ছাতকে গরু চুরির অভিযোগে দু’ঘরে হামলা–ভাঙচুর : এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি – এইবেলা
  1. admin@eibela.net : admin :
মঙ্গলবার, ২৬ মে ২০২৬, ০৩:০২ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রগতিতে অভিভাবকদের ভূমিকা           -কমর জাহান চৌধুরী বড়লেখায় ব্রিজ নির্মাণ- ১ বছরের কাজ চলছে ৪ বছর ধরে নিম্নমানের সামগ্রি ব্যবহারে ভাঙ্গছে রাস্তা, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ওসমানীনগরে তিফিয়া হিফযুল কোরআন একাডেমির পাগড়ি ও সনদ বিতরণ ওসমানীনগর লন্ডন ফার্মেসী ও কনসালটেন্সি সেন্টারের উদ্বোধন জুড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমপি পরিবারের ঔষধ সহায়তা প্রদান কমলগঞ্জে পথরোধ হুমকি ও মানসিক নির্যাতন সইতে না পেরে বিষপান করা স্কুল শিক্ষার্থী মৃত্যু ছাতকের পল্লীতে দু’পক্ষের  রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে আহত ৬0 কমলগঞ্জে বজ্রপাতে ৫ চা-শ্রমিক আহত রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিবাদে কুলাউড়ায় মানববন্ধন কুলাউড়া পৌরসভা মেধাবৃত্তি পেল ৬৯ শিক্ষার্থী

ছাতকে গরু চুরির অভিযোগে দু’ঘরে হামলা–ভাঙচুর : এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি

  • শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০২৬

Manual2 Ad Code

ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি ::

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার দোলারবাজার ইউনিয়নের দক্ষিণ কুর্শি গ্রামে গরু চুরির অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজিত জনতার হামলা–ভাঙচুরের ঘটনায় আবারও চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। গত বুধবার দুপুরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ায় জনমনে নতুন করে ক্ষোভ–আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। দুইটি বসতঘর ভাঙচুর, নারীর আকুতি, এবং ছোট শিশুকে কোলে নিয়ে হামলা ঠেকানোর দৃশ্য—সব মিলিয়ে পুরো এলাকায় চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।

Manual7 Ad Code

স্থানীয় সূত্র জানায়, দক্ষিণ কুর্শিসহ পাশের কয়েকটি গ্রামে দীর্ঘদিন ধরেই গরু–ছাগলসহ বিভিন্ন গৃহপালিত প্রাণী চুরি বেড়েছে। মাঝেমধ্যে ধরা পড়লেও চোরচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় ক্ষোভ জমছিল গ্রামবাসীর মধ্যে। চুরি রোধে কয়েকদফা বৈঠকের পর সম্প্রতি গঠন করা হয় ‘চোর নির্মূল কমিটি’। এক বৈঠকে ৮ সন্দেহভাজন ব্যক্তির কাছ থেকে মুচলেকাও নেওয়া হয়—তারা আর চুরির সঙ্গে যুক্ত হবে না বলে।

কিন্তু পরিস্থিতির উন্নতি না হয়ে উল্টো চুরির মাত্রা বেড়েছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। ঠিক এমন প্রেক্ষাপটেই মঙ্গলবার গভীর রাতে উত্তর কুর্শি গ্রামের দোলন মিয়ার বাড়িতে গরু চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েন একই ইউনিয়নের মইনপুর গ্রামের ২৫ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম। পরে স্থানীয়দের চাপে তিনি চুরির সঙ্গে আরও কয়েকজনের নাম জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।

বৈঠকের পরই পরিস্থিতি উত্তপ্ত বুধবার সকালে মোহাম্মদগঞ্জ বাজারে ‘চোর নির্মূল কমিটি’র জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলাম। উপস্থিত ছিলেন বাজার কমিটির সভাপতি আলী হোসেনসহ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

বক্তারা অভিযোগ করেন, লাগাতার চুরির কারণে জনজীবন অস্থির হয়ে উঠেছে। সতর্ক করার পরও চুরি না থামায় গ্রামবাসীর ধৈর্য্য চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়েছে। বৈঠকে আটক সাইফুল ইসলামও সবার সামনে গরু চুরির ঘটনাটি স্বীকার করেন।

বৈঠক শেষে হঠাৎ করেই পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নেয়। স্থানীয় এক যুবকের উসকানিতে উত্তেজিত কয়েক ডজন মানুষ লাঠিসোঁটা, দা ও ইটপাটকেল নিয়ে দক্ষিণ কুর্শির উদ্দেশে ছুটে যায়। কেউ কেউ ভিডিও করতে থাকে মোবাইলে—যা পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়।

প্রথম হামলা হয় তারেক মিয়ার ঘরে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়—তার স্ত্রী দুই বছরের শিশুকে কোলে নিয়ে হামলাকারীদের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। তিনি বারবার বলছিলেন, “দয়া করে ঘর ভাঙবেন না।”

হাতে থাকা রামদা আড়ালে রেখে তিনি হামলাকারীদের নিবৃত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু উত্তেজিত জনতা থামেনি। ইটপাটকেলের পরপরই কয়েকজন এগিয়ে এসে ঘর ভাঙতে শুরু করে।

