এক কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে কান্নায় ভাসছে ২০ পরিবার
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি ::
বিদেশে ভালো বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে সিলেট বিভাগে আবারও মাথাচাড়া দিয়েছে দালালচক্র। কোরিয়া ও সাইবেরিয়ায় পাঠানোর নাম করে ২০ যাত্রীর কাছ থেকে পাসপোর্টসহ এক কোটি টাকারও বেশি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুলাউড়ার কুখ্যাত দালাল মো. সাইফুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে। প্রতারণার শিকার পরিবারগুলো এখন সর্বস্বান্ত হয়ে চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছে। জামায়াত নেতা পরিচয়ে দালালি—তারপর পাসপোর্ট গায়েব, টাকা গায়েব, লোকও গায়েব করার অভিযোগ উঠেছে।
জানা যায়, ২০২৪ সালে ১৭ নভেম্বর মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার রাউৎগাঁও উত্তর গ্রামের আরজান আলী খানের ছেলে সাইফুল ইসলাম খান। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসে বিদেশে পাঠানোর নামে দালালি ব্যবসা চালিয়ে আসছে।
ঢাকার নয়াপল্টন, যাত্রাবাড়ী, শনির আখড়া, উত্তরা, মিরপুর—সব জায়গায় “ট্রাভেলস ব্যবসা”র নামে অফিস খুলে সহজ-সরল মানুষকে বিদেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখানো ছিল তার প্রধান কৌশল। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে কোরিয়া–সাইবেরিয়া ভিসা দেখিয়ে কমপক্ষে তিন কোটি টাকা বিকাশ ও ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সুনামগঞ্জের ছাতকের ছৈলাআফজলাবাদ ইউনিয়নের বাসনাকান্দি গ্রামের হেলাল আহমদ, উপজেলা যুবদল নেতা পরিচয়ে গ্রামবাসীর আস্থা নিয়ে সাইফুলের কাছে ২০ যাত্রীর পাসপোর্ট ও টাকা পৌঁছে দেন। প্রতিটি যাত্রীর কাছ থেকে লাখে লাখে টাকা নেওয়া হয়—কেউ ৫ লাখ, কেউ ৬ লাখ—মোট হিসাব দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি টাকা।
সাইফুলের কাছে শুধু হেলাল আহমদেরই ৫০ লাখ টাকার প্রমাণপত্রসহ চেক রয়েছে, যার এক টাকাও আজ পর্যন্ত ফেরত পাননি। ভিসা যাচাই–বাছাইতেই ধরা পড়ে জালিয়াতি ভুক্তভোগীরা জানান, বিদেশে যাবার আগের দিন তারা অনলাইনে ভিসা যাচাই করতে গিয়ে দেখেন সবগুলো ভিসাই জাল।
বিষয়টি জানাতে গেলে অভিযুক্ত সাইফুল নানা অজুহাত দিতে শুরু করে। এরপর এক পর্যায়ে মামলা, হামলা, গুম ও হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
এব্যাপারে হেলাল আহমদ বলেন,আমাদের জীবনের সঞ্চয় শেষ। সুদের টাকার বোঝা মাথায়। এখন টাকা চাইলে উল্টো হুমকি দেয়—ঢাকার জামায়াতের বড় নেতার পরিচয় দেখিয়ে ভয় দেখায়। সালিসি হয়, কিন্তু সুরাহা হয় না। এই ঘটনায় ঢাকার যাত্রাবাড়ীসহ কুলাউড়া ও রাউৎগাঁও এলাকায় অন্তত ৪–৫ বার সালিস বৈঠক অনুষ্টিত হয়েছে, কিন্তু কোনোটিতেই সমাধান হয়নি।
