজন্য স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে গ্রামবাসী।
যোগাযোগ করা হলে তরুণীর বাবা বলেন, ‘ আমি বাড়িতে থাকি না। কে আসছিল জানি না। আমার মেয়ে পাগলি মানুষ। ওর কথায় কান দেন না। কার নাম কইবে তার ঠিক নাই।’
সদর উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মশিউর রহমান মন্ডলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বপ্রণোদিত হয়ে তরুণীকে উদ্ধারে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,‘ কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী ইশরাত হাসান বলেন, ‘সমাজসেবার দায়িত্ব পুলিশের সহায়তায় ওই তরুণীকে উদ্ধার করা। এরপর চিকিৎসার পাশাপাশি এ বিষয়ে মামলা রুজু করতে হবে। এজন্য অভিযোগকারীর প্রয়োজন নেই। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র মামলা ও চিকিৎসাভার বহন করবে। পাশাপাশি তরুণীকে নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবে।’
এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘ধর্ষণে জড়িত ব্যক্তিকে সনাক্ত করতে ওই তরুণী এবং সন্দেহভাজনদের ডিএনও স্যাম্পল পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিলে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা সম্ভব। আদালতের অনুমতি নিয়ে পুলিশ এই উদ্যোগ নিতে পারবে।’
কুড়িগ্রাম সদর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কামাল হোসেন জানান, মেয়েটির বাবা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামায় একটি অভিযোগ দিয়েছে। আমরা তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নিবো। ##