একপর্যায়ে নারীটি শিশুকে মাটিতে নামিয়ে রেখে রামদা হাতে হামলাকারীদের সামনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় কয়েকজন মিলে তাকে ও শিশুটিকে সরিয়ে নেয়। এরপর মুহূর্তেই ধসে পড়ে ওই ঘর।

তার কিছুক্ষণ পর একই গ্রামের আলী হোসেনের অপর একটি ঘরেও হামলা চালানো হয়। লাঠি, বাঁশ ও ইটপাটকেলের আঘাতে ঘর দুটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের দাবি—এই ঘর দুটি চোরচক্রের “আড়ত” বা আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

বৈঠকে হামলার সিদ্ধান্ত হয়নি” — দাবি আয়োজকদের হামলার ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়ে বৈঠক আহ্বানকারীরা। বাজার কমিটির সভাপতি ও বৈঠকের অন্যতম উদ্যোক্তা আলী হোসেন বলেন,বৈঠকে হামলার সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা শুধু আটক সাইফুলকে পুলিশে হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা করছিলাম। কিছু যুবক উত্তেজিত হয়ে যা করেছে—তা আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল না।”

এব‌্যাপা‌রে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল আলম বলেন,সকালে বিষয়টি জানার পর পুলিশকে সতর্ক করি। লোকজন খুব ক্ষুব্ধ ছিল, তাই আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসার অনুরোধ করি। কিন্তু কয়েকজন যুবক উত্তেজিত হয়ে যাওয়ায় হামলার ঘটনা ঘটে যায়। আইন হাতে তুলে নেওয়া ঠিক হয়নি।

Manual2 Ad Code

ঘটনার পর জাহিদপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক আবদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন,আটক সাইফুল ইসলামকে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চুরির মামলা হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে—তাদের বিরুদ্ধেও পূর্বে একাধিক মামলা রয়েছে।”

এ ঘটনায় দক্ষিণ কুর্শি গ্রামের বাসিন্দা দুলাল মিয়া বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখ করে নতুন অভিযোগ দায়ের করেছেন।

ছাতক থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, “অভিযোগ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। উত্তেজনার সুযোগে কেউ অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা হামলার ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর নিন্দার ঝড় বইছে। অনেকেই নারীর সামনে এমন হামলাকে ‘অমানবিক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ মন্তব্য করছেন—দীর্ঘদিনের চুরির কারণে মানুষের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেছে।

Manual8 Ad Code

একজন স্থানীয় বয়স্ক ব্যক্তি বলেন,“আমরা বহুবার বুঝিয়েছি। মুচলেকা নিয়েছি। কিন্তু যারা চুরির পথ ছাড়তে চায় না—তাদের কারণে পুরো গ্রামে শান্তি নেই। তারপরও আইন হাতে তুলে নেওয়া সমর্থন করি না।”

চোরচক্রের দৌরাত্ম্য—সাধারণ মানুষের ক্ষোভ জমছিল দীর্ঘদিন গ্রামবাসীর অভিযোগ, কয়েক বছর ধরেই রাতের অন্ধকারে সংগঠিত চোরচক্র গরু–ছাগল ছাড়াও ঘরের মূল্যবান মালামাল লোপাট করে। মাঝেমধ্যে হাতেনাতে ধরা পড়লেও প্রশাসনিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা না হওয়ায় অপরাধীরা পুনরায় চুরি শুরু করে।

একজন ভুক্তভোগী বলেন,গরু চুরি হলে মুক্তিপন পর্যন্ত দিতে হয়। ধরলেও একটু পরেই ছেড়ে দেওয়া হয়। তাই মানুষ ক্ষোভ জমিয়ে রেখেছিল।”

হামলার পর থেকেই এলাকায় থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছিল। রাত থেকেই অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও স্থানীয়রা এখনও আতঙ্কে দিন পার করছেন—যেন আবার কোথাও উত্তেজনা ছড়িয়ে না পড়ে।

Manual2 Ad Code

পুলিশ জানায়, উত্তেজনা প্রশমনে নিয়মিত টহল ও নজরদারি চলছে। সম্পূর্ণ চিত্র—ক্ষোভ, তাণ্ডব, আর আইনের শাসন ছাতকের দক্ষিণ কুর্শির এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দেয়—দীর্ঘদিনের অপরাধ ও চোরচক্রের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কখনো কখনো ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যে কোনো সমাজের জন্যই অশুভ সংকেত। উত্তেজনা, হামলা কিংবা বিচারবহির্ভূত শাস্তি—কোনোটিই সমাধান নয়।

এ জন্য প্রয়োজন—দ্রুত তদন্ত, আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং চোরচক্রকে আইনের আওতায় আনা। বর্তমানে পুরো এলাকায় চাপা উত্তেজনা থাকলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—এমনটাই জানিয়েছে পুলিশ।#

সংবাদটি শেয়ার করুন

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০২২ - ২০২৪
Theme Customized By BreakingNews

Follow for More!