বড়লেখা প্রতিনিধি :
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বলেছেন, গত ১৭ বছরের অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। অনেক বাবা তার সন্তান হারিয়েছেন। এই মজলুম দলের মধ্যে বিএনপিও ছিল, জামায়াতে ইসলামিও ছিল। সকলের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশে আমরা ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার পতন করব। খুনি হাসিনাকে বাংলাদেশে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসব। এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে মাঠে নেমেছি। আল্লাহ আমাদের বিজয় দান করেছেন। আমরা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশ থেকে তার দাদাবাবুদের দেশ ভারতে পালাতে বাধ্য করেছি। কিন্তু নির্বাচনের আগে আমাদের একটা সংস্কারের এজেন্ডা ছিল। সেটা নিয়ে পুরো বাংলাদেশে এগারো দল প্রত্যেক বিভাগে কর্মসূচি করেছে। আমরা গণতন্ত্রের কাছে গিয়ে জনগণের ওপর ভরসা করেছি। জনগণ নির্বাচনে এসেছে। তারা দুটি ভোট দিয়েছে। একটি হলো বাংলাদেশের আমূল পরিবর্তনের জন্য ভোট, আরেকটি হলো জনপ্রতিনিধি নিয়োগের জন্য ভোট। এই ১ হাজার ৪০০ ভাইয়ের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে, হাজার হাজার মানুষের পঙ্গুত্ববরণের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের ৭৫ শতাংশ মানুষ পরিবর্তনের জন্য, সংস্কারের জন্য গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের পর আমরা দেখলাম, ৭৫ শতাংশ মানুষের বিরুদ্ধে গিয়ে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে, সংস্কার প্রক্রিয়ার ভেতর না গিয়ে সরকারকে ভূতে পেয়েছে। এজন্য উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করেছে। আমরা ১১ দল রাজপথে নেমেছি। সরকারকে যে ভূতে পেয়েছে, এই ভূত তাড়ানোর জন্য প্রত্যেক বিভাগে আমরা কর্মসূচি দিয়েছি। ইনশাআল্লাহ আগামীতে আপনাদের সিলেট বিভাগে একটি মহাসমাবেশ হবে। আপনারা সবাই আসবেন।
নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী রোববার (২৮ জুন) সন্ধ্যায় ১১ দলীয় ঐক্যজোটের বড়লেখা উপজেলা শাখার আয়োজনে জেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত মতবিনিময় সভায় বক্তৃতাকালে এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, যদি বাংলাদেশে সংস্কার বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে সরকার পতনের দিকে যাব, ইনশাআল্লাহ। আমরা শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করতে পারব না। আমাদের যে ভাইয়ের হাত চলে গেছে, ওই হাতের সঙ্গে আমরা বেইমানি করতে পারব না। এই ভাইয়েরা আমাদের একটি গুরুদায়িত্ব দিয়ে গেছেন। আমি সাঈদ মারা যাচ্ছি, তুমি পৃথিবীতে যতদিন জীবিত থাকবে, তুমি বাংলাদেশের মানুষের জন্য সংস্কার নিয়ে আসবে। যদি আপনাদের মধ্যে আবু সাঈদের রক্ত থাকে, তাহলে বাংলাদেশে আমরা সংস্কার বাস্তবায়ন করব, ইনশাআল্লাহ।
নাসির উদ্দিন বলেন, ওবায়দুল কাদের বলেছিল, শেখ হাসিনার পতন হলে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে পাঁচ লাখ লোক মারা যাবে। আমরা কোনো প্রতিশোধে যাইনি। আমরা বলেছি, বাংলাদেশে বিচার বিভাগ আছে। আমরা বিচারে বিশ্বাসী। আপনি বিনা বিচারে ফাঁসি দিতে পারেন। কিন্তু আমরা বিচারের পক্ষে। ট্রাইব্যুনাল গঠন হয়েছে। শেখ হাসিনার ফাঁসি হয়েছে। আমরা এখন অপেক্ষায় আছি, কবে শেখ হাসিনাকে দেশে এনে জনগণের বিজয়ের মধ্য দিয়ে তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে শহীদদের বদলা নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশের মানুষের সামনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