প্রতারিত ভুক্তভোগীদের অভিযোগ—সাইফুল ইসলাম খান সালিসি টেবিলে লোক দেখানো কিছু কথা বলে, পরে আবার গা-ঢাকা দেয়। কখনও ফোন ধরে না, কখনও টাকা পাওনা অস্বীকার করে নানা টালবাহানা করছে।
ভুক্তভোগীদের কান্না জড়িত কন্ঠে আর্তনাদ করে বলেন তাদের স্ত্রী-সন্তান নিয়ে পথে বসার উপক্রম”। ভুক্তভোগী আবু সুফিয়ান, সফিউল আলম সুমেল, মো. সাব্বির আহমদ, জুবায়ের আহমদ সালমান, মোহাম্মদ নাঈম উদ্দিন, হেলাল আহমদ মো. মিজানুর রহমানসহ ২০ জন জানান—বিদেশে যাওয়ার জন্য তারা জমি বিক্রি করেছেন, ঋণ নিয়েছেন এনজিও থেকে, অনেকেই বন্ধক রেখেছেন ঘরবাড়ি।
এখন ভিসা জাল প্রমাণিত হওয়ায় টাকা ফেরত না পেয়ে পরিবার নিয়ে চরম বিপদের মুখে পড়েছেন। এক ভুক্তভোগী চোখ মুছে বলেন,এখন প্রতিমাসেই শুধু সুদের টাকা দিতে দিতে আমরা শেষ হয়ে যাচ্ছি। সংসারের খরচ চালানোই অসম্ভব হয়ে গেছে।
স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ফয়েজ আহমদ এসব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন ঢাকা থেকে শুরু করে সাইফুল ইসলাম খান গ্রামের বাড়িতে বেশ কয়েকবার সালিস হয়। কিন্তু সাইফুল ইসলাম খান টাকা ফেরত দিতে গড়িমসি করছে। এখন ভুক্তভোগীরা আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাইফুল ইসলাম খান প্রথমে ভুক্তভোগীদের “দেখানোর জন্য” ভুয়া ভিসা সংবলিত পাসপোর্ট তৈরি করে দেয়। এরপর বিদেশে যাওয়ার আগ মুহূর্তে “টিকিট দিচ্ছে পরবর্তী ব্যাচ পাঠাবে”, “অফিসের সমস্যা”, “ইমিগ্রেশনের জট”—এইসব অজুহাতে মাসের পর মাস ছাতকে ২০ জন মানুষকে ঘুরিয়েছে।
সাইফুল ইসলাম খান এই নৃশংস প্রতারণায় ২০টি পরিবার আজ পথে বসার উপক্রম। স্থানীয়দের দাবি—“দ্রুত গ্রেপ্তার না হলে আরও মানুষ প্রতারিত হবে । গ্রামবাসীর দাবি—সাইফুল ইসলাম খান দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশ পাঠানোর নামে প্রতারণা করে আসছে। কেউ মুখ খুললে হুমকি-ধমকি দেয়। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে আত্মগোপনে এখন রয়েছে।
গত সোমবার রাতে প্রতারণার শিকার মানুষগুলো এ প্রতিনিধির কাছে এসে তাদের প্রতারিত হাওয়ার ঘটনা বিস্তারিত প্রমানিত কাগজপত্র দেন। তারা এখন প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছে।
সাধারণ মানুষকে সতর্কবার্তা এ ধরনের ভিসা প্রতারণা সম্প্রতি সিলেট–মৌলভীবাজারে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন—কাউকে নগদ টাকা না দেওয়া, ট্রাভেলসের লাইসেন্স যাচাই, ভিসা ইমিগ্রেশন সাইটে যাচাই
হলে এ ধরনের প্রতারণা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
তারা এক কোটি টাকার ভয়াবহ প্রতারণায় ২০টি পরিবার আজ নিঃস্ব। হুমকি, ভুয়া ভিসা, টাকা আত্মসাৎ—সব মিলিয়ে ছাতক উপজেলার গ্রাম জুড়ে আতঙ্ক। প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ ছাড়া এই চক্র ধরা পড়বে না—এটাই ভুক্তভোগীদের আর্তি।##