তিনি বলেন, গত পঞ্চাশ বছর যারা ভারতের পা লেহন করেছে, দাদাবাবুদের কাছে গিয়ে সেজদা দিয়েছে, এই আওয়ামী লীগ। আমরা গণঅভ্যুত্থানের পর বলেছি, আমরা একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির দিকে হাঁটব। একাত্তরে আমাদের অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা জীবন দিয়েছিলেন, ’৯০-এ দিয়েছিলেন, ’২৪-এ দিয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য, আজাদ বাংলাদেশের জন্য। রাস্তায় তাঁরা রক্ত দিয়ে লিখে দিয়েছেন, ভারত তুমি শুনে রাখো, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, আগামীতেও স্বাধীন থাকবে। তোমরা যা-ই করো না কেন, আমাদের মতো তরুণ-যুবক বাংলাদেশে আছে। আমরা যতদিন জীবিত থাকব, ততদিন তোমাদের কাছে মাথা নত করব না। কিন্তু নির্বাচনের পরে আমরা কী দেখলাম, তাঁদের ভেতরে যে চুক্তি হয়েছে আওয়ামী লীগের সঙ্গে, ভারতের সঙ্গে ভোট দেওয়ার জন্য, সেটা জনগণের সামনে স্পষ্ট হয়ে পড়েছে।
সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে নাসির বলেন, বড়লেখাবাসী, আপনারা সীমান্তে আছেন। গতকাল রাত বা তার আগের রাতে ভারত থেকে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানো হয়েছে বড়লেখা সীমান্তে। আপনারা বীরের জাতি। বিজিবির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সীমান্তে দাঁড়িয়ে আপনারা সন্ত্রাসীদের ঠেকিয়ে দিয়েছেন। এ জন্য আপনাদের লাল সালাম।
বড়লেখার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড়লেখার অনেক মন্ত্রী-এমপি দেখেছেন, বড়লেখার উন্নয়ন হয়নি। সুজানগর ইউনিয়নের আগরগাছ বিক্রি করে বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ধনী উপজেলা বানানো সম্ভব বড়লেখাকে। ১১ দলীয় জোট যখন ক্ষমতায় আসবে, তখন এই আগর ও উডশিল্পকে বিশ্বে কীভাবে আরও বিস্তৃত করা যায়, সে জন্য কাজ করব। এখানে কর্মসংস্থানের জন্য কারখানা করা যায়। তিনি বলেন, অনেকে বলেন, টাকা পাবেন কোথায়? টাকা আসবে। যদি বাংলাদেশে দুর্নীতিবাজ না থাকে, তাহলে উন্নয়ন সম্ভব। যদি চাঁদাবাজ না থাকে, তাহলে বাংলাদেশে উন্নয়ন সম্ভব।
তিনি বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের ইঙ্গিত করে বলেন, আজকে আমাদের একটি প্রোগ্রাম ছিল। জুলাইয়ের আমাদের কিছু বন্ধুরা রাস্তায় প্রতিবাদ করেছে। আমরা তাদের উদ্দেশে বলব, আমাদের কাজ দেখে শিখুন। আমরা শান্তিপূর্ণভাবেও প্রোগ্রাম করতে জানি। তোমাদের ইলিয়াস আলীকে যে কারণে গুম করা হয়েছে, সীমান্তে হত্যার প্রতিবাদে দাঁড়ানোর জন্য। আমরা ইলিয়াস আলীর পথ ধরে চলি। তোমাদের নেতা বলেছিল, ‘উই রিভোল্ট’। আমরাও ভারতের বিরুদ্ধে বলি, ‘উই রিভোল্ট’। এ জন্য রাস্তায় চিৎকার-চেঁচামেচি না করে আল্লাহর ওয়াস্তে সীমান্তে চলে যান। পাহারা দিন। তখন বলতে পারবেন, জিয়ার সৈনিক। নাহলে রাস্তার সৈনিক হয়ে যাবেন।
বড়লেখা সদর ইউনিয়ন জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক জয়নাল উদ্দিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব প্রীতম দাশ, বড়লেখা উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির এমাদুল ইসলাম, বড়লেখা উপজেলা জামায়াতের পেশাজীবী সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক মোহাইমিন সালেহ, খেলাফত মজলিসের মৌলভীবাজার জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক এমএম আতিকুর রহমান, পৌর জামায়াতের সাবেক নেতা প্রবাসী খিজির আহমদ, বড়লেখা সদর ইউপি জামায়াতে ইসলামীর সভাপতি রবিউল ইসলাম সুহেল, এনসিপির মৌলভীবাজার জেলা শাখার যুগ্ম সমন্বয়কারী তামিম আহমদ প্রমুখ।
এর আগে বিকেলে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী বড়লেখা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আসরের নামাজ আদায় করতে গেলে শহরে প্রবেশের সময় কয়েকজন বিক্ষোভকারী ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগান দেন। পরে বড়লেখা শহরের বড়লেখা-কুলাউড়া সড়কের দক্ষিণবাজার এলাকায় বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা তার গাড়িবহরের গতিরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়।